রংধনু আসর: সিংহ, শিয়াল ও গরু
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আজকের আসরে তোমাদের জন্য রয়েছে সিংহ, শিয়াল ও গরুকে নিয়ে একটি গল্প। গল্পের পর থাকবে শিয়াল সম্পর্কে একটি ছড়াগান। এরপর শিয়াল সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য ও একটি কবিতা। আমাদের এ অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
এক ব্যবসায়ী দুটি গরু নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পথিমধ্যে গরু দুটি একটা কাদার গর্তে পড়ে গেল এবং দুটি গরুর একটি মরে গেল আর বাকি গরুটা ভীষণভাবে আহত হলো। ব্যবসায়ীও তাকে ফেলে রেখে চলে গেল। আহত গরুটা অনেক চেষ্টা করে ওই কাদার গর্ত থেকে উঠে এলো।
কাছেই ছিল তৃণবহুল চমৎকার একটা লন। গরুটা সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিল। কয়েকদিনের মধ্যে সে সুস্থ হয়ে গেল। সবুজ এবং তরতাজা ঘাস লতাপাতা খেয়ে বেশ নাদুসনুদুস হয়ে উঠল এবং উচ্চস্বরে ‘হাম্বা’ ডাকতে শুরু করল।
এই হাম্বা ছিল তার জীবন ফিরে পাবার আনন্দ সংগীত। সবুজ তৃণবহুল লনটি ছিল একটা সিংহের বিচরণ ক্ষেত্র। সিংহ মানে ওই অঞ্চলের সকল প্রাণীর নেতা। পশু সিংহ এর আগে কখনোই তার বিচরণ ভূমিতে ‘হাম্বা’ ডাক শোনে নি। সে জন্য এই শব্দ শুনে সিংহের মনে ভয় ঢুকে গেল। কিন্তু কিছুই সে প্রকাশ করল না।
সিংহের দরবারে দুটি শিয়াল বাস করত। একটির নাম কালিলা অপরটির নাম ছিল দিমনা। দিমনা ছিল বেশ লোভী এবং সুযোগ সন্ধানী। সে সারাক্ষণ সিংহের পাশে থাকতে চাইতো এবং চাইতো সিংহের উপদেষ্টার পদটি পেতে। সিংহ যে গরুর হাম্বা রব শুনে ভয় পেয়েছে এই শিয়ালটি মানে দিমনা তা টের পেয়ে গেল। দিমনা গরুর শব্দ শুনে বেরিয়ে গিয়ে গরুকেও দেখতে পেল।
সে গরুর সাথে আলাপ আলোচনা জমিয়ে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার চিন্তা করলো এবং তাই করলো। বন্ধু বানানোর পর দিমনা গরুকে নিয়ে সিংহের দরবারে হাজির হল। সিংহের ভয় এবং আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে শিয়াল সিংহের কাছে যাবার সুযোগ পেয়ে গেল। দিমনা সিংহের ভয়ের কারণ জানতে চাইল। তারপর বলল এই সেই গরু যে নতুন এসেছে এই তৃণভূমিতে। ওর হাম্বা ডাক শুনেই তুমি ভয় পেয়েছিলে। তাই ওকে তোমার কাছে নিয়ে এলাম।
গরুকে সিংহের ভালোই লাগল। সিংহ তাকে কাছে টেনে নিল এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করে কাজ করতে লাগল। কিন্তু এ বিষয়টা দিমনার মোটেই ভালো লাগল না। সহ্য হচ্ছিল না তার। হিংসা জেগে উঠল তার মনের গহীনে। কারণটা হলো সে ভাবতো গরু বুঝি তার স্থানটা দখল করে নিল। তাই সে ভেতরে ভেতরে গরুকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। কিন্তু কী করে তা সম্ভব! শিয়াল অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল কথায় বার্তায় সিংহের কাজে গরুকে অসহ্য করে তুলবে।
গরুর বিরুদ্ধে এভাবে মারাত্মক ষড়যন্ত্র শুরু করে দিল শিয়াল দিমনা। কিন্তু শিয়াল দিমনা কী বলবে তার বিরুদ্ধে। কিছুই তো বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না। অবশেষে শিয়াল মিথ্যা অপবাদ দিতে শুরু করল গরুর বিরুদ্ধে। প্রায়ই সিংহের কাছে বানিয়ে বানিয়ে গরুর বিরুদ্ধে নালিশ ও অভিযোগ করতে লাগল।
মিথ্যা অভিযোগ করতে করতে এক সময় শিয়াল একেবারে প্রকাশ্যে এমনকি অনেক সময় গরুর সামনেই সিংহের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে শুরু করে দিল। সিংহের কান ভারি হতে হতে একেবারে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। সিংহের মনের ভেতর গরুর ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক চিন্তা জন্ম নিল। এতোই অসহ্য হয়ে পড়ল সিংহ যে একদিন সত্যি সত্যিই গরুকে মেরে ফেললো সে।
