রংধনু আসর : ঈশপের শিক্ষণীয় গল্প
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে বসে আমাদের অনুষ্ঠানে শুনছো সবাই ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।
খ) বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই গ্রীসের বিখ্যাত গল্পকার ঈশপের নাম শুনেছো। তিনি ছোটদের জন্য অসংখ্য শিক্ষণীয় ও মজার গল্প লিখেছেন। প্রজ্ঞা আর বুদ্ধিমত্তার জোরে হাস্যোদ্দীপক ও মজার গল্প বলে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন তিনি। সকলে তার কথা বলার ধরণ, অমায়িক ব্যবহার এবং গল্পের সারমর্ম শুনে তাকে খুব সহজেই ভালোবেসে ফেলতেন।
ক) ঈশপ ছিলেন মিসরের ফারাও বাদশাহ আমাসিসের সময়কার লোক। সামস দ্বীপে তিনি বাস করতেন। ঈশপ দেখতে ছিলেন কদাকার, কিন্তু বুদ্ধি ও হাস্যরসে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তার শিক্ষাপ্রদ অমর কাহিনীগুলো মানুষকে শোনাতেন। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ ছিলেন তার গল্পের ভক্ত। তার মৃত্যুর পর গ্রিসের দার্শনিক জিমট্রিয়াস তার গল্পগুলো সংগ্রহ করে রাখেন। সেই থেকে নীতি-নৈতিকতা শেখানোর জন্য ঈশপের গল্প আজও সারা বিশ্বের অমূল্য সম্পদ।
খ) ঈশপ ছিলেন লোডম্যান নামে এক নাগরিকের ক্রীতদাস। ঈশপের গল্প বলার ভঙ্গি এবং দর্শন দেখে লোডম্যান তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। মুক্ত জীবন পেয়ে ঈশপ বিভিন্ন দেশ বিদেশে ঘুরতে লাগলেন। যেখানেই যান, সেখানেই গল্প বলার আসর জমিয়ে ফেলেন। ধীরে ধীরে তার মুখনিঃসৃত গল্পগুলো চারদিক ছড়িয়ে যেতে লাগল।
ক) লোকমুখে ততদিনে রাজার কান পর্যন্ত চলে গেছে ঈশপের কথা। একদিন রাজদরবারে ডাক পড়ল ঈশপের। ঈশপের সাথে কথা বলে মুগ্ধ হয়ে গেলেন রাজা। রাজার মাথায় তখন এক বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলেন, ঈশপকে দিয়ে রাজ্যে নীতিবাক্য ছড়িয়ে দেবেন। লোকের মাঝে সমাজ সচেতনতা গড়ে তোলাটা যে খুব দরকার হয়ে পড়েছিল সেই সময়।
খ) রাজা ক্রোসাস তখন ঈশপকে নিজের সভাসদ হিসেবে নির্বাচিত করলেন। রাজসভায় বিভিন্ন নীতিবাক্যের গল্প বলে রাজাকে বেশ প্রভাবিত করেছিলেন ঈশপ। দিনে দিনে রাজার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন তিনি। রাজ্যের বুড়ো থেকে বাচ্চারা ঈশপের কাছে গল্প শোনার জন্য অস্থির হয়ে যেত।
ক) বন্ধুরা, তোমরাও নিশ্চয়ই ঈশপের গল্প শোনার জন্য অস্থির হয়ে আছো! হ্যাঁ, আমরা আজকের আসরটি সাজিয়েছি ঈশপের কয়েকটি শিক্ষণীয় গল্প দিয়ে। গল্পের পর থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর দেরি না করে ঈশপের গল্প শোনা যাক।
খ) বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আদব-কায়দা শেখার উত্তম সময় হচ্ছে শৈশব। শৈশবে পিতা-মাতা যেভাবে তাদের সন্তানের সঙ্গে ব্যবহার করবেন, তাদের মধ্যেও সেই গুণাবলি বিকশিত হবে। কারণ বাল্যকালেই শিশুর গ্রহণ ও অনুকরণ করার বয়স। তখন সে যা দেখে তাই অনুকরণ করতে শেখে। তাই তাদের সামনে সব সময় ভালো আচরণ দেখানো উচিত। পাশাপাশি মন্দ কাজগুলো থেকে তাদের বিরত রাখার চেষ্টা করা উচিত। এসব না করলে সন্তান-সন্ততি বিভিন্ন ধরনের মন্দ কাজে লিপ্ত হয়। যার পরিণাম শেষে অত্যন্ত ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। এ সম্পর্কেই আসরের শুরুতেই একটি গল্প শোনাবো।
(অন্যায়ের প্রশ্রয়)
ক) একটা ছেলে ছোটবেলাতেই তার মাকে হারিয়েছিল। ফলে সে তার খালার কাছেই বড় হচ্ছিল। খালা তাকে খুবই আদর করত। তার মা নেই বলে অন্যায়ের পরও কেউ তাকে কখনো বকাবকি করত না। একদিন ছেলেটি স্কুলের এক সহপাঠির পেন্সিল চুরি করে এনে তার খালাকে দেখাল, খালা তাকে বকাঝকা না করে তার প্রশংসাই করল।
