রংধনু আসর : শিয়ালের তিনটি গল্প
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছ ভালো ও সুস্থ আছ। আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।
আজকের আসরের শুরুতেই আমরা তিনটি গল্প শোনাব। গল্পের পর থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই কুকুর, শিয়াল ও সিংহের গল্পটি শোনা যাক।
একদিন একটি কুকুর বনের পাশে একা একা ঘোরাঘুরি করছিল। হঠাৎ সে দেখল এক শিয়াল তার ছানাপোনা নিয়ে জঙ্গলে ঢুকছে। কুকুর দৌঁড়ে শিয়ালকে গিয়ে বলল, আমি বড্ড একা। যদি কিছু মনে না করো, আমরা কি একটা পরিবারের মতো থাকতে পারি না?
শিয়াল একটু ভেবে বলল, হ্যাঁ তা মন্দ হয় না। জঙ্গলে অন্য পশুদের উৎপাত যা বেড়েছে। একসঙ্গে থাকলে মোকাবিলা করা যাবে। আর বাচ্চাগুলোও রক্ষা পাবে।
কুকুর আর শিয়াল এবার থাকার জায়গা খুঁজতে লাগল। বনের ভেতর গাছপালা থাকলেও থাকার জন্য নিজেদের একটা গুহা দরকার। নয়তো রোদ বৃষ্টিতে শিয়াল ছানাগুলো মারা যাবে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা একটা গুহা পেল। কুকুর বলল, এটাই আমাদের ডেরা। শিয়ালও খুশি হলো। বাচ্চাগুলো তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে ভেতরে ঢুকল।
শিয়াল বলল, বাহ, বেশ বড় তো ডেরাটা! কিন্তু কুকুর বা শিয়াল কেউ-ই বুঝল না, ডেরাটা আসলে একটা সিংহের। সে গেছে শিকার ধরতে। তাই ডেরাটা ছিল খালি।
যাইহোক, কুকুর শিয়াল আর বাচ্চাগুলো ডেরার সামনে বসেই খোশগল্প করছিল। এমন সময় তারা দেখলো একটা সিংহ এগিয়ে আসছে ডেরার দিকে। ছানাগুলো ভয় পেয়ে গেল। তারা কাঁদতে শুরু করল। কুকুর শিয়াল দুজনে তাড়াতাড়ি ডেরার ভেতর ঢুকে পড়ল। এখন উপায়? সিংহ এসে নির্ঘাৎ তাদের সাবাড় করবে।
এদিকে, বাচ্চাগুলো কেঁদেই চলেছে। সিংহ আরমাত্র কয়েক কদম দূরে। কী করবে, কী করবে ভাবতে ভাবতে কুকুর আর শেয়ালের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
সিংহটা যখন গুহায় ঢুকতে যাবে তখনই কুকুর জোড়ে জোড়ে শিয়ালকে বলল, বাচ্চাগুলো এমন হাউমাউ করে কাঁদছে কেন গো?
উত্তরে শিয়ালও গলা উঁচিয়ে বলল, কাঁদবে না? কতোদিন ওরা সিংহের কলিজা খায় না!
