ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার পেছনে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি: শাইখ সিরাজ
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের পথিকৃৎ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ রেডিও তেহরানের সাথে কৃষি ও কৃষকের সংকট নিয়ে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত সরকার কখনও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান চাল কেনে নি।
সরকার কৃষককে যে সুযোগটা দিতে চাচ্ছে দামের ক্ষেত্রে সেই সুযোগটা সরাসরি চাতাল মালিকরা নিচ্ছে। সরকার ধান-চাল কিনছে চাতাল মালিক অথবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। আর সরকার জেনেশুনেই সেটা করে দিচ্ছে।
সরকার-নির্ধারিত ধান-চালের মূল্য কৃষক আজ পর্যন্ত কখনও পায়নি। কৃষক ধান-চালের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার পেছনে এখানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শাইখ সিরাজ বলেন, আসল মুনাফা নিয়ে নেয় চাতাল মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
শাইখ সিরাজ বলেন, কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলেই কেবল কৃষক ন্যায্য মূল্য পেতে পারে। তাছাড়া, সরকারের উচিত হবে কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে হলেও ধান আবাদে উৎসাহিত করা। যেভাবেই হোক কৃষককে ধান চাষে ধরে রাখতে হবে। না হলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব শাইখ সিরাজ, বাংলাদেশে বোরো মৌসুমের ধান উঠছে। কিন্তু সেই পুরনো খবর ভেসে আসছে- ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। সবকিছুর দাম বাড়ে কিন্তু কৃষিপণ্যের দাম বাড়ে না বিশেষ করে ধানের ক্ষেত্রে এ কথা খুব বেশি প্রযোজ্য। কেন এই অবস্থা?
শাইখ সিরাজ: দেখুন, গত প্রায় তিন চার বছর ধরে ধানের দামের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটছে। ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকের অভিযোগ ও আকুতি আছে একথা খুবই সত্যি। কৃষকের প্রতি বিঘা ধান উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মতো। যদি মণ হিসাবে ধরা হয় তাহলে প্রতিমণ ধানের উৎপাদন খরচ প্রায় ৫শ থেকে সোয়া ৫শ টাকার মতো হয়ে থাকে। অন্যদিকে তারা মূল্য পায় ৫শ টাকার নিচে। কখনও কখনও দেখা ৪ থেকে সাড়ে ৪শ টাকায় ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক।
আর মৌসুমের প্রথম দিকে ধানের মূল্যটা কম থাকে কারণ একসাথে ধান ওঠে বলে। তবে আস্তে আস্তে ধানের দাম বাড়তে থাকে। কিন্তু যখন ধানের দাম বাড়তে থাকে তখন আর সেই ধান কৃষকের হাতে থাকে না। তখন ধান চলে যায় ব্যবসায়ী এবং ফড়িয়াদের হাতে এবং তারা মুনাফা করে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে- সেটা হচ্ছে উৎপাদন খরচটা অনেক বেশি হয়ে থাকে। উৎপাদন ব্যয়টা কমিয়ে আনতে পারলে ধানের মূল্যটা ঠিক থাকে। অন্যদিকে ধানের যে মূল্য আছে এর চেয়ে মূল্য বেশি উঠবেও না। কারণ এর চেয়ে দাম বাড়লে আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে ধান চাল ঢোকা শুরু হবে। সেক্ষেত্রে বিপর্যয় আরো বেশি করে দেখা দেবে।
ফলে সামগ্রিক বিচার বিশ্লেষণ করে আমার কাছে যেটি মনে হয়েছে সেটি হচ্ছে- অবশ্যই উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।
রেডিও তেহরান: প্রতি বছর ধানের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার কিন্তু তারপরও অভিযোগ পাওয়া যায় নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনছে না কেউ। এর কারণ কী?