খ) ছেলেটি আর একবার তার কোনো বন্ধুর বাড়ি থেকে একটা ভালো জামা চুরি করে এনে তার খালাকে দিল, খালা এবার তার প্রশংসা করল। এভাবে ছোটখাট জিনিস চুরি করতে করতে ছেলেটি বড় হতে লাগল। বড় হওয়ার পরও চুরি করা অব্যাহত রাখল। ক) এভাবে চুরি করতে করতে একদিন সে ধরা পড়ে গেল। তার চুরির বিচার হলো আদালতে। সবশুনে বিচারক তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিল। ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার আগে তাকে একজন জিজ্ঞেস করল, “তোমার কি কোনো সাধ আছে? কোনো ইচ্ছে থাকলে বলতে পার।”
খ) এ সময় ছেলেটি তার পাশে কাঁদতে থাকা খালার দিকে তাকিয়ে বলল- “আমি আমার খালার কানে কানে কয়েকটি কথা বলতে চাই।”
ক) অনুমতি দেয়ার পর ছেলেটি তার খালার কানের কাছে মুখ নিয়ে তার কানের লতি কামড়ে ছিড়ে দিল। তারপর বলল, “খালা আজ তুমিই আমার প্রাণদণ্ডের কারণ। প্রথম যেদিন আমি পেন্সিল চুরি করেছিল সেদিন তুমি যদি আমাকে শাসন করতে তাহলে আমাকে এইভাবে মরতে হতো না। আমার এই অধঃপতনের জন্য তুমিই দায়ী।”
(দুর্জনের ছলের অভাব হয় না)
খ) বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে এ সম্পকেই একটি গল্প।
ক) এক গ্রামে এক দুষ্ট বিড়াল ছিল। সে গৃহস্থের বাড়িতে এটা ওটা চুরি করে খেতো। একবার বিড়ালটা এক গৃহস্থের বাড়ি থেকে একটা মোরগ ধরে নিয়ে এলো। এখন সে মোরগটাকে মেরে খেতে চাইল।
ক) মোরগটি বলল, ‘আমার কোনো দোষ আছে? শুধু শুধু আমাকে কেন মারবে?’
খ) বিড়াল এবার বলল, ‘তুই মারাত্মক একটা আপদ। রাতে ডেকে মানুষকে স্বস্তিতে ঘুমোতে দিস না।’
ক) মোরগটি উত্তরে বলল, ‘আমার ডাকে ঘুম ভাঙলে মানুষ সকাল সকাল তাদের দিনের কাজ শুরু করতে পারে।’
খ) বিড়াল ভাবল কথাটা তো ঠিকই বলেছে। এবার সে বলল, ‘তুই তোর মা-বোনদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করিস।’
ক) মোরগ বলল, ‘এতেই আমার মালিক খুশি হয়, তার সম্পদ বাড়ে বলে।’
খ) বিড়াল এবার বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, ‘না, তোর সঙ্গে এত বকবক করার সময় নেই। আমার পেটে অনেক খিদে। তোকে এখন আমি খাব।’
(অতিচালাকির ফল)
ক) বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই ‘অতি চালাকের গলায় গড়ি’ প্রবাদটি শুনেছো। ঈশপের এবারের গল্পটিতে এই প্রবাদের বাস্তবতাই তুলে ধরা হয়েছে।
খ) একদিন এক অতি চালাক নেকড়ে ঠিক করল সে ছদ্মবেশ ধারণ করে নিজের চেহারাটা পাল্টে ফেলবে, তাহলে তার আর খাদ্যের ভাবনা থাকবে না। সহজেই শিকার ধরে ধরে খেতে পারবে।
ক) যে কথা সেই কাজ। নেকড়ে একটা ভেড়ার চামড়া গায়ে মুড়িয়ে ভেড়ার পালের মধ্যে ঢুকে গেল আর তাদের মতোই ঘাস খাওয়ার ভান করতে লাগল। ক্রমেই সন্ধ্যা হয়ে এল। রাখাল তার ভেড়ার পালকে তাড়িয়ে নিয়ে খোঁয়াড়ে পুরে রাখল।
খ) এদিকে সেদিন রাখালের বাড়িতে মেহমান এসেছিল। তাই তার মাংসের প্রয়োজন হওয়ায় একটা ভেড়া তাকে জবাই করতেই হবে। তাই সে একটা ভেড়াকে বের করে দড়ি দিয়ে আলাদা করে বেঁধে রাখল। তাকে কিছু খেতেও দিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই ভেড়াটা আসলে ভেড়া ছিল না। সেটি ছিল ছদ্মবেশধারী সেই নেকড়ে। রাতে যথাসময়ে তাকেই জবাই করা হল।
(বিপদে ধৈর্য ধরতে হয়)