দিমনা তো ষড়যন্ত্র করে গরুটাকে মেরে ফেলল। কিন্তু দিমনার বন্ধু কালিলা শুরু থেকেই দিমনার ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে জানতো। সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। দিমনার এ রকম হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছিল সে কিন্তু দিমনা সেসব কানেই তুলতো না।
এদিকে নিরীহ গরুটাকে মেরে সিংহ খুব অনুতাপ বোধ করল। খুবই খারাপ লাগছিল তার। কিন্তু দিমনা চেষ্টা করছিল সিংহকে বোঝাতে যে সে যা করেছে ভুল করেনি, ঠিকই করেছে।
সিংহকে তার অনুতপ্ত অবস্থা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করল দিমনা। ইতোমধ্যে দিমনার বন্ধু কালিল সে তো এমনিতেই দিমনার শত্রুতামূলক কাজকর্মের জন্যে ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিল এবং দিমনাকে প্রায়ই তিরস্কার করতো এমনকি এইসব মন্দ কাজের পরিণতি যে মারাত্মক বিশেষ করে মিথ্যে কথা চালাচালি করে সিংহকে গরুর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং গরুর বিরুদ্ধে ফেতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী উল্টাপাল্টা কথা লাগানোর কারণে একদিন যে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে সে ব্যাপারেও দিমনাকে সবসময় বলতো।
এক রাতে এইসব কথা বলাবলি করছিল কালিলা আর দিমনা। ঘটনাক্রমে ওইরাতে একটা চিতাবাঘ কালিলা আর দিমনার কথাবার্তা ভালো করে শুনে ফেলল। তাড়াতাড়ি করে চিতাবাঘ সেইসব কথা সিংহের মায়ের কাছে গিয়ে বলে দিল। সিংহের মা তো চিতাবাঘের কথা শুনে একেবারে তেলেবেগুনে ক্ষেপে গেল। সে অন্যায় একদম সহ্য করতে পারত না।
গরুর ওপর যে অন্যায় করা হয়েছে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না সিংহের মা। দেরি না করে সে তাই তার ছেলে সিংহের কাছে গেল। সিংহ তার মাকে দেখে খুশি হলো কিন্তু মায়ের চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ দেখে জানতে চাইলো ‘কী হয়েছে’।
সিংহের মা তখন সমস্ত ঘটনা ছেলের কাছে খুলে বললো। সিংহ প্রকৃত ঘটনা শুনে যার পর নাই উত্তেজিত হয়ে উঠল। উপরন্তু মাও তাকে বলল এই ষড়যন্ত্রের প্রতিশোধ অবশ্যই নিতে হবে, শিয়াল দিমনাকে যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে আর কেউ কখনো এ রকম ষড়যন্ত্র করার সাহস না পায়।
গরুর রক্তমূল্য নিতেই হবে- এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে মা সিংহকে উদ্বুদ্ধ করল। সিংহ উপায়ন্তর না দেখে একটা পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করল। তার পরামর্শরা, দরবারের সভাসদরা, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা- সকলেই ওই বিশেষ বৈঠকে উপস্থিত হলো।
দিমনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হলো সেইসব অভিযোগের পক্ষে যথাযথ দলিল প্রমাণও হাজির করা হল। চারদিক থেকে যখন দিমনার বিরুদ্ধে একের পর এক তার অন্যায়ের প্রমাণপঞ্জি পেশ করা হল, পশুরাজ সিংহ তখন বাধ্য হলো দিমনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিতে।
দিমনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর কালিলা একবার দিমনার দিকে তাকালো। মনে মনে বললো আগেই বলেছিলাম- এসব করো না। পাপের শাস্তি একদিন না একদিন ভোগ করতেই হবে, শুনলে না। দিমনাও কালিলার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে মনে মনে কালিলার কথায় সায় দিলো। অবশেষে দিমনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। কিন্তু গরু তো আর ফিরে পেল না তার প্রাণ।
