নভেম্বর ১৩, ২০২০ ১৬:২৯ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? আশা করি পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ভালো ও সুস্থ আছ। সপ্তাহ ঘুরে রংধনুর আসর সাজিয়ে তোমাদের মাঝে আবারো হাজির হয়েছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, আল্লাহপাক যে ১৮ হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন তার প্রত্যেকেটারই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মানুষ যেসব কাজ করতে পারে, কোনো পশুর পক্ষে তা সম্ভব নয়। আবার একটা পশু যা করতে পারে ছোট্ট একটা পাখির পক্ষে তা করা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু তারপর অনেক মানুষ কিংবা পশু-পাখিকে দেখা যায় অন্যের অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি ডেকে আনতে।  

বন্ধুরা, তোমরাও নিশ্চয়ই পড়াশোনা, আচার-ব্যবহার, জ্ঞানার্জনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বন্ধু, শিক্ষক কিংবা মহান ব্যক্তিত্বদের অনুসরণ ও অনুকরণ করার চেষ্টা করো। কাউকে অনুকরণ করা খারাপ কিছু নয়, তবে, অন্ধ অনুকরণ করা অবশ্যই দোষণীয়। ইসলাম ধর্মে অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে কাজই করো না কেন, তা আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য করো। কাজটি করার আগে ভেবেচিন্তে দেখতে হবে যে, এ কাজটি আল্লাহপাক পছন্দ করবেন কিনা?

পূর্বপুরুষদের ধর্মের অন্ধ অনুসারীদেরকে কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। এমন লোকদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।  

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তার অনুসরণ কর’, তখন তারা বলে, বরং আমরা তারই অনুসরণ করব যার ওপর আমাদের পিতৃপুরুষদের পেয়েছি। তাদের পিতৃপুরুষরা যদি মোটেই বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করে থাকে এবং সঠিক পথ প্রাপ্ত না হয়ে থাকে তবুও কি তারা তাদের অনুসরণ করবে? আর যারা কাফের হয়েছে তাদের উপমা হচ্ছে তার ন্যায় যাকে ডাকা হলে সে হাঁকডাক ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না; তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, সুতরাং তারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে না।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৭০-১৭১)

বন্ধুরা, অন্ধ অনুকরণের বিষয়ে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি জানলে। এবার আমরা পাখিদের মধ্যে অনুকরণ প্রবণতা ও এর পরিণতি সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে একটি সাক্ষাৎকার। তাহলে প্রথমেই শুরু হচ্ছে আমাদের আজকের গল্প অনুকৃতির পরিণতি।

তিতির পাখি দেখতে বেশ সুন্দর। আকারে ছোটো। তিতির পাখির হাঁটা কিংবা নাচ আরও বেশি সুন্দর। সকল পাখিই মোটামুটি তিতিরের হাঁটা চেয়ে চেয়ে দেখত। কেমন যেন গর্বের সাথে হাঁটে তিতির। যে-ই দেখতো তার হাঁটা সে-ই আকৃষ্ট হয়ে যেত। দূর থেকে তিতিরকে হাঁটতে দেখলেই সব পাখি তাদের খাবার খোঁজার চেষ্টা বাদ দিয়ে কিংবা আকাশে ওড়া বন্ধ করে দিয়ে গাছের ডালে গিয়ে বসত আর মজা করে দেখত কীভাবে হাঁটে তিতির। যেসব পাখির ভালো লাগত এই তিতির পাখির হাঁটা, তাদের মাঝে দাঁড়কাকও ছিল। তার মনেও তিতির পাখির মতো সুন্দর করে হাঁটার শখ জাগল। শখ তো জাগতেই পারে, সেটা কি দোষের?

অন্যান্য পাখি যেভাবে মনোযোগের সাথে তিতিরের পথ চলার ভঙ্গি উপভোগ করতো, কাকও ঠিক তেমনিভাবেই প্রথম প্রথম উপভোগ করছিল তিতিরের হাঁটা। উজ্জ্বল কালো দু’চোখে কোনো পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকতো সেও। মনে মনে কাকও যেন হাঁটত তিতিরের সাথে। একসময় তার মনে হচ্ছিল সেও তিতিরের মতো হাঁটতে জানে। না জানুক অন্তত চেষ্টা করলেই পারবে। কেন পারবে না! সে-ইবা কম কীসে। তিতিরের চেয়ে তার তো কোনো কিছুতেই কমতি নেই। এরকম ভাবত কাক।