ক) ধৈর্য একটি মহৎগুণ। মানুষের মেজাজের ভারসাম্যতা রক্ষা করা, আত্মসংযম অবলম্বন করা, বিপদে ভেঙে না পড়ে অটল-অবিচল থাকা, ত্বরিতগতিতে ফল লাভের আশা না করার নামই ধৈর্য। ধৈর্য-সহ্য, সহিষ্ণুতা না থাকলে কোনো কাজেই সফল হওয়া যায় না। সফলতার জন্য প্রয়োজন তীক্ষ্ণ ও কোমল মেজাজ। আমাদের পরের গল্পটি এ সম্পকেই।
খ) এক গ্রামে একটি পাতিশিয়াল বাস করত। একবার হল কি, বেশ কিছু দিন ধরে না খেয়ে খেয়ে রোগাপাতলা হয়ে গেল। সে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে একদিন একটা ওক গাছের খোঁড়লে বেশকিছু রুটি আর মাংস দেখতে পেল। সে ভাবল, রাখাল বালকদের কেউ হয়তো খাবারগুলো রেখে গেছে পরে খাবে বলে। তার আর তর সইল না। সে সুড়ুৎ করে ওই খোঁড়লে ঢুকে খাবারগুলো খেয়ে সাবাড় করল।
ক) সমস্যা হল, অধৈর্য হয়ে সব খাবার একবারে খেয়ে ফেলায় রোগাপাতলা শিয়ালটার পেট এমন ফুলে গেল যে, এখন সে আর ওই খোঁড়ল থেকে বের হতে পারছে না। শিয়ালটা ভীষণ বিপদে পড়ে গেল।
খ) এমনসময় তার পাশ দিয়ে আরেক শিয়াল যাচ্ছিল। খোঁড়লের ভেতর তার স্বজাতি ভাইকে দেখে বিস্তারিত শুনল। এরপর সে বলল, ‘তুমি ভাই অধৈর্য হয়ে সব খাবার একবারে খেয়ে নিজেকে মোটা বানিয়েছ। এখন একটু ধৈর্য ধরে বসে থাক। খাবারগুলো হজম হলে তোমার পেট আবার চিকন হয়ে যাবে। তখন সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসতে পারবে।’
(ঠকালে ঠকতে হয়)
ক) বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, কাউকে ঠকানো, ধোঁকা দেওয়া বা প্রতারণা করা অত্যন্ত মন্দ কাজ। অন্যকে ঠকালে নিজেকেও ঠকতে হয়। ঈপশের পরের গল্পটি এ সম্পর্কেই।
খ) এক সারস পাখিকে এক ধূর্ত শিয়াল তার বাড়িতে দাওয়াত করল। যথারীতি সারস শিয়ালের বাড়িতে দাওয়াত রক্ষা করতে এলো। খাওয়ার সময় দেখা গেল দুটি সমান পাথরের থালায় ঝোল ঢেলে তাকে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাল শিয়াল। আর নিজে ওই থালা থেকে জিভ দিয়ে চেটেপুটে সব ঝোল খেয়ে নিল, কিন্তু সারস বেচারা লম্বা সরু ঠোঁট দিয়ে থালা থেকে ঝোল খেতে না পেরে ক্ষিধে নিয়েই ফিরে গেল। তবে যাওয়ার আগে শিয়ালকেও তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করে গেল।
ক) শিয়াল যথারীতি সারসের বাড়ি এসে হাজির। সে দেখল তাকে কুঁজোর মতো সরু মুখওয়ালা দুটি পাত্রে ঝোল খেতে পরিবেশন করা হল। সারস তার লম্বা ঠোঁট দিয়ে চুক চুক করে ঝোল শেষ করলেও শিয়াল কিছুতেই ওই পাত্রে মুখ ঢোকাতে পারল না। অগত্যা সে ক্ষিধে নিয়েই সারসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সারস বলল, ‘কিছু মনে কর না ভাই, এই ভদ্রতা আমি তোমার কাছেই শিখেছি।’
খ) বন্ধুরা, ঈশপের বেশকিছু গল্প শুনলে। তবে কেবল গল্প শুনলেই হবে না। গল্পের শিক্ষাও নিজেদের জীবনে কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই তোমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারবে। জ্ঞানের আলোয় চারিদিক আলোকিত করতে পারবে। বড় হয়ে নতুন নতুন আবিস্কারে পৃথিবীটা চমকে দিতে পারবে।
ক) বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে রয়েছে শিশুদের স্বপ্ন নিয়ে একটি গান। ‘আজকে ছোট কালকে মোরা বড় হব ঠিক’ শিরোনামের গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন আব্দুল লতিফ। গানটি গেয়েছে সালভি নাওয়ার জারিফ, লুজাইনা ফিরদাউস রাহী ও আরিশা মাইসুন হোসাইন। (গান)
খ) ঢাকার কিডস ক্রিয়েশন অনলাইন টিভি পরিবেশিত গানটি শুনলে। আশা করি ভালো লেগেছে। তো বন্ধুরা, তোমরা সবাই ভালো ও সুস্থ থেকো আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর।
ক) কথা হবে আবারো আগামী আসরে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।