মক্কা বিজয় বিশ্বনবীর (সা) দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও শান্তিকামিতার সাক্ষ্য
ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের ১৪৩৪ তম বার্ষিকী
-
মক্কায় অবস্থিত পবিত্র কাবা
২০ রমজান মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক বার্ষিকী। ১৪৩৪ বছর আগে অষ্টম হিজরির এই দিনে প্রায় বিনা রক্তপাতে বিশ্বনবী (সা)’র নেতৃত্বে মুসলমানরা জয় করেন পবিত্র মক্কা। মক্কা বিজয় ছিল বিশ্বনবীর (সা) দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও শান্তিকামিতা ও ক্ষমাশীলতার অসাধারণ সাক্ষ্য।
মূর্তিপূজার প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়ে-পড়া মক্কায় এ দিনে প্রায় দশ হাজার মুসলিম সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হন বিশ্বনবী (সা)। মুসলমানদের অত্যন্ত গোপন প্রস্তুতির কারণে মক্কার কাফের কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ও জনগণ এমন অভিযানের ব্যাপারে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তারা বিশাল এই বাহিনীর আগমনে হতভম্ব হয়ে যায় এবং কোনো ধরনের প্রতিরোধের ব্যাপারে পুরোপুরি হতাশ হয়ে কেবল প্রাণ রক্ষার কথা ভাবতে থাকে!
২০ রমজান মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করেন। প্রায় রক্তপাতহীন সে অভিযানে ইসলামের নবীর পতাকা সেখানে সমুন্নত হয়। আর সত্য ধর্মের গৌরব প্রতিষ্ঠিত হয় আরবের সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরীতে। হজরত ইব্রাহীম (আ.) একক প্রভুর ইবাদতের জন্য যে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন, তা ভরে ফেলা হয়েছিল মূর্তি ও বিগ্রহে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ঘর থেকে ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করেন। আর এতদিন যারা ইসলামের শত্রুতায় সদাপ্রস্তুত ছিল, তাদের জন্য ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। শান্তি ও মানবতার অনন্য নজির স্থাপন করলেন ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম। তাই মক্কা বিজয়ের ঘটনা বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। আর সে কারণেই ২০ রমজান মুসলমানদের জন্য বিপুল গৌরবের স্মারক।
মক্কা বিজয়ের পটভূমি:
হিজরতের ষষ্ঠ বর্ষে কুরাইশ নেতৃবর্গ ও মহানবী (সা.)-এর মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির তৃতীয় ধারা মোতাবেক মুসলমান ও কুরাইশরা যে কোন গোত্রের সাথে মৈত্রীচুক্তি করতে পারবে। এ ধারার ভিত্তিতে খুযাআহ্ গোত্র মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং মহানবী তাদের জীবন, ধন-সম্পদ এবং ভূ-খণ্ড রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর বনী কিনানাহ্ গোত্র, যারা খুযাআহ্ গোত্রের পুরানো শত্রু এবং প্রতিবেশী ছিল, কুরাইশ গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। দশ-সালা ওই চুক্তি আরব উপদ্বীপের সমুদয় অঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা ও সর্বসাধারণের শান্তি সংরক্ষণকারী ছিল।
এ চুক্তি মোতাবেক উভয় পক্ষ (কুরাইশ ও মুসলমানরা) একে অপরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করবে না অথবা তাদের নিজ নিজ মিত্রকে প্রতিপক্ষের মিত্রদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করবে না এবং উস্কানী দেবে না বলে স্থির হয়। এ চুক্তির পর থেকে দু’ বছর গত হয় এবং উভয় পক্ষ নিরাপত্তার সাথে ও সুখ-শান্তিতে বসবাস করছিলেন। এর ফলে মুসলমানগণ হিজরতের সপ্তম বর্ষে পূর্ণ স্বাধীনতাসহ পবিত্র বাইতুল্লাহ্ শরীফ যিয়ারতের জন্য পবিত্র মক্কা নগরী যান এবং হাজার হাজার মূর্তিপূজারী মুশরিক শত্রুর চোখের সামনে নিজেদের ইসলামী দায়িত্ব ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আঞ্জাম দেন ।