কুকুর আরো জোড়ে বলল, দুই দিন আগেই তো সিংহের কলিজা আনলাম! সেটা দাও।
শিয়াল বেশ কায়দা করে বলল, ওটা তো বাসি হয়ে গেছে। আমার বাচ্চারা পঁচা কলিজা খায় না। সিংহের তাজা কলিজার মজাই আলাদা। ওরা ওটাই খাবে।
কুকুর বলল, ঠিক আছে, ওদের চুপ করতে বলো। একটা সিংহকে এদিকেই আসতে দেখেছি। দেখি ব্যাটা এসেছে কিনা। এলে এখনি ওর কলিজা নিয়ে আসছি।
সিংহ এসব কথাবার্তা শুনে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। সে ভাবল- ভেতরে নিশ্চয় ভয়ঙ্কর কোনো জন্তু আছে। বাপরে, বাচ্চাদের সিংহের কলিজা খাওয়ায়? এজন্যই তার ডেরায় ওঁৎ পেতে বসেছিল। সিংহকে আর পায় কে? এক দৌঁড়ে সে পালিয়ে গেল।
ওদিকে কুকুর, শিয়াল ছানাগুলো নিয়ে সুখে শান্তিতে ঐ ডেরায় বাস করতে লাগল।
(খরগোশ ও শিয়ালের গল্প)
বন্ধুরা, এবার আমরা এক খরগোশ ও শিয়ালের গল্প শোনাব। এ গল্পটাও খুব মজার।
এক খরগোশ আর এক শিয়াল একসাথে খাবারের খোঁজে বের হয়েছে। এটা ছিল শীতের সময়। গাছের পাতা ঝরে গেছে। ন্যাড়া গাছের ডালে বরফ জমতে শুরু করেছে। কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। প্রকৃতি হয়ে গিয়েছিল রুক্ষ আর শুষ্ক। হাজার খোঁজাখুঁজি করেও মাঠের মধ্যে তারা কোনো ইঁদুর বা পোকা-মাকড়ের সন্ধান পেল না।
শিয়ালটা খরগোশকে বলল- আবহাওয়াটাই কেমন জানি ক্ষুধা উদ্রেককারী। আমার পেট ক্ষিধের জন্য চোঁ চোঁ করছে।
খরগোশ উত্তর দিল- ঠিকই বলেছ। আমি যদি আমার নিজের কান মুখের মধ্যে পুরে দিতে পারতাম, তাহলে কান দুটোই চিবিয়ে খেতাম।
যাইহোক, পেটে দারুণ ক্ষুধা নিয়ে সামনের দিকে তারা এগিয়ে গেল। কিছু সময় পর তারা দেখল, খুব সুন্দর একটা মেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে একটা বেতের ঝুড়ি। তাই নিয়ে মেয়েটি হেলতে দুলতে তাদের দিকেই আসছে। ঝুড়িটার ভিতর থেকে খুব সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছিল। তারা বুঝল, এটা বিভিন্ন ধরনের খাবারে ভর্তি।
মেয়েটাকে আসতে দেখে শিয়ালটা বুদ্ধি করে বলল- এসো, একটা কাজ করি। তুমি মরার ভান করে পড়ে থাকো। আর জানোতো, খরগোশের চামড়া দিয়ে সুন্দর দস্তানা ও ব্যাগ হয়। মেয়েটা তার ঝুড়িটা রেখে কাছে আসবে তোমার চামড়া খুলে নেবার জন্য। আর ততক্ষণে আমি সব খাবার বের করে আনব। তারপর দু’জন মিলে খাব।
খরগোশ শিয়ালের কথামতো মরার ভান করে মাটিতে পড়ে রইল। শিয়ালটা একটা বরফের টিলার পেছনে লুকিয়ে রইল।
মেয়েটি সেখানে এসে দেখল, একটা খরগোশ হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে। তখন মেয়েটি তার ঝুড়িটা মাটিতে নামিয়ে রেখে তার কাছে এগিয়ে গেল।
ঠিক তক্ষুণি শিয়ালটা দৌড়ে ঝুড়িটা নিয়ে পালিয়ে গেল। এদিকে মেয়েটি কাছে আসতেই খরগোশটা উঠে পালিয়ে গেল।
খাবারের ঝুড়িটা এক ঝোপের ভেতর নিয়ে শিয়ালটা গপ্গপ্ করে খেতে শুরু করল। ঝুড়ির প্রায় সব খাবারই শিয়ালটা একা একা খেয়ে ফেলল। খরগোশটার জন্য কিছুই রাখল না বলতে গেলে। খরগোশটা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখল। এতে তার খুবই রাগ হলো। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না।
