মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বাংলাদেশের চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু
-
চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু
চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকে আজ শনিবার থেকে দেশের ৩৬৫টি চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। বাগানে বাগানে আন্দোলন চলায় চা বাগানের ফটকে ঝুলছে তালা। ফ্যাক্টরিতে চাকা বন্ধ।
জানা গেছে, চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে চা-বাগানের মালিকপক্ষের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা-সংসদের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা হয়। দুই বছর পরপর এ চুক্তি নবায়নের কথা। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১লা জানুয়ারি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করা হয়। ওই চুক্তিতে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে আর নতুন করে চুক্তি হয়নি। সম্প্রতি চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে চা-সংসদ শ্রমিকদের মজুরি ১৪ টাকা করে বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শ্রমিক নেতারা সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা মজুরী দাবিতে অনড় থাকে।
ইতোমধ্যে, চা শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি নির্ধারণসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া পূরণের বিষয়ে গত ১লা আগস্ট বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশীয় চা-সংসদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে দাবি মেনে নিতে ৭ দিনের সময়সূচি বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে দাবি না মানায় সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সে অনুযায়ী গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার এই তিন দিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে চা বাগানের শ্রমিকরা।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে প্রতিটি চা বাগানে দুই ঘন্টা করে চা কর্মবিরতি পালনের পর বৃহস্পতিবারে শ্রম দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বসে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শ্রম দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা না হওয়ায় শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেয় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকে আজ শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির কর্মসূচি পালন শুরু করেন সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রামের ১৬৭টি চা বাগানের শ্রমিকরা। এসময় বাগান মালিকদের দুদিনের আলটিমেটাম দিয়ে শ্রমিকরা জানিয়েছে, আগামী রোববার ও সোমবার সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দুদিনের মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির দাবি না মানলে মঙ্গলবার থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যাবেন তারা।
মৌলভীবাজার থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে , জেলার ৯২টি চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষে চা পাতা উত্তোলন ও চা ফ্যাক্টরিতে কাজ বন্ধ রেখেছে। দুপুর ১২ টার দিকে বিভিন্ন বাগান থেকে কয়েক হাজার শ্রমিক শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনায় জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে এবং গ বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে।
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন, বর্তমান সময়ে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে চা-শ্রমিকরা দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি দিয়ে অতি কষ্টে দিনযাপন করছেন। প্রতিটি পরিবারে খরচ বেড়েছে। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে একাধিক সময়ে বাগান মালিকদের সাথে বৈঠক করা হয়েছে। প্রতি বছর মজুরি বাড়ানোর কথা থাকলেও গত ৩ বছর ধরে নানা টালবাহানা করে মজুরি বাড়ানো হচ্ছে না। এতে করে চা শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে তারা কঠোর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
হবিগঞ্জ থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কর্মসুচীর অংশ হিসেবে শনিবার সকাল থেকে জেলার ২৪টি চা বাগানে লাগাতার ধর্মঘট পালন করছেন শ্রমিকরা। সকালে দেউন্ডি, চান্দপুর, চন্ডি ও লস্করপুর চা বাগানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শ্রমিকরা।
হবিগঞ্জের বিভিন্ন চা বাগানে বিক্ষোভ সমাবশে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন রায়, দেউন্ডি চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি প্রবীর ব্যুনার্জী, সাধারণ সম্পাদক আপন বাগতি। সকাল থেকে হবিগঞ্জের ২৪টি বাগানের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসুচি পালন করেন। পরে মিছিল নিয়ে চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করে।
অনুরূপভাবে, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকে শনিবার অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির কর্মসূচি পালন করছেন চট্টগ্রামের ২৩টি বাগানের শ্রমিকরা। তাদের দাবি, প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। অথচ বাংলাদেশের চা শ্রমিককরা ১২০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শ্রমিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদ নেতৃবৃন্দের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু চুক্তির ১৯ মাস অতিবাহিত হলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেনি মালিক পক্ষ। তাই তারা আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের দাবি না মানা হলে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনাক্রমে আন্দোলন আরো কঠোর করা করার হুমকি দেন চা শ্রমিকরা।
রামগড় চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মদন রাজগর বলেন, ‘বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের একটা বিশাল অংশ রয়েছে। এ দেশের ভোটার হয়েও তারা অবহেলিত। মৌলিক অধিকারও তাদের ভাগ্যে জুটে না। এছাড়া রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ১২০ টাকা মজুরি পায়। এভাবে আর আমরা চলতে পারছি না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সাধ্য হচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের যেভাবে দাম বেড়েছে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ চা উৎপাদনকারী দেশ। বর্তমানে এই শিল্প বিশ্বের ৩% চা উৎপাদন করে থাকে, এবং ৪০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছ। যার ৭৫% নারী। অনেক শ্রমিকই উপজাতি বাসিন্দা যাদের ব্রিটিশ শাসনামলে মধ্য-ভারত থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়া চা-বাগানের মাধ্যমে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে চা বোর্ডের নিবন্ধিত ১৬৬টি চা–বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে ৯১টি, হবিগঞ্জে ২৫টি, সিলেটে ১৯টি, চট্টগ্রামে ২২ টি, পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙামাটিতে ২টি ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১টি চা–বাগান রয়েছে। এসব বাগানে মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩৯ একর।
লন্ডনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল টি কমিটি’ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চা উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নবম। একটানা কয়েক বছর ধরেই দশম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। গত শতাব্দীর শেষে চা উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১তম, ১৯৮৯ সালে ছিল ১২তম।
সংস্থাটির হিসাবে চা উৎপাদনে এখন শীর্ষে রয়েছে চীন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ভারত। উৎপাদনে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশের নিচে আছে জাপান, উগান্ডা, নেপাল, ইরান, মিয়ানমারের মতো দেশগুলো।
২০১৬ সালে চা চাষে পুরোপুরি অনুকূল আবহাওয়ার মধ্যে রেকর্ড হয়েছিল। সে বছর সাড়ে ৮ কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়। গড়ে বছরে চা উৎপাদন হয় ৮ কোটি কেজি।#
পার্সটুডে/আব্দুর রহমান খান/রেজওয়ান হোসেন/১৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।