অক্টোবর ১৮, ২০২০ ১৫:২২ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, মানুষের কথা হুবহু নকল করতে পারার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত ময়না ও তোতা পাখি। পাখিপ্রেমীদের কাছে দু’টি পাখিই বেশ কাঙ্ক্ষিত। সহজে পোষ মানিয়ে এদের কথা শেখানো যায়। তাই মানুষকে সঙ্গ দিতে পারে এরা। কিন্তু সব পাখি কেন কথা বলতে পারে না? আর ময়না বা তোতারই কী বিশেষ ক্ষমতা আছে যে তারা কথা বলতে পারে? চলো জেনে নেয়া যাক। 

তোতা পাখির বেশ লম্বা ও পুরু একটি জিহ্বা রয়েছে। বাজপাখি বা ঈগলের জিহ্বাও বেশ পুরু। তবে তারা কিন্তু মানুষের স্বর নকল করতে পারে না। আবার ময়না পাখির জিহ্বা পুরু কিংবা লম্বা না হওয়ার পরও তারা সে স্বর নকল করতে পারে। তাহলে পার্থক্য কোথায়?

মূল বিষয় হলো তোতা ও ময়না পাখি অন্য পাখির চেয়ে বুদ্ধি অনেক বেশি। এজন্য এরা কণ্ঠস্বর নকল করতে পারে। এদের কথা বলা ও শোনার যান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ ধীরগতি সম্পন্ন। ফলে যে শব্দ এদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে তা মানুষের কণ্ঠস্বরের মতোই মনে হয়।

তবে মজার ব্যাপার হলো- এরা যেসব কথা বলে তার অর্থ কিন্তু বোঝে না। মানুষের ঠোঁট নাড়ানো দেখে সেটাই নকল করে তোতা ও ময়না। বন্ধুরা, আজকের আসরে তোতা পাখি সম্পর্কে আরও কিছু জানা-অজানা তথ্য শুনব। তার আগে রয়েছে তোতা পাখিকে নিয়ে মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির লেখা দুটি গল্প। আর সবশেষে থাকবে ঢাকার দুই সহদর ভাই-বোনের সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

এক দেশে ছিল এক সওদাগর। তার ছিল এক কথাবলা তোতা পাখি, সেই পোষা তোতাকে সে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল। একদিন সওদাগর সিদ্ধান্ত নিল ব্যবসার কাজে সে ভারতবর্ষ ভ্রমণে যাবে। যাওয়ার আগে সে তার দাস-দাসীদের কাছে জানতে চাইল তারা ভারতবর্ষ থেকে কী কী উপহার চায়। একেকজন একেক কিছু চাইল।

সওদাগর সবার কথা শুনে এবার তোতার কাছে গিয়ে বলল: প্রিয় তোতা আমার! আমি এখন তোর জন্মভূমির দিকে রওনা হচ্ছি। ভারতে তোর আত্মীয়-স্বজনের কাছে কোনো খবর পাঠাতে চাস কিনা। কিংবা তোর জন্য কিছু আসতে হবে কিনা?

তোতা একটু ভেবে বলল: ভারতের সবুজ-শ্যামল বনজঙ্গল যেখানে আমি ও আমার বন্ধুরা বসবাস করতাম সেখানে পৌঁছে ওদের কাছে আমার সালাম পৌঁছে বলো যে, আমি ওদের দেখার জন্য উতলা হয়ে আছি। ওদের বলো- আমিও ওদের মতো মুক্তভাবে সবুজ বন ও আকাশে উড়ে বেড়াতে চাই। ওদের সাথে আনন্দ উল্লাসে শরীক হতে চাই।  