অসহায় মুসলিম প্রচারকগণকে রোম সাম্রাজ্যের যে সব চর কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করেছিল, তাদেরকে দমন ও কঠোর শাস্তি প্রদান করার জন্য হিজরতের অষ্টম বর্ষের জমাদিউল আওয়াল মাসে মহানবী তিন জন ঊর্দ্ধতন মুসলিম সমরাধিনায়কের নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী শামের সীমান্ত অঞ্চলগুলোয় পাঠান। মুসলিম সেনাবাহিনী এ সমরাভিযান থেকে নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছিল এবং মাত্র তিন জন অধিনায়ক ও কয়েকজন সৈন্য ছাড়া এ বাহিনীর আর কোন ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে নি। তবে ইসলামের মুজাহিদদের কাছ থেকে যে সামরিক সাফল্যের আশা করা হয়েছিল, তা অর্জন ছাড়াই এ সেনাদল মদীনায় ফিরে আসে এবং তাদের এ অভিযানের বেশিরভাগই ‘আঘাত কর ও পালাও’ এ কৌশল-সদৃশ ছিল। কুরাইশ গোত্রপতিদের মাঝে এ সংবাদ প্রচারিত হবার ফলে তাদের সাহস বেড়ে যায়। তারা ভাবল, ইসলামের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে এবং মুসলমানরা লড়াই করার মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে তারা, বিরাজমান শান্ত পরিবেশ নষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে তারা বনী বকর গোত্রের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করে এবং তাদেরকে মুসলমানদের মিত্র খুযাআহ্ গোত্রের ওপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করে তাদের একাংশকে হত্যা ও আরেক অংশকে বন্দী করার জন্য প্ররোচিত করে। এমনকি তারা এতটুকুতেও সন্তুষ্ট থাকে নি। একদল কুরাইশ রাতের বেলা খুযাআহ্ গোত্রের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। আর এভাবে তারা হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে দু’ বছর ধরে বিরাজমান শান্ত অবস্থাকে যুদ্ধ ও রক্তপাতে রূপান্তরিত করেছিল।
রাতের বেলা অতর্কিত এ হামলায় খুযাআহ্ গোত্রের ঘুমন্ত বা ইবাদত-বন্দেগীরত একাংশ নিহত এবং আরেক অংশ বন্দী হয়েছিলেন। খুযাআহ্ গোত্রের একদল লোক নিজেদের ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে আরবদের কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে বিবেচিত পবিত্র মক্কা নগরীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র মক্কায় আসা শরণার্থীরা বুদাইল ইবনে ওয়ারকা র ঘরে গিয়ে নিজ গোত্রের হৃদয়বিদারক কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন।
খুযাআহ্ গোত্রের অত্যাচারিত ব্যক্তিরা তাদের অত্যাচারিত হওয়ার বিষয়টি মহানবী (সা.)-এর গোচরীভূত করার জন্য নিজেদের গোত্রপতি আমর ইবনে সালিমকে মদীনায় মহানবীর কাছে পাঠান। তিনি মদীনায় পৌঁছে সরাসরি মসজিদে নববীতে চলে যান এবং জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক স্বরে খুযাআহ্ গোত্রের অত্যাচারিত অবস্থা ও সাহায্য প্রার্থনার কথা ব্যক্ত করে এমন একটি কবিতা আবৃত্তি করেন এবং মহানবী (সা.) খুযাআহ্ গোত্রের সাথে যে মৈত্রীচুক্তি করেছিলেন তাঁকে সেই চুক্তির মর্যাদা রক্ষার দোহাই দেন এবং মযলুমদের সাহায্য ও তাদের খুনের প্রতিশোধ নেয়ার আহবান জানান।
তিনি কবিতাটির শেষে বলেছিলেন :
هم بیّتونا بالوتیر هجّداً و قتلونا رکّعاً و سجّداً
“হে নবী! তারা মধ্যরাতে যখন আমাদের একাংশ ওয়াতীর জলাশয়ের কাছে নিদ্রায় আচ্ছন্ন এবং আরেক অংশ রুকূ-সিজদাহরত ছিল, তখন এ অসহায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে হত্যা করেছে।”
এ কবি মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতি এবং যুদ্ধ করার সাহস ও মনোবৃত্তি জাগ্রত করার জন্য বারবার বলছিলেন :قُتلنا و قد أسلمنا “ আমরা যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি, তখন (ঈমানের অবস্থায়) গণহত্যার শিকার হয়েছি।”
খুযাআহ্ গোত্রপতির এ ধরনের আবেগধর্মী, মর্মস্পর্শী ও উদ্দীপনা সঞ্চারী কবিতা তার প্রভাব রেখেছিল। মহানবী (সা.) বিশাল মুসলিম জনতার সামনে আমরের দিকে মুখ তুলে বলেছিলেন :“ হে আমর ইবনে সালিম! তোমাকে আমি সাহায্য করব।” এ অকাট্য নিশ্চয়তামূলক প্রতিশ্রুতি আমরকে অভিনব প্রশান্তি দিয়েছিল। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন, মহানবী শীঘ্রই এ ঘটনার কারণ কুরাইশদের থেকে খুযাআহ্ গোত্রের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। তবে তিনি কখনোই ভাবতে পারেন নি, পবিত্র মক্কা বিজয় ও কুরাইশদের অত্যাচারী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে এ কাজের পরিসমাপ্তি হবে।