শাইখ সিরাজ: দেখুন,বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর যেদিন থেকে এদেশের সরকার ধান ও চাল ঘোষণা দিয়ে কেনে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দিন কৃষকের কাছ থেকে ধান বা চাল কেনে নি। কারণ ওই কাঠামোটাই নেই। সরকার ধানের যে মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে সেই মূল্যে কখনও কৃষক ধান বা চাল বিক্রি করতে পারে নি। সরকার ধান চাল কেনে চাতাল মালিকদের কাছ থেকে অথবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। ফলে কোনো দিনই সরকার-নির্ধারিত ধান চালের দামের সুফল কৃষক পাচ্ছে না।
কৃষক যখন চাতাল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে যায় তখন ধান ও চালের ময়েশ্চার পার্সেন্টেজ/ হিউমিডিটির স্ট্যান্ডার্ড যে কমপক্ষে ১৪ থাকা দরকার সেটা নেই বলে অভিযোগ করে থাকে নিরক্ষর কৃষকের কাছে।
তারা কৃষককে বলে যে, তোমাদের ধান বা চালের মধ্যে ময়েশ্চারের পরিমাণ প্রয়োজনীয় মানের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে এই ধান নিয়ে আমাকে আবার শুকাতে হবে। সেখানে মণপ্রতি কমপক্ষে ৫ কেজি কমে যাবে। এখানে ধরা যাক সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতি কেজি ধানের দাম ২৫ টাকা সেখানে চাতাল মালিক কৃষককে বলছে তোমাকে দেব ১৮ টাকা করে- তুমি দেবে কিনা। এভাবে কৃষকের কাছ থেকে চাতাল মালিকরা সুযোগ নিয়ে থাকে। আমি আবারও বলছি কৃষকের কাছ থেকে সরকার কখনও সরাসরি ধান বা চাল কেনে না। সরকার যে সুযোগটা কৃষককে দিতে চাচ্ছে সেই সুযোগটা সরাসরি চাতাল মালিকরা নিচ্ছে। আর সরকার জেনেশুনেই সেটা করে দিচ্ছে। এটা একটা শুভঙ্করের ফাঁকির মতো।
রেডিও তেহরান: এ বছরও খবর পাওয়া যাচ্ছে- এক মণ ধান বিক্রি করে কোথাও কোথাও একজন কৃষি শ্রমিকের একদিনের মজুরি পরিশোধ করা কঠিন হচ্ছে। কেন এই ভারসাম্যহীন অবস্থা?
শাইখ সিরাজ: দেখুন, চলতি বছরও আমি দেশের ৬টি জেলায় কৃষি বাজেট করেছি। আর বাজেটের আগে কৃষকদের নিয়ে প্রাক বাজেট আলোচনা করা হয়। সেখানে মন্ত্রীরা যান, এবার অর্থমন্ত্রী গিয়েছিলেন। প্রতিবারই তিনি প্রাক বাজেট আলোচনায় যান। যখন উন্মুক্ত জায়গায় কৃষকদের সাথে বাজেট সেশনের আলোচনা হয়- তখন সেখানে হাজার হাজার কৃষক আসে। আর কৃষকদের প্রথম অভিযোগ থাকে তারা ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। তবে কৃষকের উৎপাদিত অন্যান্য ফসলের মূল্য কিন্তু আগের মতো খারাপ অবস্থায় নেই। দেখা যাচ্ছে কৃষক এবার পেয়ারা বিক্রি করেছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া, শাকসবজি ও ফলমূলের ক্ষেত্রে কৃষক মোটামুটি ভালো মূল্য পায়।
আমি আপনাকে একটি সহজ হিসাব দিচ্ছি। আগে যে কৃষক দেশীয় বীজ ব্যবহার করে এক বিঘা জমিতে ধান পেত ৭ থেকে ১০ মণ এখন হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের ফলে ওই একই জমিতে ১০ মণের জায়গায় ধান পাচ্ছে ৪০ মণ। এখানে এই বাড়তি ৩০ মণ ধানের যে এক্সট্রা মূল্য সেটা সে পায় তার কারণেই কিন্তু কৃষক কিছুটা টিকে আছে। অর্থাৎ আমি বলতে চেয়েছি উৎপাদনশীলতা কিছুটা বেড়ে যাওয়ার ফলে কৃষকের কিছুটা রক্ষা।
রেডিও তেহরান: কৃষি পণ্যের দামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে ভারসাম্যহীন অবস্থা বিরাজমান তার সমাধানে আসলে করণীয় কী আছে?