ঝুড়িতে অবশ্য আরো কিছু খাবার ছিল কিন্তু শিয়ালটা খরগোশকে এ ব্যাপারে কিছুই বলল না। তারপর তারা আবারো হাঁটতে শুরু করল।
হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা পুকুরের কাছে এসে গেল। তখন খরগোশটা বলল- এসো, একটা কাজ করা যাক, আমরা কিছু মাছ ধরি। তারপর দু’জনে মিলে জমিয়ে খাওয়া যাবে। তুমি শুধু তোমার লেজটা একটু পানিতে চুবিয়ে ধরো। আজকাল মাছেরা কিছু খেতে পাচ্ছে না। মাছগুলো তোমার লেজ দেখে কামড়ে ধরে ঝুলে পড়বে, আর অমনি তুমি টেনে তুলবে। দেরি করো না যেন।
পরিকল্পনাটা শিয়ালের খুব পছন্দ হলো। এতক্ষণ ঝুড়ির বিভিন্ন খাবার খেয়ে তার অরুচি ধরে গিয়েছিল। ভাবল, একটু স্বাদ বদলালে মন্দ হয় না। মাছের সাথে পাউরুটি জমবে ভালো।
শেয়াল খরগোশের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু তখন ছিল শীতকাল। আর পুকুরের পানি জমে যাবার উপক্রম হয়েছিল। শিয়াল কাঁধের ঝুড়িটা পুকুরের পাশে নামিয়ে রাখল।
শিয়ালটা এবার তার লেজ পানিতে ডুবিয়ে দিল। কিছু সময়ের ভেতরই তার লেজটা শক্তভাবে জমে আটকে গেল। নড়াচড়ার উপায় রইল না।
এই অবস্থা দেখে খরগোশ এগিয়ে এলো। তারপর ঝুড়িটা নিয়ে শিয়ালের সামনেই বসে বাকি খাবার খেয়ে ফেলল। শিয়ালটা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল।
খাবার শেষে সে শিয়ালটাকে বলল- কী আর করা, বরফ গলা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। বসন্তকাল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, তাতেই হবে। এরপর খরগোশ দৌড়ে সে জায়গা ছেড়ে চলে গেল। শিয়ালটা ওখানে আটকা পড়ে রইল। আর রাগে শিয়াল খেপা কুকুরের মতো শব্দ করতে থাকল।
(বাঘ ও শিয়ালের গল্প)
বন্ধুরা, এবার আমরা শিয়াল ও বাঘের গল্প শোনাব। এক বনে এক বুড়ো বাঘ ছিল। এক সময় বাঘটি রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুখে পড়ে প্রায় মরার মতো অবস্থায় একটি গাছের নিচে শুয়ে শুয়ে কান্না করছিল। সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক শিয়াল। বাঘ শিয়ালকে দেখে আকুতি মিনতি করে ডাকতে লাগল একটু কথা শোনার জন্য।
শিয়াল বলল, মামা, যা বলার তুমি দূর থেকেই বলো। তোমার কাছে যেতে আমার ভয় লাগে।
বাঘ বলল, বিশ্বাস করো শিয়াল- আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে।
শিয়াল বলল, মামা, তুমি কথা দিলেও আমার ভয় হয় তোমার কাছে যেতে!
বাঘ বলল, আমি বুড়া হয়ে গেছি। অসুখে বিসুখে ভুগে মারা যেতে বসেছি। মারা যাবার আগে দীর্ঘজীবনে যা দেখেছি শুনেছি তা তোমাকে বলে যেতে চাই। তুমি বুদ্ধিমান। তুমি আমার জীবনের এই কথা অন্য পশুদের বলবে। তাতে তারা তাদের জীবনে অনেক উপকার পাবে। মৃত্যুর আগে এই আমার শেষ ইচ্ছা। আমি আমার পিতা-মাতার নামে শপথ করে বলছি, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। আমার সেই শক্তি আর নেই।
এসব কথা শুনে অনেক ভেবেচিন্তে বাঘের কাছে গেল শিয়াল। তারপর প্রশ্ন করল, এবার বল শুয়ে শুয়ে একা কেন কাঁদছিলে?