মুসলমানদের কঠোর প্রতিশোধের আশঙ্কায় আতংকিত কুরাইশরা তাদের ওই অন্যায়ের ব্যাপারে খুব অনুতপ্ত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারে যে, তারা হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির বিপক্ষে একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছে এবং এভাবে তারা এ চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এ কারণে তারা মহানবী (সা.)-এর ক্রোধ প্রশমন এবং দশ-সালা চুক্তিটির অনুমোদন ও দৃঢ়ীকরণ এবং আরেকটি বর্ণনামতে নবায়ন করার জন্য নিজেদের নেতা আবু সুফিয়ানকে মদীনায় পাঠায় যাতে সে যে কোনভাবে তাদের অন্যায় ও আগ্রাসনের বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু মহানবীসহ (সা)মুসলমানদের কেউই আবু সুফিয়ানের বক্তব্য শুনে শান্ত হননি এবং তার বক্তব্যকে কোনো গুরুত্বই দেননি।
মহানবী (সা.)-এর জীবনেতিহাস থেকে এ পদ্ধতির সন্ধান পাওয়া যায় যে, তিনি সব সময় চেষ্টা করতেন যাতে শত্রু সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করে। আর তিনি কখনোই শত্রুর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ ও তাকে ধ্বংস করার অভিপ্রায় পোষণ করতেন না।
যে সব যুদ্ধে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করতেন, সেসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে বা যখন তিনি কোন সেনাদলকে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করতেন, তখন লক্ষ্য থাকতো শত্রুর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা, শত্রুপক্ষের সৈন্য সমাবেশ ও সংহতি বিনষ্ট করা এবং তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া। তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে, ইসলাম ধর্ম প্রচারের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা হলে মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশে ইসলাম ধর্মের শক্তিশালী যুক্তি তার প্রভাব ফেলবেই এবং এ লোকগুলো- যাদের সামরিক সমাবেশ ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল,- তাদেরকে যদি নিরস্ত্র করা হয় এবং তারা যুদ্ধরত অবস্থার অবসান ঘটায় ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামের ওপর বিজয় লাভ করার চিন্তা মনের মধ্যে লালন না করে, তা হলে তারা নিজেদের অজান্তেই মানব প্রকৃতি বা ফিতরাতের দিকনির্দেশনার দ্বারা তাওহীদবাদী ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হবে ও ইসলামের সাহায্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
এ কারণেই অনেক পরাজিত জাতি যারা ইসলামের সামরিক শক্তির কাছে পরাজয় বরণ করেছে এবং এরপর বিশৃঙ্খল-মুক্ত পরিবেশে ইসলামের সুমহান শিক্ষার প্রভাবে গভীর চিন্তা-ভাবনা করেছে, তারাই দীন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং একনিষ্ঠভাবে এক-অদ্বিতীয় স্রষ্টার ইবাদতের ধর্ম প্রসার ও প্রচারকাজে আত্মনিয়োগ করেছে।
মক্কা বিজয়েও এ সত্য পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়েছে। মহানবী (সা.) জানতেন, যদি তিনি পবিত্র মক্কা জয় করেন এবং শত্রুদের অস্ত্রমুক্ত করে পরিবেশকে মুক্ত ও শান্ত করেন, তা হলে অল্প দিনের মধ্যেই বর্তমানে ইসলাম ধর্মের ভয়ঙ্কর শত্রু এ দলটি সাহায্যকারী ও ইসলাম ধর্মের পথে মুজাহিদ হয়ে যাবে। অতএব, শত্রুর ওপর অবশ্যই বিজয়ী হতে হবে এবং তাকে পরাভূত করতেই হবে। তবে কখনোই তাদেরকে ধ্বংস করা বাঞ্ছনীয় নয়, আর যতদূর সম্ভব রক্তপাত এড়ানো উচিত। এ পবিত্র লক্ষ্য (বিনা রক্তপাতে শত্রুকে পরাজিত করা) অর্জনের জন্য শত্রুকে কিংকতর্ব্যবিমূঢ় করার মূলনীতি ব্যবহার করা উচিত। নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সেনাবাহিনী সংগ্রহ করার চিন্তা-ভাবনা করার আগেই শত্রুপক্ষকে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে নিরস্ত্র করতে হবে।
