জানুয়ারি ২৯, ২০২১ ১৮:৫২ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভালো ও সুস্থ আছো। রংধনুর আজকের আসরে তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, আজকের আসরের শুরুতেই থাকছে বিদেশি ভাষায় প্রচলিত কয়েকটি শিক্ষণীয় গল্প। গল্পগুলো বাংলায় লিখেছেন বাংলাদেশি গল্পকার আশরাফুল আলম পিনটু। গল্পের পর থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমেই গল্পগুলো শোনা যাক।

 (এক গ্লাস পানি)

একদিন এক প্রফেসর ক্লাসে এলেন। তার হাতে পানিপূর্ণ কাচের একটি গ্লাস। তিনি সেটি শিক্ষার্থীদের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। হাসিমুখে জানতে চাইলেন, ‘আমার হাতে যে পানিভর্তি গ্লাস দেখছ, এর ওজন কত হতে পারে?’


‘৫০ গ্রাম, ১০০ গ্রাম কিংবা ১৫০ গ্রাম হতে পারে, স্যার।’ শিক্ষার্থীরা জবাব দিল।

‘আসলে আমিও জানি না এর ওজন কত। কারণ আমি এটি মেপে দেখিনি।’ প্রফেসর বললেন, ‘ওজন যা-ই হোক, সেটি আমার জানার বিষয় নয়। আমার প্রশ্ন হল- আমি যদি এই গ্লাসটি কয়েক মিনিট এভাবে হাতে ধরে রাখি তাহলে কী হবে?’

শিক্ষার্থীরা বলল, ‘তেমন কিছুই হবে না, স্যার।’

‘ঠিক আছে। কিন্তু আমি যদি গ্লাসটা কয়েক ঘণ্টা এভাবে ধরে রাখি তাহলে কী হবে?’ এবার জানতে চাইলেন প্রফেসর।

এক ছাত্র জবাব দিল, ‘আপনার হাতে ব্যথা শুরু হবে।’

‘ঠিকই বলেছ। এবার যদি আমি এটাকে সারা দিন এভাবে ধরে রাখি তাহলে?’ আবার জানতে চাইলেন প্রফেসর।

আরেকজন বলল, ‘তাহলে আপনার হাত অসাড় হয়ে যেতে পারে। হাতের পেশি কাজ করবে না। আপনি প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে ডাক্তারের কাছে যেতে হতে পারে।’

একথা শুনে শিক্ষার্থীরা বেশ মজা পেল। হাসলও কেউ কেউ।

প্রফেসরও হাসিমুখে বললেন, ‘তোমরা ঠিকই বলেছ। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কি গ্লাসের ওজন কিংবা উপাদানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে?’

‘না, স্যার। কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ উত্তরে বলল সবাই।

‘তাহলে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন আমার হাতে ব্যথা হবে? কেনই বা হাতের পেশি অসাড় হয়ে যাবে?’ এবার জানতে চাইলেন প্রফেসর। শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় পড়ে গেল। একটু থেমে প্রফেসর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, হাতের ব্যথা কমাতে চাইলে আমাকে কী করতে হবে?’

‘গ্লাসটা হাত থেকে

নামিয়ে রেখে দিতে হবে, স্যার।’ একজন শিক্ষার্থী জবাব দিল।

‘ঠিক তাই।’ প্রফেসর বললেন, ‘জীবনের সমস্যাগুলোও এই এক গ্লাস পানির মতো। কিছুক্ষণ ধরে রাখলে সমস্যা হয় না। কিন্তু দীর্ঘ সময় হলে বড় আকারের সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। আমাদের জীবনের সমস্যা কিছুক্ষণ মাথায় থাকলে তেমন কিছু হবে না। কিন্তু যদি সারা দিন শুধু সমস্যা নিয়েই চিন্তা করি তাহলে সেটা কষ্ট দিতে শুরু করবে। যত বেশি চিন্তা করা হবে কষ্টগুলো বাড়তেই থাকবে। ফলে সব কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। জীবন হয়ে যাবে অসাড়। তাই সমস্যার চাপ সারা দিন না বয়ে রাতে শুতে যাওয়ার আগে গ্লাসের মতোই তা নামিয়ে রাখতে হবে।

জীবনের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলা।

বন্ধুরা, এই গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, জীবনের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলা। 

(পাখি আর মৌমাছি)

এক ছিল পাখি। বড় এক গাছের ডালে তার বাসা। অন্য এক ডালে ছিল একটি মৌচাক। ডালে বসে পাখিটি রোজ মৌমাছিদের দেখে। তারা মধুর খোঁজে উড়ে যায় কাছে-দূরে। ঘুরে ঘুরে ফুল থেকে মধু নিয়ে আসে।

একদিন পাখিটি গাছের ডালে বসে ছিল। সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একটি মৌমাছি। পাখিটি তাকে ডেকে বলল, ‘ও ভাই, মৌমাছি। একটু শুনে যাও দেখি।’

মৌমাছি কাছে এসে বলল, ‘কী বলবে বল ভাই! আমার আবার সময় কম।’

পাখি: ‘ তা তো জানি। অনেক দিন ধরেই তোমাকে একটি কথা বলব ভাবছি।’

মোমাছি: ‘কী কথা বলবে, পাখিভাই?’

