ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ ১৫:৫৩ Asia/Dhaka

ক) পাঠক! আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ইরান প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ। সুতরাং এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে বেশ সমৃদ্ধ তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাহিত্য সংস্কৃতির নেপথ্য প্রেরণা ছিল ইরানের সাহিত্য। অসংখ্য গল্প কিংবা প্রবাদ প্রবচন যেসব আমরা প্রায়ই মুখে মুখে উচ্চারণ করি সেগুলো যে ইরানের অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই।

খ) সেইসব গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে। মুখে মুখে উচ্চারিত বহু প্রবাদ প্রবচনের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এসব গল্পে রয়েছে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠ বহু শিক্ষা ও উপদেশ। আমরা সেইসব গল্প এবং প্রবাদের পেছনের গল্প নিয়ে এ আসরে আপনাদের সঙ্গে থাকবো। আশা করি এ আসরটি আপনাদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি চিন্তার জগতেও নাড়া দেবে।

ক) গল্প তাহলে শুরু করা যেতে পারে, কী বলেন?

খ) হুমম শুরু করা যেতে পারে, শুরু করে দিন …

ক) অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক বাদশার ছিল দুই উজির …

খ) প্রাচীনকালে তো মন্ত্রীদের উজির বলা হতো, তাই না?

ক) ঠিক বলেছেন আপনি

খ) আর প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানকে বলা হতো রাজা বা বাদশাহ …

ক) ঠিক তাই! আচ্ছা যা বলছিলাম! এক বাদশার ছিল দুই উজির। দুজনই সবসময় বাদশার দরবারে তাঁর আশেপাশেই থাকতো।

খ) হুমম … যখনই কোনো ঘটনা দুর্ঘটনা কিংবা প্রজাদের কেউ কোনোরকম সমস্যা নিয়ে দরবারে হাজির হতো, ওই উজিরেরা উপদেষ্টার মতো বাদশাকে সমস্যা সমাধানের জন্য পরামর্শ দিতো।

ক) এরকমই একদিন বাদশার সেপাইরা এক লোককে হাত পেছনে বেঁধে নিয়ে এলো বাদশার দরবারে।

খ) বাদশাহ হাত বাঁধা লোকটার দিকে কিছুক্ষণ তাকালো। বাদশার সিংহাসন থেকে লোকটা খানিকটা দূরে অবস্থান করছিল। অতো বেশি কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। বাদশাহ সেপাইদের কাছ থেকে জানতে চাইলো:

ক) এই লোকটার কী অপরাধ? কেন তাকে রাজ-দরবারে ধরে এনেছো?

খ) সেপাইদের সর্দার মানে দলপতি বললো:

ক) এই লোকটা খুবই বাজে কাজ করেছে জাঁহাপনা!

খ) খারাপ করেছে কি ভালো করেছে সেই বিচারের রায় দেওয়ার দায়িত্ব তো তোমার নয়। তুমি শুধু বলো কী করেছে সে? কেন তাকে এখানে নিয়ে এসেছো?

ক) হুজুর! এই লোকটা আমাদের বাদশাহ নামদারকে গালিগালাজ করেছে। বাজার-ঘাটে, পাড়ায়-মহল্লায়, অলিতে-গলিতে আপনার সমালোচনা করে গালাগালি করেছে …

খ) কীসের সমালোচনা …

ক) আপনি নাকি জুলুম করেন, প্রজাদের ওপর আপনি নাকি ভীষণ অত্যাচার করেন … ইত্যাদি

খ) এ কথা শুনে বাদশাহ ভীষণ ক্ষেপে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিলো:

ক) জল্লাদকে বলো-এ লোকের মাথা কেটে যেন দেহ থেকে আলাদা করে দেয়…!

