সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০ ১৯:৩৪ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসূল এই গুণে গুণান্বিত ছিলেন। ধৈর্য বা সবরের অর্থ হচ্ছে- দুঃখ-কষ্ট দেখে মন খারাপ কিংবা রাগ না করা।  মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়ে বলেন, "অতএব তুমি ধৈর্য ধারণ কর যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ।" (৪৬:৩৫)।

মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, "তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।" (২:৪৫, ১৫৩)।

শত্রু ও বিরোধীদের মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ধৈর্য। মহান আল্লাহ বলেন, "তোমরা যদি ধৈর্যশীল হও এবং মুত্তাকি হও তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না।" (৩:১২০)।

আর এ কারণেই আল্লাহপাক বলেছেন, "তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর।" (৩:২০০)।

অন্যদিকে রাসূল (সা.) বলেছেন, "রাগান্বিত হয়ো না। আর যদি রাগান্বিত হও, তা হলে বসে পড় এবং আল্লাহর বান্দাদের ওপর তাঁর ক্ষমতার কথা এবং তাদের প্রতি তাঁর ধৈর্যের কথা চিন্তা কর। আর যখন তোমাকে বলা হয় : আল্লাহকে ভয় করো, তখন তোমার ক্রোধকে দূরে ঠেলে দাও এবং ধৈর্য ও সহিষ্ণুতায় প্রত্যাবর্তন কর।" তিনি আরো বলেছেন, "পুণ্যের দরজা তিনটি: মনের উদারতা, মিষ্ট ভাষা, আর কষ্ট ও উৎপাতে ধৈর্যধারণ।"

বন্ধুরা, ধৈর্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর মূল্যবান কিছু বাণী শুনলে। আসরের এ পর্যায়ে আমরা ধৈর্য হারানোর পরিণতি সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। আর গল্পের পর থাকবে একটি গান। তো প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

পাতিহাঁস ও কচ্ছপ

ধৈর্য হারানোর পরিণতি

সবুজ শ্যামল চারণভূমি। পাহাড়ের ঢালে বিচিত্র ঘাসে ভরা। তারই পাশে হ্রদ। একেবারে নীল স্বচ্ছ পানিতে ভরা। হ্রদের ওই নীল পানিতে পাহাড় আর সবুজ গাছগাছালির প্রতিচ্ছবি। দেখলেই মনে হবে যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা।

ওই হ্রদে ছিল দুটি পাতিহাঁস আর একটি নিরীহ কচ্ছপের বাস। কচ্ছপের সাথে পাতিহাঁস দুটোর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। দীর্ঘদিন একসাথে থাকতে থাকতে যা হয়। হাঁস দুটো পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে যখন ক্লান্ত হয়ে যেত তীরে উঠে এসে কচ্ছপের সাথে ভালো মন্দ সব বিষয়ে গল্প করে সময় কাটাত। এভাবে তাদের কেটে গেল বহুদিন।

এক বছর বৃষ্টিপাত কম হলো। হ্রদের পানি তাই কমে যেতে যেতে শুকিয়ে যাবার অবস্থা হলো। পাতিহাঁসের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। তারা তো পানি ছাড়া বসবাস করতে পারে না। সে কারণে তারা সিদ্ধান্ত নিল অন্য কোথাও, অন্য কোনো হ্রদে চলে যাবে। পাহাড়ের উল্টো দিকেই ছিল আরেকটা হ্রদ। সেখানে যাবে বলে মনস্থির করল তারা। যাবার আগে তারা তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু কচ্ছপের সাথে দেখা করতে গেল।

কচ্ছপকে তারা বলল: ‘যদিও আমরা এখানে একসাথে দীর্ঘদিন কাটিয়েছি কিন্তু এ বছর তো দেখছ হ্রদের পানি শুকিয়ে গেছে। আমাদের তো সমস্যা হয়ে গেল। পানি ছাড়া তো আমরা থাকতে পারব না। তাই আমরা ভাবছি পাহাড়ের উল্টো দিকে যে হ্রদটা আছে সেখানে চলে যাবো। কিন্তু ভীষণ খারাপ লাগছে আমাদের তোমাকে ছেড়ে যেতে।’

