করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ তৈরি নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ: কাদের
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বীকার করেছেন যে, 'স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের মাঝে সমন্বয়ের অভাব আছে।' আজ (মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত সরকারি বাসভবন থেকে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, করোনার চিকিৎসা, সংক্রমণরোধ এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে সুসমন্বয় প্রতিষ্ঠা জরুরি।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ যেমন উদ্বেগ বাড়িয়েছে অন্যদিকে বিদেশে দেশের ইমেজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাই এ ধরনের অপকর্ম নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভবিষ্যতে আর কোনো প্রতিষ্ঠান যেন এ ধরনের অপরাধ করতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান ওবায়দুল কাদের।
করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান বলেছেন, এ অব্যবস্থা দূর করা না হলে জনগণের কপালে দুর্ভোগ আছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক বলেছেন, স্বাস্থ্য সেবা খাতে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়ের আভাব আগে থেকেই চলে আসছে। এসব অপকর্মকারীদের কত কত শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটাই এখন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
'স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর উভয়ই দায়ী'
বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা টেস্টের অনুমতি দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উভয়কে দায়ী করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ দুই সচিবের উপস্থিতিই প্রমাণ করে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আগ্রহেই এ চুক্তি হয়েছে। অন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানকে করোনা পরীক্ষার অনুমতি দেয়া হলেও তাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মন্ত্রী কিংবা সচিব উপস্থিত ছিলেন না। সাধারণত এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই যথেষ্ট।
গতকাল ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে সাবেক এ স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবিলম্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বরখাস্ত করে গ্রেফতার করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
রিজেন্টের মালিক সাহেদ 'হাওয়া ভবনের লোক' বলে সরকারের মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা যেসব বক্তব্য রাখছেন সে বিষয়ে মোশাররফ হোসেন বলেন, ছবিই কথা বলে। হাওয়া ভবনের লোক হয়ে থাকলে সে এতদিন আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্র উইংয়ের সদস্য থাকে কীভাবে?
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন ইঁদুর-বিড়াল খেলছে। জাতি ও দেশের জন্য এটি দুর্ভাগ্যের বিষয়। তারা দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। বিদেশে দেশের ইমেজ নষ্ট করেছে। প্রথমে করেছে মাস্ক কেলেঙ্কারি। এরপর ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট দিয়েছে তার অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি হাসপাতাল রিজেন্ট ও জিকেজি হেলথ কেয়ার। এই ভুয়া সার্টিফিকেটের কারণে হাজার হাজার মানুষের বিদেশ যাওয়া বন্ধ হয়েছে। এরা দেশ ও জাতির শত্রু। এই অপরাধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে গ্রেপ্তার করে তাদের বিচার করা উচিত।
নমুনা পরীক্ষা নিয়ে লুকোচুরি
নমুনা পরীক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লুকোচুরি করছে বলে অভিযোগ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, উচ্চ সংক্রমণের এ সময়ে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি প্রতিদিন ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তা কমিয়ে ১১ হাজারে নামানো হয়েছে।
এর মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। মানুষ সচেতন হয়েছে। এসব কারণে নমুনা পরীক্ষা কমেছে। এসব কথা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে তারা প্রলাপ বকছেন। না হলে কীভাবে বললেন, সংক্রমণ কমছে। নমুনা পরীক্ষা কমিয়ে আনার পর তো দেখা গেল শনাক্তের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুহারও বেড়েছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগ কিসের ওপর ভিত্তি করে এসব কথা বলে তা জানতে চাওয়া প্রয়োজন।
ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, দেশে বর্তমানে ৭৭টি ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে তিন থেকে চারটি করে আরটি-পিসিআর মেশিন রয়েছে। এ হিসাবে ৮৫টি মেশিন ধরলেও প্রতিটিতে তিন শিফটে প্রতিদিন ২৮৮টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। এতে ৮৫টি মেশিনে প্রায় ২৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু পরীক্ষা করা হচ্ছে অর্ধেকেরও কম।
রিজেন্টের দুর্নীতির নথি চেয়েছে দুদক
রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নথিপত্র চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
মঙ্গলবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে অনুসন্ধান টিম প্রধান উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিকের সই করা তলবি চিঠি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ-এর প্রধান বরাবর পাঠানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বরাবর পাঠানো চিঠিতে রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের উত্তরা ও মিরপুর শাখার ইস্যুকৃত লাইসেন্স ও নবায়ন সংক্রান্ত নথির সত্যায়িত কপি চাওয়া হয়েছে। তলব করা হয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষার চুক্তিপত্র, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান ও বিভিন্ন বিল পরিশোধের সত্যায়িত কপি এবং অধিদপ্তরের কাছে পেশ করার বিলের কপিসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ এর প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বরাবর পাঠানো চিঠিতে রিজেন্ট হাসপাতাল ও গ্রুপের নামে-বেনামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব, সাহেদের ব্যক্তিগত হিসাব ও তার পরিবারের সদস্যের নামে থাকা ব্যাংক ঋণ বিবরণসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। উভয় তলবি চিঠিতে দ্রুত নথিপত্র দুদকে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।