একাদশ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ, রয়েছে নানা অভিযোগ ও আশঙ্কা
বাংলাদেশের আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নলাভে আগ্রহীদের সংখ্যা এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গতবার নির্বাচন বয়কটকারী দল বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন '২০ দলীয় জোট' এবং নবগঠিত 'জাতীয় ঐক্যফ্র্ন্ট' এবার 'আন্দোলনের অংশ হিসেবে' নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই বদলে গেছে পুরো চিত্র।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ২৩টি। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। বিগত যেকোনো নির্বাচনে এবং যেকোনো দলের চেয়ে এবার বিএনপি মনোনয়ন ফরম বিক্রিতে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
দলগুলো থেকে যে বিপুল সংখ্যক আগ্রহী প্রার্থী মনোনয়ন ফরম কিনেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন যেমন পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ নেতা, তেমনি রয়েছেন তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মী, পেশাজীবী, সংগীত শিল্পী, অভিনেতা, ব্যবসায়ী, ক্রিকেটার এ রকম নানা পেশার মানুষ।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দেশের মানুষ রাজনীতিপ্রবণ। রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহের কারণেই এবার বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ প্রচণ্ড মাত্রায় রাজনীতি সম্পৃক্ত। রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার কারণেই মনোনয়নপত্র বেশি বিক্রি হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ জনগণকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে উৎসাহী করছে বলেও মনে করেন এই প্রবীণ শিক্ষক।
পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন দেশের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ইসি'র বক্তব্য
তবে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে সেটা নিয়ে এখনো আশঙ্কা রয়ে গেছে। খোদ নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম গতকাল রাজশাহীতে নিার্বাচনী কর্মর্তাদের সভায় বলেছেন, কোথাও শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় না, তবে তারা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমকর্তাদের সক্রিয় থাকার উপদেশ দিয়েছেন।
যদিও সবগুলো বিরোধীদলের দাবি ছিল নির্বাচনে সেনা মেতায়েন করা হোক, কিন্তু নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার কাল স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, সকল নির্বাচনী কেন্দ্রে সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে না।
এ অবস্থায় জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের নেতারা গতকাল গণমাধ্যম সম্পাদকদের অনুরোধ করেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে তারাও যেন সজাগ দৃষ্টি রাখেন।
ইইউ'র প্রত্যাশা
ওদিকে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত এক প্রস্তাবে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছতার সঙ্গে হবে বলে আশা প্রকাশ করে সব রাজনৈতিক পক্ষকে সহিংসতা ও উসকানির পথ পরিহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কের পর গৃহীত ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্বাচন হতে হবে এমনভাবে যাতে জনগণের ইচ্ছার যথার্থ প্রতিফলন ঘটে।
জোটের ভোট
ইতোমধ্যে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানিয়েছে, তারা এককভাবে নাকি জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে এবং তাদের প্রতীক কী হবে।
ইসি সূত্র জানায়, বর্তমানে ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। নিবন্ধিত এই ৩৯টি দলের মধ্যে ২৪টি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীনে দুই জোটে রয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ১১টি দল বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছে ইসিতে। অন্যদিকে, বাকি ১৩টি দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলেও এর মধ্যে ১০টি দল অংশ নেবে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে। বাকি তিনটি দলের প্রতীক হবে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল। বিকল্পধারা বাংলাদেশ আবার ইসি জানিয়েছে, নৌকার পাশাপাশি নিজস্ব কুলা প্রতীকেও তারা নির্বাচন করতে আগ্রহী।
এদিকে, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের মোট ১১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুই জোটের বৃহত্তম শরিক দল বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে চিঠি দিয়েছে ইসিতে।
এই ১১টি দলের বাইরেও নিবন্ধন না থাকা আরও ১০টি দলও ধানের শীষের প্রতীকে অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
উল্লেখ্য, ২৩ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ ঠিক করে গত ৮ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। পরে অবশ্য ভোটগ্রহণের তারিখ একসপ্তাহ পিছিয়ে দিয়ে ১২ নভেম্বর পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হয়। পুনঃতফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর। এরপর কমিশন ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করবে। যোগ্য প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারবেন ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরদিন ১০ ডিসেম্বর ইসি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করলে শুরু হবে নির্বাচনী প্রচারণা।
বাম জোট
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বামপন্থি দলগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বামপন্থি ৮টি দলের জোট বাম গণতান্ত্রিক জোটে নিবন্ধিত দলগুলো হলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। এ দলগুলো গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
এ জোটের শরীক সিপিবি ১০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ৮০টির মতো আসনে সিপিবির প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বাসদ ৬০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির ইতোমধ্যে ৪০টির মতো আসনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই জোটের নিবন্ধিত অপর দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ২০টির মতো আসনে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইসলামী দল
বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে আলোচিত চরমোনাই পীরের সংগঠন ইসলামী আন্দোলন কোনো জোটেই যোগ না দিয়ে এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে ভোটের হিসেবে তাদের অবস্থান দেখা গেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র পরে তৃতীয় স্থানে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ইসলামী দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে অথবা জোট বেঁধে আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোট করতে চায়। সেজন্য ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন দলীয় নেতারা। এদের মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও তরিকত ফেডারেশন। অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত হেফাজতে ইসলামও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীকে কওমী জননী উপাধিতে ভূষিত করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করতে আগ্রহী প্রকাশ করেছে।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য
ওদিকে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার প্রক্ষাপটে গড়ে ওঠা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, যারা অতীতে জনপ্রতিনিধি হয়ে ও থেকে ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে লিপ্ত ছিলেন বা আছেন এমন কাউকে যেন মনোনয়ন না দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘এমন কাউকে প্রার্থী করা হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যালঘুদের ভোট দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’
তিনি আরো বলেন, ‘দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে চাই, দেশের ১২ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারকে উপেক্ষা করে বা পাশ কাটিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল ও জোটের ক্ষমতায়ন যেমন সম্ভব নয়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণও সম্ভব নয়। কেননা ভোটের রাজনীতিতে এরাই হলো নিয়ামক শক্তি।’#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১৭