শত্রুপক্ষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করার মূলনীতি তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন ইসলামের যাবতীয় সামরিক রহস্য ও গোপনীয়তা সংরক্ষিত থাকবে এবং তা শত্রুর হস্তগত হবে না। মূলনীতিগতভাবে শত্রুপক্ষ জানবে না, মহানবী তাদের ওপর আক্রমণ করবেন কি না। আর যদি আক্রমণের চিন্তা-ভাবনা করা হয়েও থাকে, তা হলে তারা ঘূণাক্ষরেও অভিযানের জন্য প্রস্তুত মুসলিম বাহিনীর যাত্রাকাল ও গতিপথ সম্পর্কে যেন অবগত না হয়। মহানবীর সুদক্ষ নেতৃত্বে এ সামরিক মূলনীতি বাস্তবায়িত হয়েছিল।
পবিত্র মক্কা নগরী বিজয় শিরক ও মূর্তিপূজার সবচেয়ে সুরক্ষিত ও মজবুত দুর্গের পতন এবং কুরাইশদের যালিম প্রশাসন, যা ছিল তাওহীদবাদী ধর্মের প্রচার ও প্রসারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, তা উচ্ছেদ করার জন্য মহানবী (সা.) রণপ্রস্ততির কথা ঘোষণা করেন। তিনি মহান আল্লাহর কাছে দুআ করেন, কুরাইশদের গুপ্তচররা যেন মুসলিম সেনাবাহিনীর যাত্রা ও গতিবিধি সম্পর্কে অবগত না হয়।
ইসলামী সেনাবাহিনীর আকর্ষণীয় রণকৌশল
মাররুয যাহরান মক্কা নগরী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মহানবী (সা.) পূর্ণ দক্ষতার সাথে পবিত্র মক্কার প্রান্তসীমা পর্যন্ত দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী পরিচালনা করেন। ঐ সময় কুরাইশ ও তাদের গুপ্তচর এবং ঐ সব ব্যক্তি, যারা তাদের স্বার্থে কাজ করত, কস্মিনকালেও ইসলামী সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা সম্পর্কে অবগত ছিল না। মহানবী মক্কাবাসীদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার, মক্কা নগরীর বাসিন্দাদের প্রতিরোধ করা ছাড়াই আত্মসমর্পণ এবং এ বিশাল ঘাঁটি ও পবিত্র কেন্দ্র বিনা রক্তপাতে জয় করা সম্ভব করে তোলার জন্য নির্দেশ দেন, মুসলিম সৈন্যরা উঁচু উঁচু এলাকায় গিয়ে আগুন জ্বালাবে। তিনি অধিক ভীতি সৃষ্টির জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে পৃথক পৃথকভাবে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দেন, যাতে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার একটি (উজ্জ্বল) রেখা সবগুলো পাহাড় ও উঁচু এলাকা ছেয়ে ফেলে।
কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা সবাই তখন গভীর নিদ্রামগ্ন। অন্যদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় উঁচু এলাকাগুলো বিশাল অগ্নিকুণ্ডের রূপ দান করেছিল এবং মক্কাবাসীদের বাড়িগুলোকে আলোকিত করে ফেলেছিল। এর ফলে মক্কাবাসীদের অন্তরে ভীতির সৃষ্টি হয় এবং উঁচু এলাকাগুলোর দিকে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়।
তখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব এবং হাকিম ইবনে হিশামের ন্যায় মক্কার কুরাইশ নেতারা প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য মক্কার বাইরে এসে অনুসন্ধান কাজে মনোনিবেশ করে।
জুহ্ফাহ্ থেকে মহানবী (সা.)-এর সাথে সর্বক্ষণ পথ চলার সাথী আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব চিন্তা করলেন, ইসলামী সেনাবাহিনী কুরাইশদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে কুরাইশ বংশীয় বহু লোক নিহত হবে। তাই শ্রেয়তর হবে যদি তিনি উভয় পক্ষের কল্যাণার্থে কোন ভূমিকা পালন করেন এবং কুরাইশদের আত্মসমর্পণে উদ্বুদ্ধ করেন।
তিনি মহানবীর সাদা খচ্চরের উপর আরোহণ করে রাতের বেলা পবিত্র মক্কার পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকেন, যাতে তিনি মক্কা নগরী অবরোধের কথা কুরাইশ নেতাদের গোচরীভূত করেন এবং তাদেরকে ইসলামী সেনাবাহিনীর সংখ্যাধিক্য ও তাঁদের বীরত্বব্যঞ্জক মনোবল ও সাহসিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত করেন এবং বোঝাতে সক্ষম হন যে, আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই।