পাখি: ‘কত কষ্ট করে তোমরা মধু জমাও। অথচ মানুষ তা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।’

মৌমাছি: ‘তা তো নেয়ই, ভাই। কী আর করব বল!’

পাখি: ‘এ জন্য তোমার কোনো দুঃখ হয় না?’

মৌমাছি: ‘না, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই।’

কোনো দুঃখ নেই? কী বলছ তুমি! ’

আমি ঠিকই বলছি। আমার দুঃখ নেই কারণ মানুষ আমাদের মধু নেয় ঠিকই কিন্তু কখনই মধু তৈরির কৌশল ছিনিয়ে নিতে পারবে না।’

বন্ধুরা, এ গল্পের নীতিকথা হচ্ছে- কারও ধনসম্পদ চুরি করা গেলেও তার ভালো গুণ কখনই চুরি করা যায় না।

(ভালো কপাল মন্দ কপাল)

ভালো গুণ যেমন চুরি করা যায় না তেমনি কপালের লিখনও খণ্ডানো যায় না। কার কপালে কী লেখা আছে তা কেউ আগাম বলতেও পারে না। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে এ সম্পর্কেই একটি গল্প শোনা যাক।

চীনের এক গ্রামে ছিলেন এক বুড়ো কৃষক। তার ছিল এক চাষের ঘোড়া। একদিন সেই ঘোড়াটি পালিয়ে গেল পাহাড়ি এলাকার গভীরে। দুদর্শা দেখে তার প্রতিবেশী সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘কী আর করবে। তোমার কপাল মন্দ!’

কৃষক জবাব দিলেন, ‘কপাল মন্দ না ভালো, তা কেই বা জানে!’

এক সপ্তাহ পর ঘোড়াটি ফিরে এলো। ওর সঙ্গে এলো একপাল বুনো ঘোড়া। বুড়ো কৃষককে এবার অভিবাদন জানিয়ে প্রতিবেশী বললেন, ‘তোমার কপাল আসলেই ভালো।’

কৃষক এবারও জবাব দিলেন, ‘আমার কপাল মন্দ না ভালো, তা কেইবা জানে!’

তারপর তার ছেলে বুনো ঘোড়াগুলোর একটিকে বশে আনার চেষ্টা করতে গেল। কিন্তু ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে পা ভাঙল তার। এতে মন্দ কপালের কথাই ভাবল সবাই। কেবল বুড়ো কৃষকেরই ভাবনা ছিল, ‘কপাল মন্দ না ভালো, তা কেই বা জানে!’

এর কয়েক সপ্তাহ পর সেনাবাহিনী এলো গ্রামে। যুদ্ধে যেতে সবল যুবকদের ধরে নিয়ে গেল। কেবল ছেড়ে দিল বুড়ো কৃষকের পা ভাঙা ছেলেটিকে।

বন্ধুরা, এ গল্প থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, কপালের ভালো-মন্দ সম্পর্কে সঠিক কথা কেউ কখনও বলতে পারে না।

ঈগল ছানা আর মুরগি

বড় এক পাহাড়ের উপর এক ঈগলের বাসা। বাসায় চারটি ডিম। প্রতিদিনের মতো সকালে ডিমগুলো রেখে খাবারের খোঁজে গেল ঈগল। এ সময় ভূমিকম্পে গোটা পাহাড় নড়ে উঠল। ঈগলের একটি ডিম ছিটকে পড়ে গেল বাসা থেকে। গড়াতে গড়াতে সে ডিম এসে থামল পাহাড়ের নিচে।

সেখানে থাকে এক মুরগি। ডিমটি সে নিয়ে এলো নিজের বাসায়। অন্যান্য ডিমের সঙ্গে রেখে দিল। তা দিতে থাকল যত্ন করে। একদিন সেই ডিম ফুটে ঈগলের একটি সুন্দর ছানাও বের হল। ছানাটি বড় হতে লাগল মুরগির অন্য ছানাদের সঙ্গে। কিন্তু ভেতর থেকে সে সবসময় অন্যরকম কিছু অনুভব করত।

একদিন আকাশে ঈগলের একটা ঝাঁক উড়তে দেখে সে মুরগিকে বলল, ‘আহা, আমিও যদি ওদের মতো উড়ে বেড়াতে পারতাম!’