মনে মনে একদিন নিজেকে সে তিতিরের সাথে তুলনা করতে বসল: “তিতিরের দুটি পাখা আছে, আমারও তো দুটিই পাখা, একটি তো না। তিতিরের একটা ঠোঁট আছে, আমারও আছে। তিতির পাখির শারীরিক গঠন আর আমার শারীরিক গঠন তো একইরকম প্রায়, খুব বেশি পার্থক্য তো নেই। সবই যখন একইরকম তাহলে তিতির অমন ছন্দে ছন্দে সুন্দর ভঙ্গিতে হাঁটতে পারলে আমি পারব না কেন? অবশ্যই পারব।”

এই বলে সে সিদ্ধান্ত নিল পরদিন থেকেই সে তিতিরের মতো হাঁটবে। যেই কথা সেই কাজ। পরদিন যখন তিতির তার নিজস্ব ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল কাকও হাঁটতে চেষ্টা করল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সব পাখিই তিতিরের হাঁটার ভঙ্গির দিকেই অপলক তাকিয়ে তাকিয়ে উপভোগ করল, কাকের হাঁটার দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না।

নিজের ওপর তার ভীষণ রাগ হলো আর তিতিরের প্রতি হলো প্রচণ্ড ঈর্ষা। কিন্তু হিংসা বা ঈর্ষা যাই হোক না কেন কাক নাছোড়বান্দা। সে সিদ্ধান্ত নিল যে করেই হোক তিতিরের ওপর থেকে সবার দৃষ্টি তার দিকে ফেরাবেই। এই সূক্ষ্ম ঈর্ষা কাকের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি পাল্টে দিল বিশেষ করে তিতিরের ব্যাপারে।

কাক এখন আর অন্যান্য পাখির মতো তিতিরের পথচলার ছন্দ উপভোগ করার পাত্র নয়। সে এখন থেকে তিতিরের প্রতিটি পদক্ষেপ মানে পা ফেলার ধরন ধারন খুবই সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখবে এবং অনুকরণ করার চেষ্টা করবে-এরকম একটা প্রতিজ্ঞা মনে মনে করে ফেলেছে। এমন কী গুণ আছে বা ঢং আছে তিতিরের হাঁটার মাঝে যে সবাই তাকে দেখে থমকে যায়, তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কাজকাম ফেলে রেখে তার হাঁটা দেখে-কাক তা একবার পরখ করতে চায়। শিখবে সে। কোনোভাবেই সে হারতে রাজি নয়। চরম আবেগ আর কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে কাক পরদিনের সূর্য ওঠার জন্য।

পরদিন সকালবেলা প্রতিদিনের মতোই সূর্য উঠল। প্রতিদিনের মতোই পাখিরা গান গেয়ে গেয়ে জাগিয়ে তুলল প্রকৃতিকে। প্রতিদিনের মতোই অন্যান্য পাখি অপেক্ষা করতে লাগল তিতির পাখির জন্য। কিন্তু কাকের জন্য আজকের দিনটি প্রতিদিনের মতো নয়। আজ তার জন্য দিনটা একেবারেই অন্যরকম। নতুন এক প্রতীক্ষা, নতুন এক পরীক্ষা আর নতুন কিছু শেখার দিন তার। কাক এভাবেই ভেবে ভেবে সকালটাকে ভিন্ন মাত্রা দিল। হাঁটার মাঝে এমন কী রহস্য লুকিয়ে আছে তাকে শিখতেই হবে। দৃঢ় এক প্রত্যয় নিয়ে কাক এভাবেই অপেক্ষা করছিল। ততক্ষণে তিতির পাখি এসে গেল। সবাই কিচির মিচির সুর তুলে যেন তাকে স্বাগত জানাল। কাক আগে থেকেই ঠিক তিতিরের চলার পথের প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।