কচ্ছপের মনটা ভেঙে গেল এ কথা শুনে। অশ্রুভেজা চোখে সে পাতিহাঁসদের বলল: তোমরা যদি আমাকে এখানে একা ফেলে যাও তাহলে আমি হার্ট অ্যাটাকে মারা যাব। চেষ্টা কর এমন কিছু করতে যাতে একসাথে আগের মতো সবাই বসবাস করতে পারি।’

পাতিহাঁসেরা বলল: ‘আমরাও চাই তোমার সঙ্গেই থাকতে। এক বন্ধুকে ফেলে বসবাস করাটা দুষ্কর। কিন্তু কী আর করা। হ্রদ তো কয়েকদিনের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে। পানি ছাড়া আমাদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে যাবে।’

কচ্ছপ বিনয়ের সাথে বলল: প্রিয় বন্ধুরা আমার। তোমরা তো জানো, পানি ছাড়া আমার জন্যও বসবাস করা তোমাদের মতোই কঠিন। তাই বলি কী! তোমরা যেখানেই যাও আমাকেও তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো।

পাতিহাঁসেরা বলল: হে প্রিয় বন্ধু! আমরাও সেটাই চেয়েছিলাম যে তোমাকে এখানে একা রেখে যাব না। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কী করে তুমি পাড়ি দেবে। আমরা তো উড়াল দেব। কিন্তু তুমি তো উড়াল দিতে পারবে না। তোমার জন্য ওই হ্রদটার দূরত্ব অনেক।

কচ্ছপ বলল: কোনো কাজই অসাধ্য নয়। তোমরা তো আমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করে একটা পথ বের করে ফেলতে পারবে। আমাকে যদি এখানে একা ফেলে রেখে যাও তাহলে কিন্তু বন্ধুত্বের অমর্যাদা করা হবে।

একটা হাঁস বলল: সত্যি বলতে কী আমরাও ভাবছি হয়ত কোনো একটা উপায় বেরিয়ে যাবে তবে খুবই কষ্টসাধ্য হবে হয়ত। অবশ্য তোমাকে যতোটা জানি অতো কষ্ট তুমি হয়ত করতে পারবে না।

কচ্ছপ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল: কেন? আমার কোন দোষটার জন্য এভাবে বলছ তোমরা?

হাঁসেরা বলল: তুমি একটু অধৈর্য আর বেশি কথা বলো। আর তোমার আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে। নিজের প্রতি নিজের আস্থা কম। হুট করেই তুমি রেগে যাও। তোমাকে কেউ কিছু বললে যদি তোমার মনোপুত না হয় তুমি রেগেমেগে ঝগড়া শুরু করে দাও। তাছাড়া তুমি কে কী করছে সেটা জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে পড়। তুমি এমনকি একটা মুহূর্তও চুপ করে থাকতে চাও না, স্থির থাকতে চাও না। যদি আমাদের সঙ্গে যেতে চাও তাহলে তোমাকে কিছু কিছু কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

কচ্ছপ বলল: আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়ার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। নিজের দোষ সম্পর্কে সচেতন না হয়ে কেউ তা শোধরাতে পারে না। তোমরা দেখবে আমি কীভাবে নিজের দোষগুলো শুধরে নিয়েছি। আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি তোমরা যেরকম ব্যবহার আমার কাছ থেকে আশা কর সেরকম আচরণই করব।