তোতা আরও বলল, ‘আমার বন্ধুদের জানিও যে, আমি তাদের কথা ভুলিনি। দিনের আলো ফোটার আগে কুয়াশায় আর রোদের মধ্যে একসঙ্গে উড়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ে আমার। মনে পড়ে আমরা দলবেঁধে এক গাছ থেকে উড়ে গিয়ে আরেক গাছে বসতাম। তাদেরকে বলো, আমার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গেছে আমি। তারা যেন আমার কথা স্মরণ করে।

সওদাগর তোতার দুঃখভরা কথা শুনে খুবই কষ্ট পেল। তবে কথা দিল যে, নিশ্চয়ই সে ভারতের স্বাধীন তোতাদের কাছে তার খবর পৌঁছে দেবে।

ভারতে পৌঁছেই সওদাগর তোতা পাখির একটা ঝাঁক দেখতে পেল। আর চেঁচিয়ে বলল, ‘তোমরা থামো! থামো! তোমাদের জন্য তোমাদের এক ভাই খবর পাঠিয়েছে।’

সওদাগর তার পোষা তোতার বন্দি থাকার খবর পৌঁছে দিল। একথা শোনামাত্র তোতার ঝাঁকের মধ্যে একটা তোতা টুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। পড়ে গিয়ে তড়পাতে তড়পাতে মারা গেল।

সওদাগর মনে মনে বলল, ‘আহা! এটা আমি কী করলাম! এই তোতাটা নিশ্চয়ই আমার পোষা তোতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ভাইয়ের বন্দি থাকার শোকে সে মরেই গেল! দেশে পৌঁছে তার মৃত্যুর খবরটা জানাতে হবে।’

সওদাগর খুব মন খারাপ করল, এমন বাজে খবর দেওয়ার জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবল। আত্মীয় স্বজনের জন্য নানা উপহার উপঢোকন নিয়ে দেশে ফিরে এলো সওদাগর। এসে পোষা তোতার কাছে গেল। তোতা বলল, ‘বলো আমার ভাইয়েরা আমার কথা শুনে কী বলল?’

সওদাগর বলল, ‘আমি বলতে পারব না। সে ভারি দুঃখের কথা।’

তোতা বলল, ‘না, তোমাকে বলতেই হবে। আমার খবর শুনে কী জানিয়েছে তারা?’

সওদাগর জানাল- তোর বন্দি থাকার খবর শুনে একটা তোতা তখনই মাটিতে পড়ে মারা গেছে।

এই খবর শোনামাত্র সওদাগর পোষা তোতা খাঁচার ভেতর তড়পাতে তড়পাতে নিস্তেজ হয়ে গেল।

এবার নিজের পোষা তোতার মৃত্যুতে আরও মন খারাপ হলো সওদাগরের। সে খাঁচার দরজা খুলে তোতার মরা দেহটা বের করে আনল আর বাইরে ছুড়ে ফেলল।

যেই না তোতাকে বাইরে ছুড়ে ফেলা হলো- তখনই তোতা তার পা মেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর ডানা ছড়িয়ে উড়ে গেল।

পেছন থেকে সওদাগর চিৎকার করে জানতে চাইল, ‘তোমার জ্ঞাতি ভাই তোমার কাছে কী সংবাদ পাঠিয়েছিল, আমাকে বলে যাও।’

মুক্ত হয়ে যাওয়া তোতা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বলল, ‘আমার ভাইটি আমাকে মরে যাওয়ার ভান করার পরামর্শ দিয়েছে, যেন আমি বন্দি খাঁচা থেকে পালাতে পারি।’

মুদি দোকানদার ও তোতা পাখি

বন্ধুরা, এবার তোতা পাখিকে নিয়ে একটি মজার গল্প শোনা যাক। এক মুদি দোকানদারের একটি সুরেলা তোতা পাখি ছিল। সেই তোতা পাখিটি মানুষের ভাষা খুব ভালোভাবেই জানত। দোকানের প্রহরী এবং ক্রেতাদের সাথে সে কথা বলত।