খ) দুই উজিরই সব শুনছিল চুপ করে। বাদশার আদেশ শুনে এবার উজিরেরা একজন আরেকজনের দিকে তাকালো। এখানে বলে রাখা ভালো যে, দুই উজিরের একজন খুবই সাদা মনের মানুষ ছিল মানে প্রজাদের প্রতি তার মনটা ছিল দরদভরা। সে সবসময় চাইতো কী করে প্রজাদেরকে বাদশার রোষানল থেকে বাঁচানো যায়।

ক) কিন্তু উজিরদের দ্বিতীয়জন ছিল ঠিক তার বিপরীত। সে ছিল ভীষণ হিংসুটে। যত মন্দ কাজ আছে সব সে করে বেড়াতো নির্দ্বিধায়। তার আচরণও ছিল ভীষণ বাজে। দরদি উজিরকে সে দুই চোক্ষে দেখতে পারতো না। সে সারাক্ষণই সুযোগ খুঁজে বেড়াতো কী করে ভালো উজিরকে বিপদে ফেলা যায়। বাদশাহর কাছে তাকে হেয় করা যায়, তার অবস্থান দুর্বল করা যায় …

খ) হুমম …! মন্দ উজির কখনও ভালো উজিরকে সহ্যই করতে পারতো না। বাদশাহ যেন ভালো উজিরকে ভালো না বাসে, তাকে যেন অপছন্দ করে, সেই লক্ষ্যে ভালো উজিরের বিরুদ্ধে সে বাদশাহর কাছে সবসময় নালিশ করে বেড়াতো।

ক) কিন্তু ভালো উজির কখনোই তা করতো না। সে অবশ্য সবই দেখতো, বুঝতো। তার বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, কীভাবে কী করছে সবই সে জানতো। তবে প্রতিক্রিয়া দেখাতো না। চুপচাপ থাকতো।        

খ) বিরতির পর আবারও স্বাগত আপনাদের 'গল্প ও প্রবাদের গল্প' আসরে। গল্পের দুই উজিরের বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলছিলাম। বলছিলাম যে ভালো উজির মন্দ উজিরের সকল ষড়যন্ত্রই বুঝতো কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখাতো না। চুপচাপ থাকতো।

ক) যাই হোক, লোকটির মাথা কেটে ফেলার জন্য বাদশা জল্লাদকে আদেশ দেওয়ায় উজিরেরা পরস্পরে চোখাচোখি করলো। দুজনই হাত বাঁধা লোকটার কাছে এসে দাঁড়ালো।

খ) তারপর একজন সেপাই যখন জল্লাদকে ডাকার জন্য গেল মৃত্যুদণ্ডের ফরমান পাওয়া লোকটি এবার গুনগুনিয়ে বাদশার চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করে গালি দিতে শুরু করে দিলো।

ক) বাদশাহ যেহেতু হাত বাঁধা লোকটি থেকে দূরে অবস্থান করছিল সে কারণে ওর বিড়বিড় করা কথাগুলো শুনতে পায় নি। বাদশাহ তাই ভালো মনের উজিরকে জিজ্ঞেস করলো:

খ) লোকটা বিড়বিড় করে কী বলছে …আবার গালিগালাজ শুরু করে নি তো …!

ক) ভালো মনের উজির মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত লোকটির নিরীহ চেহারার দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর বাদশার দিকে তাকিয়ে বললো:

খ) হে বাদশাহ নামদার! এই বেচারা আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করছে। সে বিড়বিড় করে আরও বলছে: আল্লাহ তাকেই ভালবাসেন, যে তার ক্রোধকে দমন করে এবং মানুষের ভুল ও অন্যায় ক্ষমা করে দেয়।

ক) বাদশাহ উজিরের মুখে এরকম কথা শুনে ভীষণ খুশি হয়ে গেল। তাঁর রাগ কমে গেল। নিরীহ লোকটির অপরাধগুলোকে বড় করে না দেখে তাকে ক্ষমা করে দিলো।

খ) কিন্তু হিংসুটে উজির? সেও তো হাত বাঁধা লোকটির কথা শুনেছিল। স্পষ্ট সে শুনতে পেয়েছে যে সে বাদশাকে গালিগালাজ করেছে। অথচ ভালো মনের উজির বাদশাকে বলেছে একেবারে বিপরীত কথা, মিথ্যা কথা।