আবু সুফিয়ান ভয়-ভীতির মাঝে ঈমান আনয়ন করেছিল এবং এ ধরনের ঈমান আনা কখনোই মহানবী (সা.) এবং তাঁর দীনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল না। তবে কতিপয় কল্যাণের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ানের মুসলমানের কাতারভুক্ত হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে গিয়েছিল, যাতে করে মক্কার অধিবাসীদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পথে বিদ্যমান সবচেয়ে বড় বাধা এভাবে অপসারিত হয়ে যায়। কারণ আবু সুফিয়ান, আবু জাহল, ইকরামাহ্, সাফওয়া ইবনে উমাইয়্যা সহ কয়েকজনের মতো কতিপয় (প্রভাবশালী) ব্যক্তি বহু বছর ধরে (২১ বছর) এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিল এবং কোন ব্যক্তি ইসলামের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা বা এ ধর্মের প্রতি নিজের আগ্রহের কথা প্রকাশ করার সাহস পর্যন্ত পেত না। আবু সুফিয়ানের বাহ্যিক ইসলাম গ্রহণ তার নিজের জন্য সুফল বয়ে না আনলেও মহানবী (সা.) এবং যেসব ব্যক্তি তার কর্তৃত্বাধীন ছিলেন এবং তার সাথে যাঁদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, তাঁদের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর হয়েছিল।
দীর্ঘ বিশ বছর যাবত আবু সুফিয়ান ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর বড় বড় আঘাত হানা সত্ত্বেও মহানবী (সা.) কিছু কল্যাণের ভিত্তিতে তাকে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তাঁর মহৎ আত্মারই পরিচায়ক ঐতিহাসিক বাক্য তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছিলেন :
আবু সুফিয়ান জনগণকে নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারবে যে, যে কেউ মসজিদুল হারামের সীমারেখার মধ্যে আশ্রয় নেবে বা মাটির উপর অস্ত্র ফেলে দিয়ে নিজের নিরপেক্ষ থাকার কথা ঘোষণা দেবে বা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে (ভিন্ন বর্ণনা মতে হাকিম ইবনে হিযামের ঘরে), সে মুসলিম সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকবে।
মহানবীর চাচা হযরত আব্বাস আবু সুফিয়ানকে মুসলিম বাহিনীর নানা ব্রিডেড ও বিপুল রণ-প্রস্তুতি দেখিয়ে তাকে এতটাই প্রভাবিত করেন যে সে এ ঘোষণা দিয়েছিল: “দুর্নিবার ইসলামী সেনাবাহিনীর ইউনিটসমূহ পুরো শহর ঘিরে ফেলেছে এবং কিছু সময়ের মধ্যেই শহরে প্রবেশ করবে। তাদের অধিনায়ক ও নেতা মুহাম্মদ আমাকে কথা দিয়েছেন, যে কেউ মসজিদ ও পবিত্র কাবার প্রাঙ্গণে আশ্রয় নেবে বা মাটিতে অস্ত্র ফেলে দিয়ে নিরপেক্ষভাবে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে অথবা আমার বা হাকিম ইবনে হিযামের ঘরে প্রবেশ করবে, তার জান-মাল সম্মানিত বলে গণ্য হবে এবং বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।
আবু সুফিয়ানের এ ঘোষণা মক্কার অধিবাসীদের মনোবল এতটা দুর্বল করে দেয় যে এর ফলে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাসহ যাদের মাথায় প্রতিরোধ যুদ্ধের যে সামান্য চিন্তা বা মনোবৃত্তি বাকি ছিল সার্বিকভাবে তাও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
পবিত্র মক্কা নগরীর সড়কসমূহে ইসলামী বাহিনী প্রবেশ করার আগেই মহানবী (সা.) সকল সেনাপতিকে উপস্থিত করে বলেছিলেন :“ বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের জন্যই হচ্ছে আমার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা। তাই নিরীহ জনগণকে হত্যা থেকে তোমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। তবে ইকরামাহ্ ইবনে আবী জাহল, হাব্বার ইবনে আসওয়াদ, আবদুল্লাহ ইবনে সা’ দ ইবনে আবী সারাহ্, মিকয়াস্ হুবাবাহ্ লাইসী, হুয়াইরিস ইবনে নুকাইয, আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যাহ্, হযরত হামযার ঘাতক ওয়াহশী ইবনে হারব, আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবাইরী এবং হারিস ইবনে তালাতিলাহ্ নামের দশ জন পুরুষ এবং চার মহিলাকে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই তাদের হত্যা করতে হবে। উল্লেখ্য, এ দশ ব্যক্তির প্রত্যেকেই হত্যা ও অপরাধ করেছিল বা (ইসলামের বিরুদ্ধে) অতীত যুদ্ধগুলোর আগুন জ্বালিয়েছিল।