শিয়াল সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য
বন্ধুরা, দুই শিয়াল কালিলা ও দিমনাকে নিয়ে গল্পটি শুনলে। এ পর্যায়ে রয়েছে চতুর প্রাণি শিয়াল সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য।
শিয়াল হচ্ছে কুকুর ও নেকড়ের জাতভাই এবং এর সবাই ক্যানিডি পরিবারের সদস্য। পৃথিবীতে তিন প্রজাতির শিয়াল আছে। কালো-পিঠ ও পাশ-ডোরা প্রজাতির শিয়াল আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোতে বাস করে। আর সোনালি বা এশীয় প্রজাতির বিস্তৃতি- পূর্ব ইউরোপ, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত। আমাদের দেশের শিয়াল পণ্ডিত এই এশীয় প্রজাতিভুক্ত।
শিয়াল দেখতে নেকড়ের মতো হলেও আকারে কুকুরের চেয়ে কিছুটা ছোট; অনেকটা দেশি নেড়ি কুকুরের সমান। এদের মুখ লম্বাটে। লেজ ফোলা এবং সব সময় নিচের দিকে নামানো থাকে। গায়ের রং গাঢ় বাদামি, দেহের ওপরের অংশ কালচে আর নিচের অংশ হালকা বাদামি, যা অনেকটা সাদাটে দেখায়। মুখমণ্ডলের নিচ থেকে গলা পর্যন্ত অংশটি সাদাটে। গলায় একটা সাদা মালার মতো আছে।
শিয়াল খোলামেলা অঞ্চলের বাসিন্দা। দিনে সাধারণত ঝোপঝাড় বা গর্তে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার পর শিকারে বের হয়। সন্ধ্যারাত ও ভোররাতে উচ্চস্বরে হুক্কা হুয়া বা কেক-কেক-কা-হু স্বরে ডাকে। এরা একাকী, জোড়ায় বা দলে থাকে। অনেক সময় বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে দল বেঁধে দিনের বেলায়ও বেরোয়।
শিয়াল মূলত মাংশাসী হলেও এরা সর্বভুক প্রাণী। ইঁদুর, পাখি, হাঁস-মুরগি, গুইসাপ, সাপ, কাঁকড়া, মাছ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। শকুন, চিল বা অন্যান্য শিকারি প্রাণীর শিকারের উচ্ছিষ্টাংশ, মরা-পচা প্রাণী, ডাস্টবিনের ময়লা খাবার, এমনকি কবর খুঁড়ে মরা লাশও খেয়ে থাকে। এ ছাড়া ভুট্টা, আখ, তরমুজ, আম-কাঁঠাল, খেজুরের রস—এসবও খায়। শিয়াল বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে কুকুর-ছাগল-ভেড়ার বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। এরা কুকুরকে বেশ ভয় পায়।
চালাক-চতুর হলেও শিয়াল কিছুটা ভীতু স্বভাবের। এদের ঘ্রাণশক্তি প্রবল। লেজের নিচের দিকের গ্রন্থির দুর্গন্ধ দিয়ে শত্রুদের তাড়ায়। এরা দ্রুতগতির প্রাণী; কুকুরের চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়।
কুকুরের মতো শিয়ালও জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আর তাই পাগলা কুকুরের মতো পাগলা শিয়ালের কামড়েও মানুষ বা অন্যান্য পশুর জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিয়াল মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করে। বছরে দু'বার বাচ্চা দেয়। স্ত্রী শিয়াল ৫৭-৭০ দিন গর্ভধারণের পর চার থেকে ছয়টি বাচ্চা দেয়। প্রায় ১২ দিনে বাচ্চার চোখ ফোটে। চোখ ফোটার পর বাচ্চারা গর্তের বাইরে এসে যখন খেলা করে, দেখতে বেশ লাগে। এরা সাধারণত ১০-১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
বন্ধু, শিয়াল সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য জানলে। এবারে তোমাদের জন্য রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত লিচু চোর কবিতাটি। এটি আবৃত্তি করেছে চট্টগ্রামের বন্ধু আরবার বিন সিদ্দিক।
তো বন্ধুরা, দেখতে দেখতে আমাদের সকল আয়োজন এক এক করে শেষ হয়ে এলো। তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো আগামী আসরে। সে পর্যন্ত সবাই ভালো, সুস্থ থেকো ও নিরাপদে থেকো।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।