ক) হিংসুটে উজির মনে মনে ভাবলো, এটাই মহা সুযোগ! ভালো মনের উজিরের ভালোমানুষির ভণ্ডামি প্রমাণ করার মোক্ষম সুযোগ, প্রতিশোধ গ্রহণের দারুন সুযোগ। তার এই মিথ্যাচার যদি ফাঁস করে দেই তাহলে বাদশাহর কাছে সে তিরষ্কৃত হবে। এমনও হতে পারে বাদশাহ হয়তো ভালো উজিরের ভালোমানুষি ছুটিয়ে দিতে শাস্তিও দিতে পারে। এরপর কী হলো তা শুনবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।

খ) বিরতির পর আবারও স্বাগত আপনাদের 'গল্প ও প্রবাদের গল্প' আসরে। ভালো উজিরের ভালোমানুষি ছুটিয়ে দিতে শাস্তির আয়োজন করতে হিংসুটে উজির বাদশাহর দিকে মুখ করে বললো:

ক) বাদশাহ নামদার! আমার মনে হয় আপনার কাছে আমাদের কারুরই সত্য কথা বলা ছাড়া মিথ্যাচার করা কোনোভাবেই উচিত নয়। তাই আমি আপনার কাছে সত্য কথাটাই বলবো: এই হাত বাঁধা লোকটি আসলে আপনাকে বিড়বিড় করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে।

খ) দুষ্টু উজিরের কথা শুনে বাদশাহ ভীষণ রেগে গেল। বিরক্তিভরে তার দিকে তাকালো বাদশাহ। উজির মনে মনে ভাবছিলো: ভালো উজিরের মিথ্যাচার ধরা পড়ায় তার ওপর বাদশাহ ক্ষেপেছে। কিন্তু না ...

ক) একটু পরেই বোঝা গেল ব্যাপারটা তার বিপরীত। বাদশাহ খানিক চুপ থেকে দুষ্টু উজিরের দিকে ফিরে বললো:

খ) ওটা যদি মিথ্যাচারও হয় তবুও সেটা তোর সত্য বলার চেয়ে আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। কেননা ও যা বলেছে ভালো নিয়তে বলেছে। কিন্ত তোর নিয়ত ভালো ছিল না। বিদ্যানের কথা শুনিস নি? কল্যাণকর মিথ্যা ফেতনা সৃষ্টিকারী সথ্যের চেয়ে ভালো?

ক) দুষ্টু উজির ভীষণ লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে ফেললো। বাদশাহ বললো:

খ) ওই উজির নিরীহ লোকটিকে সাহায্য করার স্বার্থে যেরকম বিনয়ী কথা বলেছে তাতে দুটি কাজ হয়েছে: এক, নিরীহ লোকটিকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। দুই, আমার সম্মান রক্ষা করেছে। কিন্তু তোর নিয়ত ছিল খারাপ। তুই চেয়েছিস ওই লোকটার যেন মৃত্যু হয় এবং সেইসঙ্গে আমার সম্মানেরও তোয়াক্কা করিস নি। ওই লোকের বাজে কথাগুলো আমাকে শোনালে যে আমার সম্মানহানী হবে সেই কথাও ভাবিস নি।

 ক) এরপর বাদশাহ আদেশ দিলো হাত বাঁধা লোকটিকে যেন ছেড়ে দেয়। সে যেন তার কর্মজীবনে ফিরে যেতে পারে। আর ভালো উজিরকে পুরস্কার দিলো এবং হিংসুটে উজিরকে করলো বরখাস্ত।

খ) জগদ্বিখ্যাত কবি সাদি'র গোলেস্তান থেকে নেওয়া এই গল্পটির উপসংহারে বলা হয়েছে: "কেউ যদি কারো জন্য কূপ খনন করে ওই কূপে প্রথমে নিজেকেই পড়তে হয়"।

ক) তো শ্রোতাবন্ধুরা! গল্প তো শুনলেন! কেমন লাগলো আপনাদের আশা করি জানাতে ভুলবেন না।

খ) যারা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/১

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