মহানবী (সা.)-কে বহনকারী উট পবিত্র মক্কা নগরীর সবচেয়ে উঁচু এলাকা দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করে এবং হুজূন এলাকায় মহানবীর চাচা হযরত আবু তালিবের কবরের পাশে এসে থামে। বিশ্রাম করার জন্য এখানে একটি বিশেষ তাঁবু স্থাপন করা হয়। কারো বাড়িতে থাকার জন্য জোর অনুরোধ করা হলেও মহানবী তা গ্রহণ করেন নি।
মূর্তি ভাঙ্গা ও পবিত্র কাবা ধোয়া
যে মক্কা নগরী বহু বছর যাবত শিরক ও মূর্তিপূজার ঘাঁটি ছিল, তা তাওহীদী আদর্শের (ইসলাম) সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং এ নগরীর সকল অঞ্চল ইসলামের সৈনিকদের অধিকারে আসে।‘ হুজূন’ নামক স্থানে মহানবী (সা.) তাঁর জন্য খাটানো তাঁবুতে কিছু সময় বিশ্রাম করেন। এরপর তিনি উটের পিঠে আরোহণ করে মহান আল্লাহর ঘর (কাবা) যিয়ারত ও তাওয়াফ করার জন্য মসজিদুল হারামের দিকে রওয়ানা হন। তিনি যুদ্ধের পোশাক ও শিরস্ত্রাণ পরিহিত ছিলেন এবং আনসার ও মুহাজিরগণ খুব মর্যাদার সাথে তাঁকে ঘিরে রেখেছিলেন। মহানবীর উটের লাগাম মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার হাতে ছিল এবং তাঁর চলার পথের দু’ ধারে মুসলিম ও মুশরিকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। একদল ক্রোধে ও ভীতি-জনিত কারণে হতবাক হয়ে গিয়েছিল এবং আরেক দল আনন্দ প্রকাশ করছিল। মহানবী কতিপয় কারণে উটের পিঠ থেকে নামলেন না এবং উটের পিঠে আরোহণ করেই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন। হাজরে আসওয়াদের (কালো পাথর) সামনে স্থিত হয়ে হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদ ছোঁয়ার পরিবর্তে তাঁর হাতে যে বিশেষ ছড়ি ছিল, তা দিয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে তাকবীর দিলেন।
মহানবী (সা.)-এর চারপাশ ঘিরে প্রদীপের চারপাশে ঘূর্ণনরত পতঙ্গের মতো আবর্তিত সাহাবীগণ মহানবীকে অনুসরণ করে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর দিলেন। তাঁদের তাকবীর-ধ্বনি মক্কার মুশরিকদের কানে পৌঁছলে তারা নিজেদের বাড়ি এবং উঁচু এলাকাগুলোয় গিয়ে আশ্রয় নিল। মসজিদুল হারামে এক অভিনব শোরগোল প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং জনগণের তুমুল হর্ষ-ধ্বনির কারণে মহানবী প্রশান্ত মনে ও চিন্তামুক্তভাবে তাওয়াফ করতে পারছিলেন না। জনগণকে শান্ত করার জন্য মহানবী তাদের দিকে এক ইশারা করলেন। অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র মসজিদুল হারাম জুড়ে সুমসাম নীরবতা নেমে এলো। এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসও যেন বুকের মধ্যে বন্দী হয়ে গিয়েছিল (অর্থাৎ মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছিল না)। মসজিদুল হারামের ভেতরে ও বাইরে অবস্থানরত জনতার দৃষ্টি তখন তাঁর দিকে নিবদ্ধ ছিল। তিনি তাওয়াফ শুরু করলেন। তাওয়াফের প্রথম পর্যায়েই পবিত্র কাবার দরজার উপর স্থাপিত হুবাল, ইসাফ ও নায়েলা নামের কতিপয় বড় বড় প্রতিমার উপর মহানবী (সা.)-এর দৃষ্টি পড়লে তিনি হাতের বর্শা দিয়ে দৃঢ়ভাবে আঘাত করে ঐ প্রতিমাগুলো মাটিতে ফেলে দিলেন এবং নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন :
) قل جاء الحق و زهق الباطل إنّ الباطل كان زهوقا(
“আপনি বলে দিন : সত্য (গৌরবের সাথে ও বিজয়ী বেশে) প্রকাশিত হয়েছে এবং মিথ্যা ধ্বংস হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা (প্রথম থেকেই) ভিত্তিহীন ছিল।” (সূরা বনী ইসরাঈল)
মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে মুশরিকদের চোখের সামনেই হুবালের প্রতিমা ভেঙে ফেলা হলো। এ বড় মূর্তিটি- যা বছরের পর বছর ধরে আরব উপদ্বীপের জনগণের চিন্তা-চেতনার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল,- তাদের চোখের সামনে ভূলুণ্ঠিত হয়ে গেল। ঠাট্টা করে যুবাইর আবু সুফিয়ানের দিকে মুখ তুলে বললেন :“ হুবাল- এ বড় প্রতিমা ভেঙে ফেলা হলো।”