তিতির যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল গভীর মনোযোগের সাথে কাক দেখছিল তিতিরের হাঁটার ছন্দ। সে চেষ্টা করল সেই ছন্দের তালে তালে ছন্দ মিলিয়ে হাঁটতে। প্রথম প্রথম নিজে নিজেই চেষ্টা করছিল। কিছুদিন অনুসরণ করার পর তিতিরের সাথে সাথে, পাশে পাশে কিংবা কখনো পেছনে পেছনে একই ঢঙে পথ চলার অনুশীলন করল কাক। সে যে কী কঠোর চেষ্টা, প্রাণান্ত অনুকরণ না দেখলে বোঝা কঠিন। তিতির যেভাবে পা তোলে, কাকও সেভাবেই পা তোলে। তিতির যেভাবে পা মাটির পরে রাখে কাকও ঠিক সেভাবেই তার পা মাটিতে রাখে। এভাবে অনুশীলন চলল বেশ কিছুদিন। কাক এবার মনে মনে ভাবল সে তিতিরের মতো হাঁটার ছন্দ শিখে ফেলেছে।

যথারীতি সব পাখি তিতিরের আসার দিকে চেয়ে থেকে অপেক্ষা করতে লাগল। কাক সেই অপেক্ষার মাঝে বেরিয়ে এলো সবাইকে চমকে দেওয়ার অপূর্ব বাসনা নিয়ে। সে ভাবল আজই সুবর্ণ সুযোগ। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে তিতিরের মতো হাঁটবে সে। আর সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে। তিতিরের কথা ধীরে ধীরে সবাই ভুলে যাবে।

কাক তার ধারণা অনুযায়ী তিতিরের মতো ঠিক ছন্দ মিলিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করল। মনে মনে ভাবল- পাখিরা এই বুঝি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে কিচির মিচির শব্দ তুলে পুরো বাগানটাকে সুরের মূর্ছনায় ভরে দিল। কিন্তু না। পাখিরা বরং একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করল। ভাবখানা এই কাক কী করছে এসব। তাকে তো কখনো এভাবে হাঁটতে দেখে নি তারা। তারা নীরব বিস্ময়ে একেবারে থ মেরে গেল।

কিছুক্ষণ পর সবাই নীরবতা ভেঙে কাককে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা শুরু করে দিল। কাক অকস্মাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থেমে গেল। একেবারে মাটিতে বসে পড়ল সে। পাখিরা একেবারে উপহাসের ঝড় বইয়ে দিল। কেউ বলল: ‘দেখ দেখ! বছরের পর বছর আকাশে উড়ে বেড়াবার পর এখনও দু’কদম হাঁটতে শিখল না। ছি! ছি! ছি!’ কেউবা বলল: “কাক মশাই! তোমার তিতিরের মতো হাঁটার কোনো দরকার নেই। তুমি আগে যেভাবে হাঁটতে সেভাবেই হাঁটো ভাই!”

এসব কথা শোনার জন্য কাক একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। তবে মনে মনে সে সচেতন হয়ে গেল এবং সিদ্ধান্ত নিল তিতিরের মতো হেঁটে কাজ নেই। তার মতোই সে হাঁটবে। কারণ সে বুঝে ফেলেছে তিতিরকে নকল করার ব্যাপারটা পাখিরা বুঝতে পেরেছে। এটা তার জন্য অপমানজনক। তাই সে নিজের মতোই পথ চলতে চেষ্টা করল। কিন্তু ততক্ষণে সে সব হারিয়ে বসেছে। সে আগে যেভাবে হাঁটতো সেটাও ভুলে গেছে। যতই চেষ্টা করল কিছুতেই কাজ হলো না। আশ্চর্য হয়ে গেল সে। নিজের চলার ভঙ্গি ভুলে বসে আছে তিতিরকে অনুকরণ করতে গিয়ে। এখন কী করবে কাক! হাঁটা ভুলে লাফিয়ে লাফিয়ে কিংবা কখনো লম্বা পদক্ষেপে চলতে লাগল।

এরপর থেকে যে বা যারাই আপন জীবন পদ্ধতি ফেলে রেখে অপরকে অনুসরণ করতে গিয়ে গোলমেলে জীবনযাপন করে তাদের উদ্দেশ্যে মানুষ বলতে শুরু করেছে: তিতিরের নাচ শিখতে গিয়ে কাক তার হাঁটাই ভুলে গেছে। যারা ভিনদেশি সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়ে ভুলে যায় আপন ঐতিহ্য তারাও কি এই কাকের উত্তরসূরি নয়? কী বলো বন্ধুরা!

আদিবা রহমান

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো ঢাকার এক বন্ধুকে। ওর নাম আদিবা রহমান।

তো রংধনু আসরে অংশ নেওয়ার জন্য আদিবা রহমান তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আর শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকে এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো পরবর্তী আসরে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।