মিরাজ-সাকিবের নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়
মেহেদী হাসান মিরাজ ও সাকিব আল হাসানের দারুণ বোলিংয়ে দুই দিন বাকি থাকতেই ঢাকা টেস্ট জিতে নিল বাংলাদেশ। ১০৮ রানের ইতিহাসগড়া জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ এ সমতায় শেষ হলো। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের এটি প্রথম টেস্ট জয়। এর আগে ৯ টেস্টের সবগুলো হারে বাংলাদেশ।
চট্টগ্রোমে সিরিজের প্রথম টেস্টে জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও হতাশ হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। মাত্র ২২ রানের জন্য ইতিহাস গড়তে পারেননি মুশফিক বাহিনী। তবে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আর হতাশ হতে হয়নি বাংলাদেশকে।
ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিক বাংলাদেশ অলআউট হওয়ার আগে সংগ্রহ করে ২৯৬ রান, তাতে টাইগারদের লিড দাঁড়ায় ২৭২ রান।২৭৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী জুটিতেই ১০০ রান সংগ্রহ করে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। বেশ সাবলীলভাবেই ব্যাটিং করছিলেন দুই ওপেনার অ্যালিস্টার কুক ও বেন ডাকেট। সেসময় ফিকেই হয়ে আসছিল বাংলাদেশের জয়ের আশা। তবে চা বিরতির পর মিরাজ ও সাকিবের দারুণ বোলিংয়ে ব্যাটিং বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে ইংল্যান্ড। তৃতীয় সেশনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে ইংল্যান্ডের ইনিংস। ৬১ রান সংগ্রহ করতেই হারিয়েছে সব কয়টি উইকেট। প্রথম ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও পাঁচ উইকেট পেয়েছেন মেহেদি হাসান মিরাজ।
তৃতীয় সেশনের প্রথম ওভারে ডাকেটকে বোল্ড করে সাজঘরে ফিরিয়েছেন মিরাজ। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক পূর্ণ করে আউট হয়েছেন ডাকেট (৫৬)। পরের ওভারে ইংল্যান্ডের তারকা ব্যাটসম্যান জো রুটকেও সাজঘরমুখী করেছেন সাকিব। কয়েক ওভার পর ইংল্যান্ডকে জোড়া ধাক্কা দিয়েছেন মিরাজ। এক ওভারেই তুলে নিয়েছেন গ্যারি ব্যালান্স ও মইন আলীর উইকেট। ৫৯ রানের ইনিংস খেলে বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলেন অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুক। কিন্তু দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে সেই বাধাও সরিয়েছেন মিরাজ। খুব বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি জনি বেয়ারস্টোও। তাঁকেও সাজঘরমুখী করেছেন মিরাজ। ইংল্যান্ডকে শেষ জোরালো ধাক্কাটা দিয়েছেন সাকিব। এক ওভারে নিয়েছেন তিন উইকেট। একে একে সাজঘরের পথ ধরেছেন বেন স্টোকস (২৫), আদিল রশিদ (০) ও জাফর আনসারি (০)।
বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট জিততে হলে নতুন রেকর্ডই গড়তে হতো ইংল্যান্ডকে। এশিয়ায় এত বেশি রান তাড়া করে কখনোই জিততে পারেননি ইংলিশ ক্রিকেটাররা। ২০০-এর বেশি রান তাড়া করে জিতেছিল মাত্র একবারই, ২০১০ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে। সেবার ইংল্যান্ডের জয়ের লক্ষ্য ছিল ২০৯ রান।
৩ উইকেটে ১৫২ রান নিয়ে আজ তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। তৃতীয় দিনের প্রথম ১৪ ওভার নির্বিঘ্নেই কাটিয়েছিলেন ইমরুল ও সাকিব। কিন্তু ১৫তম ওভারে মইন আলীর শিকার হয়ে সাজঘরে ফিরেছেন ইমরুল। আউট হওয়ার আগে ৭৮ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেছেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। দুইবার জীবন পেয়েও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি সাকিব আল হাসান। আদিল রশিদের বলে বোল্ড হয়ে ফিরেছেন ৪১ রান করে। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও খুব বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি উইকেটে। করেছেন ৯ রান। দ্রুত রান সংগ্রহের তাগিদে ঝড়ো ব্যাটিং শুরু করেছিলেন সাব্বির রহমান। তিনটি চার মেরে করেছিলেন ১৫ রান। কিন্তু সাব্বিরকে সেখানেই থামিয়ে দিয়েছেন রশিদ। শেষপর্যায়ে শুভাগত হোমের ২৫ রানের অপরাজিত ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে জমা হয়েছে ২৯৬ রান।
ইংল্যান্ডের পক্ষে দারুণ বোলিং করে চারটি উইকেট নিয়েছেন রশিদ। তিনটি উইকেট পেয়েছেন বেন স্টোকস। দুটি উইকেট নিয়েছেন জাফর আনসারি।
ঢাকা টেস্টের দুই ইনিংসে ১২ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ পুরস্কার পেয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। আর প্রথম টেস্টে ৭ উইকেট নিয়ে তিনি সিরিজ সেরার পুরস্কারও জিতেছেন।
বাংলাদেশের পক্ষে এক সিরিজে সবচেয়ে বেশি-১৯ উইকেট তুলে নেয়ার গৌরব শুধু মিরাজের। সবচেয়ে কম বয়সে টেস্টে ১০ উইকেট নেয়ার ছোট্ট তালিকাতেও তার রয়েছে। এক টেস্টে সবচেয়ে কম বয়সে ১০ উইকেট নেয়ার তালিকায় মিরাজ আছেন পাঁচে। এ তালিকায় সবার ওপরে বাংলাদেশেরই এনামুল হক জুনিয়র। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে বাঁহাতি স্পিনার যখন ১২ উইকেট নিয়েছিলেন তাঁর বয়স ১৮ বছর ৪০ দিন। এই তালিকায় দুইয়ে আছেন ওয়াসিম আকরাম। ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডানেডিন টেস্টে দুই ইনিংসে ৫টি করে উইকেট নিয়েছিলেন এই পাকিস্তান কিংবদন্তি। ভারতের সাবেক লেগ স্পিনার লক্ষণ শিবরাম কৃষ্ণান ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুম্বাই টেস্টে ১২ উইকেট নিয়েছিলেন ১৮ বছর ৩৩৩ দিনে। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে লাহোর টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়াকার ইউনিস ১০ উইকেট নিয়েছিলেন ১৮ বছর ৩৩৬ দিনে। ১৯ বছর ৫ দিন বয়সী মিরাজ আছেন এর পরই।##
পার্সটুডে/এআর/৩০