পাতিহাঁসেরা বলল: আমরা তো তোমাকে বহুবার পরীক্ষা করেছি। তাতে আমাদের বুঝতে বাকি নেই যে, তুমি তোমার কথা রাখতে পারবে না। তারপরও যেহেতু আমরা তোমাকে আমাদের সাথে রাখতে চাই, সেজন্য তোমাকে কথা দিতে হবে পুরো রাস্তায় তুমি একটি শব্দও করতে পারবে না। যদি এই কথা তুমি দিতে পার তাহলে হয়তো আমরা সফল হতে পারি।

কচ্ছপ বলল: এটা তো খুবই সহজ একটা শর্ত দিলে। শব্দ করা তো দূরের কথা, আমি প্রয়োজনে শ্বাস প্রশ্বাসও নেব না।

পাতিহাঁসেরা এবার বলল: মনোযোগের সাথে শোন! এটা হলো এক টুকরো কাঠ। তুমি কাঠের মাঝখানে ভালো করে কামড়ে ধরবে। আমরা কাঠের দুই প্রান্ত ধরে উড়াল দেব। দ্রুতই আমরা চলে যাবে ও পাশের হ্রদে। কিন্তু মনে রাখবে লোকজন আমাদের দেখে হাসতে পারে এমনকি ঠাট্টাও করতে পারে। তুমি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সহ্য করবে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। একদম কোনো কথা বলবে না, এমনকি একটি শব্দও না।

কচ্ছপ তা মেনে নিল।

পাতিহাঁসেরা এক টুকরো কাঠ সংগ্রহ করল। কচ্ছপ তার মাঝখানে কামড়ে ধরল। হাঁসেরা দুই পাশ ধরে উড়াল দিল গন্তব্যে। জনবসতিপূর্ণ গ্রাম পাড়ি দিল তারা।

গ্রামবাসীদের একজন তাদেরকে দেখে অন্যদেরকেও দেখাল। যে-ই দেখল অবাক হয়ে গেল এবং এই দৃশ্য অপরকে দেখাল। অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে গুঞ্জন উঠল। কচ্ছপ ওই শোরগোল শুনে বিরক্ত হয়ে গেল। কিন্তু যেহেতু কথা দিয়েছে তাই চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলল না। তবে মনে মনে ভাবল: মানুষেরা কীরকম বে-ইনসাফ! একটা কচ্ছপকে উড়তে দেখে হিংসায় বাঁচে না তারা।

পাতিহাঁসেরা উড়ছে আর কচ্ছপ ভাবছে আর ভাবছে। নীচে লোকজনও শোরগাল তুলছে। কচ্ছপের কানে ভেসে এল একজনের কথা। বলছিল: দেখো! কী অপূর্ব বন্ধুত্ব! আকাশেও তারা একসাথে উড়ছে। আরেকজন বলল: কচ্ছপ ভাবছে সে উড়তে পারছে।

কচ্ছপ এবার আর সহ্য করতে পারল না। চিৎকার করে বলে উঠল: ‘হিংসুকদের চোখে ধুলা পড়ুক’। কথাটা বলতেই কাঠের টুকরো থেকে তার মুখ ছুটে গেল আর অমনি কচ্ছপ নীচে পড়ে গেল। অতো উপর থেকে পড়ে তার খোলস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এবং মরে গেল। পাতিহাঁসেরা এই দৃশ্য উপর দেখল। তারা কাঠের টুকরোটি ফেলে দিল এবং নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাল।

পাতিহাঁসেরা নিজেদের মাঝে বলাবলি করছিল: আমাদের দায়িত্ব ছিল যথাযথভাবে উপদেশ দেয়া, দিয়েছি। কিন্তু উপদেশ শোনার জন্য ধৈর্য আর নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের প্রয়োজন।

বন্ধুরা! কখনো ধৈর্য হারাতে নেই। দেখলেতো, ধৈর্যহীন হলে কিংবা উপদেশ না শুনলে কী হয়? তো আমরা আশা করি, এ গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে তোমরা ধৈর্যশীল হওয়ার চেষ্টা করবে। #

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।