বাঘ বলল, মনের দুঃখে মনের দুঃখে। এই বুড়ো বয়সে অসুখে ভুগে আজ সাতদিন ধরে গাছের নিচে পড়ে আছি। দলের বাঘরা আমাকে ফেলে চলে গেল। তারপর বনের কত পশুকে ডাকলাম আমাকে সাহায্য করার জন্য। কেউ সাহস করে এগিয়ে এলো না। এই বুড়ো বয়সে অপরের সাথে কথা-গল্প করতে পারলে মনে বড় শান্তি লাগে। কত পশু-পাখিকে অনুরোধ করলাম, কেউ আমাকে বিশ্বাস করল না। কেউ ফিরে তাকাল না! তাই আমার জীবনের কিছু কথা তোমাকে বলে যেতে চাই।
একটু দম নিয়ে বাঘ আবার বলতে লাগল: “ক্ষমতার ওপর ভর করে খুব বেশি দিন কাউকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না। ক্ষমতা কোন সম্পদ নয়- জ্ঞানই প্রকৃত সম্পদ। জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান মানুষকে সবাই ভালোবাসে। তুমি জ্ঞানী-বুদ্ধিমান। তাই তোমাকে সবাই ভালবাসে- শ্রদ্ধা করে। শান্ত ভদ্রকেও সবাই ভালবাসে- আদর করে। হরিণ শান্ত-ভদ্র। তাই সবাই তাকে ভালবাসে- আদর করে। যারা ক্ষমতার দাপট দেখায় তাদের ভয় করে ঘৃণা করে। তাই আজ আমার এ অবস্থা।”
এ গল্পের মূলকথা হলো- ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতা দিয়ে খুব কম সময়ই অন্যকে দমিয়ে রাখা যায়।
বন্ধুরা, এ গল্প থেকে আমরা আরেকটি বিষয় জানতে পারি আর তা হলো- জ্ঞানই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব প্রসঙ্গে আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) জ্ঞানের চেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর নেই এবং মুর্খতার চেয়ে বড় দারিদ্রতা আর নেই। তো, বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে- জ্ঞান বাড়িয়ে দেয়ার আকুতি নিয়ে একটা প্রার্থনামূলক গান। গানটির কথা লিখেছেন মাহফুজ বিল্লাহ শাহী আর সুর করেছেন গোলাম মাওলা। আর গেয়েছে ঢাকার সারেগামা একাডেমির শিশু শিল্পীরা।
রাব্বি মানে হল- হে আমার প্রতিপালক
ঝিদনি মানে হল- বৃদ্ধি করে দাও
ইলমা মানে হল- আমার এই জ্ঞান
হে প্রতিপালক আমার জ্ঞানটা বাড়াও
রব্বি ঝিদনি ইলমা
রব্বি ঝিদনি ইলমা ।।
স্মৃতি শক্তি বাড়িয়ে দাও
হে মালিক হে খালিক আল অহহাব
দৃষ্টি শক্তি তীক্ষ্ণ করো-
হে মহা মহিয়ান আত তাওয়াব
অন্তর দৃষ্টির দ্বার খুলে দাও
অশান্ত মনকে শান্ত বানাও
মন থেকে ভ্রান্ত ভাবনা তাড়াও ।।
-
যে জানে যে জানে না
সবাই কি আর একই হয় ?
বড় ধনী বল কে ?
জ্ঞানী-ই বড় ধনী রয়
আল্লাহ যখন যাকে চান
করেন ফাহমান কামেলান
আমাকেও সে জ্ঞানের কামেল বানাও ।