আবু সুফিয়ান অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে যুবাইরকে বলেছিল :“ আমাদের থেকে হাত উঠিয়ে নাও তো (অর্থাৎ এ ধরনের কথা আর বলো না)। হুবালের দ্বারা যদি কোন কাজ হতো, তা হলে পরিণামে আমাদের ভাগ্য এমন হতো না।” আর সে বুঝতে পেরেছিল, তাদের ভাগ্য আসলে কখনোই তার হাতে ছিল না।
তাওয়াফ শেষ হলে মহানবী মসজিদুল হারামের এক কোণে একটু বসলেন। তখন পবিত্র কাবার চাবি-রক্ষক ছিল উসমান ইবনে তালহা এবং এ পদটি তার বংশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহাল ছিল। মহানবী (সা.) হযরত বিলালকে উসমানের ঘরে গিয়ে পবিত্র কাবার চাবি নিয়ে আসার জন্য আদেশ দিলেন। বিলাল চাবি-রক্ষকের কাছে মহানবীর নির্দেশ-বার্তা পৌঁছে দিলেন। কিন্তু তার মা তাকে মহানবীর কাছে চাবি হস্তান্তরে বাধা দিল এবং বলল :“ পবিত্র কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের বংশীয় গৌরব এবং আমরা কখনই এ গৌরব হাতছাড়া হতে দেব না।” উসমান মায়ের হাত ধরে নিজের বিশেষ কক্ষে নিয়ে গিয়ে বলল :“ আমরা যদি নিজ ইচ্ছায় চাবি না দিই, তা হলে তুমি নিশ্চিত থেকো, বলপ্রয়োগ করে আমাদের থেকে তা নিয়ে নেয়া হবে।” চাবি-রক্ষক এসে পবিত্র কাবার তালা খুলে দিল। মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর পেছনে উসামাহ্ ইবনে যায়েদ ও বিলাল প্রবেশ করলেন এবং স্বয়ং চাবি-রক্ষকও প্রবেশ করলো। মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে পবিত্র কাবার দরজা বন্ধ করে দেয়া হলো। খালিদ ইবনে ওয়ালীদ পবিত্র কাবার সামনে দাঁড়িয়ে জনতাকে দরজার সামনে ভিড় করা থেকে বিরত রাখছিলেন। পবিত্র কাবার অভ্যন্তরীণ প্রাচীর নবীগণের চিত্রকলা দিয়ে পূর্ণ ছিল। মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে কাবার প্রাচীরগুলো যমযম কূপের পানি দিয়ে ধোয়া হলো এবং কাবার দেয়ালে যে সব চিত্র ছিল, সেগুলো উঠিয়ে এনে ধ্বংস করা হলো।
মহানবী (সা.)-এর কাঁধে হযরত আলী (আ.)
মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ বলেন :“ পবিত্র কাবার ভেতরে বা বাইরে স্থাপিত কিছু প্রতিমা হযরত আলী (আ.) ধ্বংস করেছিলেন। মহানবী (সা.) হযরত আলীকে বললেন :“ আলী! তুমি বসে পড়, আমি তোমার কাঁধে উঠে প্রতিমাগুলো ধ্বংস করব।” হযরত আলী (আ.) পবিত্র কাবার প্রাচীরের পাশে মহানবীকে নিজ কাঁধে উঠালেন। কিন্তু তিনি বেশ ভার ও দুর্বলতা অনুভব করতে লাগলেন। তখন মহানবী হযরত আলীর অবস্থা বুঝতে পেরে তাঁকে কাঁধে উঠার নির্দেশ দিলেন। হযরত আলী মহানবীর কাঁধে উঠলেন এবং তামা দিয়ে নির্মিত কুরাইশদের সর্ববৃহৎ মূর্তি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। এরপর তিনি অন্যান্য মূর্তিও মাটির উপর ফেলতে লাগলেন।
মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে পবিত্র কাবার দরজা খোলা হলো। তখন তিনি কাবার দরজার উপর হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জনতা তাঁর উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকাচ্ছিল। ঐ অবস্থায় জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি বললেন :
الحمد لله الذى صدق وعده و نصر عبده و هزم الأحزاب وحده
“ঐ মহান আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা, যিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন, নিজ বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং নিজেই সকল দল ও গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছেন।”
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের একখানা আয়াতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি মহানবীকে তাঁর আপন মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন। এ আয়াত হলো :
) إنّ الّذى فرض عليك القرآن لرادّك إلى معاد(
“যিনি আপনার ওপর এ কুরআনের বিধান পাঠিয়েছেন (এবং এ কুরআন প্রচার করতে গিয়ে আপনি নিজ দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন), তিনিই আপনাকে মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন।” (সূরা কাসাস : ৮৫)
‘মহান আল্লাহ নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন’- এ কথা বলার মাধ্যমে মহানবী (সা.) এ গায়েবী প্রতিশ্রুতি যে বাস্তবায়িত হয়েছে, সে ব্যাপারে সবাইকে অবগত করলেন। এভাবে আবারও তিনি তাঁর সত্যবাদিতার কথা প্রমাণ করলেন।
মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গণ ও এর বাইরে সর্বত্র নীরবতা বিরাজ করছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বুকের মধ্যে আটকে গিয়েছিল এবং জনগণের মন-মস্তিষ্কের ওপর বিভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা প্রভাব বিস্তার করেছিল। মক্কাবাসী ঐ মুহূর্তগুলোয় নিজেদের ঐ সকল অন্যায়, অত্যাচার ও শত্রুতামূলক আচরণের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করছিল।
এখন ঐ গোষ্ঠী,- যারা বহু বার মহানবীর বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ বাঁধিয়ে তাঁর তরুণ অনুসারী ও সাহাবীগণকে হত্যা করেছিল এবং অবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, রাতের আঁধারে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে,- এখন তারাই তাঁর শক্তিশালী হাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে গেছে এবং মহানবীও তাদের ওপর যে কোন ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন।
এ লোকগুলো নিজেদের বড় বড় অপরাধের কথা স্মরণ করে পরস্পর বলাবলি করছিল :“ তিনি অবশ্যই আমাদের সবাইকে হত্যা করবেন বা কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে হত্যা এবং কিছুসংখ্যককে বন্দী করবেন। আর তিনি আমাদের নারী ও শিশুদেরও দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করবেন।”
তাদের বিভিন্ন শয়তানী চিন্তায় ব্যস্ত থাকাকালে হঠাৎ মহানবী (সা.) এ কথার মাধ্যমে সকল নীরবতার অবসান ঘটালেন। তিনি বললেন :ماذا تقولون؟ و ماذا تظنّون؟ “ তোমাদের বক্তব্য কী? কী ধারণা করছ?”
তখন জনগণ হতবাক, অস্থির ও ভীত হয়ে ভাঙা-ভাঙা ও কাঁপা কণ্ঠে মহানবীর সুমহান দয়া, মমত্ববোধ ও আবেগ-অনুভূতির কথা স্মরণ করে বলেছিল :“ আমরা আপনার ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করা ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না। আমরা আপনাকে আমাদের‘ মহান ভাই’ এবং‘ মহান ভাইয়ের সন্তান’ ছাড়া আর কিছুই মনে করি না।” তাদের আবেগপূর্ণ এ কথাগুলোর মুখোমুখি হলে স্বভাবগতভাবেই দয়ালু, ক্ষমাশীল ও উদার মহানবী (সা.) বললেন :“ আমার ভাই ইউসুফ তাঁর অত্যাচারী ভাইদের যে কথা বলেছিলেন, আমিও তোমাদের সে একই কথা বলব :
) لا تثريب عليكم اليوم يغفر الله لكم و هو أرحم الرّاحمين(
আজকের এ দিনে তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই; মহান আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন এবং তিনি সবচেয়ে দয়ালু।” (সূরা ইউসুফ : ৯২)
মহানবী (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
মহানবী (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন :“ তোমরা, হে লোকসকল! অত্যন্ত অনুপযুক্ত স্বদেশবাসী আমাকে আমার বাস্তুভিটা থেকে বহিষ্কার করেছিলে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে। কিন্তু এত অপরাধ সত্ত্বেও তোমাদের আমি ক্ষমা করে দিচ্ছি এবং তোমাদের পা থেকে দাসত্বের শৃঙ্খল আমি খুলে দিচ্ছি ও ঘোষণা করছি :
-যাও, তোমরা মুক্ত জীবন যাপন কর; কারণ তোমরা সবাই মুক্ত।” উল্লেখ্য মহানবী (সা) তার চাচার হত্যাকারী ওয়াহশীকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
মক্কা বিজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপের অবশিষ্ট অমুসলিমদের প্রায় সবারই ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পথ সুগম হয় এবং ইসলামের মূলনীতির প্রতি আকর্ষণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারদিকে। আর পবিত্র মক্কা নগরীতে মুসলমানদের এ মহান বিজয়ে মহানবীর শান্তিকামিতা ও ক্ষমাশীলতাই প্রধান বা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল।
আরো বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন: parstoday.com/bn/radio/uncategorised-i13081 ও https://parstoday.com/bn/radio/islam-i40254 #
পার্সটুডে/এমএএইচ/৩