শাইখ সিরাজ: দেখুন, ভারসাম্যহীন অবস্থার সমাধানে কৃষকের করণীয় সম্পর্কে বলব তবে একইসাথে কেন এই ভারসাম্যহীনতা সে বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। বর্তমানে নানা সমস্যার কারণে কৃষকরা ধান উৎপাদন থেকে সরে যাচ্ছে। কারণ ধান উৎপাদন করলে একদিকে তারা ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না অন্যদিকে রয়েছে শ্রমিক সংকট।
এছাড়া ধানের জমিতে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয় তার চেয়ে অনেক কম শ্রমে অন্যান্য ফসল উৎপাদন করে অনেক বেশি মূল্য পাচ্ছে। যে কারণে ধানের আবাদী জমি কমে যাচ্ছে। আপনি যদি উত্তরাঞ্চলে যান তাহলে সেখানে দেখবেন ধানের জমি এখন দখল করে নিচ্ছে আমবাগান। সেখানে দেখা যাচ্ছে ধানের জমি এখন দখল করে নিচ্ছে লিচু বাগান, স্ট্রবেরি এবং নানা ধরনের উচ্চ মূল্যের শাকসবজি। এই অবস্থার ফলে একসময় আমাদের মূল ফসল যে চাল সেটার নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেবে। তখন এ সংকট উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
অতএব সরকারের উচিত হবে কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে হলেও ধান আবাদে উৎসাহিত করা। যেভাবেই হোক কৃষককে ধান চাষে ধরে রাখতে হবে। আর যদি খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয় তাহলে সেটা খুব খারাপ হবে।
আমি মনে করি কৃষক এখন যে দামে ধান এবং চাল বিক্রি করছে সেটা লাভজনক হবে তখন, যখন কৃষিখাতে ধান উৎপাদনের সামগ্রিক প্রক্রিয়া শতভাগ ম্যাকানাইজেশন করা সম্ভব হবে।
ম্যাকানাইজেশনের ব্যাপারটি আমি একটু স্পষ্ট করতে চাই। যেমন ধরুন- বাংলাদেশে লাঙল দিয়ে জমি চাষ করার ব্যাপারটি এখন কেবল ছবিতে দেখা যাবে। অথবা অনেক গ্রাম ঘোরার পর হয়তো দু’একটা লাঙল চাষের দৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। এখন লাঙল দিয়ে হাল চাষ উঠে গেছে। এখন সেখানে এসেছে ট্রাক্টর। ফলে জমি চাষের ক্ষেত্রে এখন শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ম্যাকানাইজেশন পরিকল্পনার আওতায় চলে এসেছে।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির কথা বলব সেটি হচ্ছে- ধানের চারা রোপন। এখনও কৃষকরা সেই মাজা নিচু করে হাত দিয়ে ধান রোপন করে। দেখা যাচ্ছে এক বিঘা জমিতে ধান রোপনে দিনে প্রায় ৪ জন লোক লাগে। এক্ষেত্রে যদি ট্রান্সপ্লান্টার মেশিন ব্যবহার করা যায় তাহলে অনেক সাশ্রয়ী হবে। এখানে মেশিনের মাধ্যমে ধানের চারা লাগানো যাবে। তাতে খরচটা অনেক কমে আসবে।
এছাড়া চাষে লাঙলের পরিবর্তে ট্রাক্টর মেশিন ব্যবহারের ফলে বিঘাপ্রতি দেড়শ থেকে দুইশ টাকা খরচ কম লাগছে। আর এক বিঘা জমিতে যদি শ্রমিক দিয়ে চারা রোপন করা হয় তাহলে প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ টাকা খরচ হবে। আর মেশিনে লাগানো হলে সেই খরচ প্রায় আটশ টাকায় নেমে আসবে।
এরপর রয়েছে হারভেস্ট বা ধানকাটার বিষয়টি। ধান কাটার মৌসুমে এখন শ্রমিকই পাওয়া যায় না। দিনে ৫০০ টাকা এবং তিন বেলা খাওয়া দিয়েও এখন শ্রমিক পাওয়া কষ্টকর। আর সেই ধানকাটার বিষয়টি যদি হারভেস্টার দিয়ে করা যায় তাহলে একবারে ধান কেটে মাড়াই হয়ে পরিষ্কার অবস্থায় বস্তাবন্দি হয়ে যাবে। এখানেও বিঘা প্রতি খরচ কমে আসবে প্রায় ২ থেকে ৩ শ টাকা।
এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি বিঘাতে উৎপাদন খরচ লাগবে প্রায় ১২শ থেকে ১৪শ টাকা। আর উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ার ফলে তখন ধানের দাম যদি প্রতিমণ ৫০০ টাকা করেও কৃষক পায় তাহলেও প্রতিমনে ৭০ থেকে ৮০ টাকা লাভ থাকবে।#
(প্রথম পর্ব)
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ /১১