একদিন দোকানদার বিশ্রামের উদ্দেশ্যে বাসায় গেল এবং যথারীতি তোতা পাখিটি একাকি দোকানে ছিল। হঠাৎ একটা বিড়াল ইঁদুর ধরার জন্যে দোকানের ভেতরে ঢুকল। তোতা পাখিটি বিড়ালকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

সে একেবারে কোণায় গিয়ে পালাতে চেয়েছিল আর অমনি বাদাম তেলের বোতলগুলোতে বাধাগ্রস্ত হয় আর বোতলগুলো নীচে পড়ে যায়। দোকানদার যখন ফিরে এসে দেখল যে, সারা দোকানে তেল আর তেল, ভীষণ রেগে গেল এবং তোতার মাথায় আঘাত করে। আঘাত পেয়ে তোতার মাথাটা ন্যাড়া হয়ে যায়। ফলে তোতা পাখিটি চুপচাপ দোকানের এক কোণে গিয়ে বসে থাকে।

তোতা পাখির এই নীরবতায় দোকানদার ভীষণ কষ্ট পেল। সে তোতার কথা খুবই উপভোগ করত। এখন পাখির কণ্ঠ রোধ হয়ে আসায় নিজের কাজের জন্যে অনুতপ্ত হল। দোকানদার আগের অবস্থায় ফিরে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। অগত্যা চুপ মেরে গেল। এমন সময় ন্যাড়া মাথার এক তাঁতের কারিগর দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখেই তোতা পাখিটি বলে উঠল-

তুই কেন ন্যাড়া? তুইও কি তেলের বোতল ভেঙেছিস?

মানুষ তোতার এ রকম মজার কথা শুনে হাসল।

তোতা পাখি সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য

বন্ধুরা, পরপর দুটি গল্প শুনলে। এবার আমরা তোতা পাখি সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য তোমাদেরকে জানাব।

  • বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর পাখিগুলোর মধ্যে অন্যতম তোতা পাখি। বাহারি রং আর আপন করে নেয়ার গুণের জন্য তোতা পাখি অনেকেরই প্রিয়।এদের বড় মাথা ও বাঁকানো হুকের মতো ঠোট বৈশিষ্ট্যময়। এদের লেজ লম্বা। এরা মানুষের স্বর অনুকরণ করতে সক্ষম।
  • তোতাপাখির ৩২০টির বেশি প্রজাতি রয়েছে। বিশ্বজুড়ে তোতা পাখির চেহারা, রঙ এবং অভ্যাস ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। তবে তারা কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, তাদের সবার বাঁকা ঠোট আছে।  
  • তোতা পাখি সাধারণত গাছের গর্তের মধ্যে বাসা তৈরি করে। বেশিরভাগ তোতাপাখি ফল, ফুল, বাদাম ও বীজ খেয়ে বেঁচে থাকে। কিছু প্রজাতি আবার ছোট পোকামাকড় খায়। কিছু প্রজাতি বিভিন্ন উপায়ে মানুষের আচরণের প্রতি পারস্পরিক অনুগ্রহ প্রদর্শন করে।
  • বাংলাদেশে রয়েছে সাতটি প্রজাতির তোতাপাখি। এরমধ্যে ‘রিং-নেকড প্যারাকিট’ ঢাকা জুড়ে পার্ক এবং গাছসহ সারা দেশে দেখা যায়। বাংলাদেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, মাদাগাস্কার, ব্রাজিল এবং ইতালিতে তোতা পাখি দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে রঙিন এক প্রজাতি রেনবো লোরাইকেটের সন্ধান পাওয়া যায়। দ্বীপ মহাদেশটিতে ক্ষুদ্র, সূক্ষ্ম তোতাপাখি থেকে বড় লাল-পুচ্ছ কালো সাদা সালফার-ক্রেস্টেড কাকাতোয়া পর্যন্ত অত্যাশ্চর্য বৈচিত্র্যময় প্রজাতির তোতা পাখির সন্ধান পাওয়া যায়।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।