মুরগি হেসে বলল, ‘তুমি কিভাবে উড়বে? তুমি তো মুরগি। মুরগিরা কখনও ওড়ে না।’

ছানাটি মাঝে মাঝেই ঈগলদের উড়ে বেড়াতে দেখত আর স্বপ্ন দেখত সেও একদিন ওদের মতোই উড়ে বেড়াবে আকাশে। কিন্তু প্রতিবার সে তার স্বপ্নের কথা জানালে মুরগি বলত, তার পক্ষে আকাশে ওড়াটা একেবারেই অসম্ভব।

মুরগির এ কথাটিই ঈগল ছানা বিশ্বাস করতে শিখল। ওড়ার স্বপ্ন দেখা বাদ দিল। ওড়ার কোনো চেষ্টাই করল না কোনোদিন। বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিল মুরগিদের মতো। এভাবে একদিন সে মারাও গেল।

বন্ধুরা, এ গল্পের নীতিকথা হচ্ছে, আমাদের জীবনেও আমরা যা বিশ্বাস করতে শিখি সেভাবেই বেড়ে উঠি। ঈগলের মতো ওড়ার স্বপ্ন দেখলে সেটাই অনুসরণ করতে হবে। মুরগির কথায় কান দিতে নেই।

(বন্ধুত্ব)

প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। শত্রুপক্ষের দিক থেকে গুলি ছুটে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। এক সৈনিক নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারলেও কিছু দূরে থাকা তার বন্ধুর পক্ষে তা সম্ভব হল না। গুলি এসে লাগল তার বুকে। তাকে পড়ে যেতে দেখে আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে গেল বন্ধুর ভেতর। সৈনিকটি তার অফিসারের কাছে অনুমতি চাইলেন- গুলি লেগে পড়ে যাওয়া বন্ধু কাছে যেতে চান তিনি। তুলে নিয়ে আসবেন তাকে।

অফিসার বললেন, ‘অবশ্যই যেতে পার। কিন্তু আমি মনে করি, এটা ঠিক হবে না। কারণ, তোমার বন্ধু সম্ভবত গুলি খেয়ে মারা গেছে। ওখানে গেলে তোমার জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।’

সৈনিকটি এ কথা শুনেও বন্ধুর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অলৌকিকভাবে শত্রুপক্ষের গুলি এড়িয়ে পৌঁছে গেলেন বন্ধুর কাছে। তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ফিরে আসতে সক্ষমও হলেন।

কিন্তু অফিসার তার বন্ধুকে পরীক্ষা করে দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তখনই বলেছিলাম, তোমার ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। তোমার বন্ধু মারা গেছে। তাকে আনতে গিয়ে তুমি নিজেও কিছুটা আহত হয়েছ। কী লাভ হল বলো! সবই অর্থহীন।’

সৈনিকটি বললেন, ‘স্যার, আমার ওখানে যাওয়াটা অর্থহীন ছিল না!’

অফিসার: ‘তোমার বন্ধু তো মারা গেছে। তাহলে কিভাবে বলো তোমার যাওয়াটা অর্থহীন ছিল না?’ জানতে চাইলেন অফিসার।

সৈনিক: ‘স্যার, আমি যখন তার কাছে পৌঁছলাম তখনও সে বেঁচে ছিল। আমি তার শেষ কথা শোনার পরিতৃপ্তি পেয়েছি।’

অফিসার: ‘সে তোমাকে শেষ কথা কী বলেছিল?’

সৈনিক: বলল, ‘সে আমাকে বলেছিল- বন্ধু, আমি জানতাম, তুমি আসবে।’

বন্ধুরা, এ গল্পের নীতিকথা হচ্ছে- বিশ্বাসই হল প্রকৃত বন্ধুত্বের মূলভিত্তি।

(অহেতুক সন্দেহ)

একদিন দুটি ছোট ছেলে একসঙ্গে খেলছিল। তারা দুই বন্ধু। একজনের কাছে ছিল কাচের অনেক মার্বেল। নানা রঙের। সেগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। অন্যজনের কাছে ছিল অনেক চকোলেট। নানা রঙের মোড়কে মোড়ানো। প্রথম বন্ধু তার সব মার্বেল অন্য বন্ধুকে দিতে চাইল। বিনিময়ে নিতে চাইল তার সব চকোলেট।

এ শর্তে দ্বিতীয় বন্ধু রাজি হল। প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় বন্ধুকে সব মার্বেল দিয়ে দিল। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর আর বড় মার্বেলটি নিজের কাছে লুকিয়ে রাখল। শর্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় বন্ধু তার সব চকোলেট দিয়ে দিল প্রথম বন্ধুকে।

সেই রাতে দ্বিতীয় বন্ধু খুব আরামেই ঘুমাল। কিন্তু প্রথম বন্ধুটি কিছুতেই ঘুমাতে পারল না। সারা রাত তার মনে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেল- হয়তো তার মতোই দ্বিতীয় বন্ধুটিও আরও মজাদার কিছু চকোলেট তাকে না দিয়ে রেখে দিয়েছে নিজের জন্য। যেভাবে সে নিজেও নিজের জন্য সবচেয়ে বড় ও সুন্দর মার্বেলটি রেখে দিয়েছে।

বন্ধুরা, এ গল্পের শিক্ষা হচ্ছে, কাউকে শতভাগ না দিলে নিজেও শতভাগ না পাওয়ার দুশ্চিন্তা থাকে।  

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে তোমাদের জন্য রয়েছে একটি গান। গানের কথা ও সুর: হুমায়ুন বিন হানিফ আর শিল্পী: ঢাকার বন্ধু সাবা তাসনুবা। তোমরা গানটি শুনতে থাকো আর আমরা বিদায় নিই রংধনুর আজকের আসর থেকে।