ইসরায়েলে বিতর্ক অব্যাহত; সবাই বলছে নেতানিয়াহুর ব্যর্থ সাক্ষাৎকারের কথা
https://parstoday.ir/bn/news/event-i159384-ইসরায়েলে_বিতর্ক_অব্যাহত_সবাই_বলছে_নেতানিয়াহুর_ব্যর্থ_সাক্ষাৎকারের_কথা
পার্সটুডে: সিবিএস নেটওয়ার্কের “৬০ মিনিট” অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহুর সাক্ষাৎকার ইহুদিবাদী ইসরায়েলের গণমাধ্যম ও পত্রিকাগুলোতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে; এতটাই যে অধিকাংশ বিশ্লেষক এই সাক্ষাৎকারকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বের গভীর সংকটের এক পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেছেন।
(last modified 2026-05-14T13:48:36+00:00 )
মে ১৪, ২০২৬ ১৯:১৮ Asia/Dhaka
  • দখলদার ও বর্ণবাদী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ-অপরাধী ও কুখ্যাত শিশু-ঘাতক নেতানিয়াহু
    দখলদার ও বর্ণবাদী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ-অপরাধী ও কুখ্যাত শিশু-ঘাতক নেতানিয়াহু

পার্সটুডে: সিবিএস নেটওয়ার্কের “৬০ মিনিট” অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহুর সাক্ষাৎকার ইহুদিবাদী ইসরায়েলের গণমাধ্যম ও পত্রিকাগুলোতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে; এতটাই যে অধিকাংশ বিশ্লেষক এই সাক্ষাৎকারকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বের গভীর সংকটের এক পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেছেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ গ্রুপ: সিবিএস-এর “৬০ মিনিট” অনুষ্ঠানে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাক্ষাৎকার শুধু আমেরিকান জনমতকে উদ্দেশ্ করে দেয়া একটি সাধারণ মিডিয়া উপস্থিতি ছিল না। এই আলাপচারিতা ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে; এমনকি অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, এই সাক্ষাৎকার ছিল ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বের গভীর সংকটের এক নগ্ন প্রতিফলন। এক ক্লান্ত ও অবসন্ন নেতৃত্ব, যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়ে হাজির হয়েছিল এবং পুরো সাক্ষাৎকার-জুড়ে শুধু দায়িত্ব এড়িয়েই যায়নি,  একইসঙ্গে ইরান ও গাজা যুদ্ধ এবং “তুফান আল-আকসা” অভিযানের পরিণতি নিয়ে তার প্রতিটি কথায় রাজনৈতিক বিভ্রান্তি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

পতন ও ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে নেতৃত্ব

প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে “হারেৎজ” পত্রিকা ও তার বিশ্লেষক “ইওআনা গোনেন”-এর কাছ থেকে। তিনি মনে করেন, এই সাক্ষাৎকারের জন্য নেতানিয়াহুর বেছে নেয়া স্থানটি কোনও সাধারণ বা সাময়িক বিষয় নয়; একটি সরকারি কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার বদলে নেতানিয়াহু জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন-ইসরায়েলি ধনকুবের “সাইমন ফালিক”-এর ভিলার আশ্রয়কেন্দ্রকে বেছে নিয়েছিলেন। গোনেন এই নির্বাচনকে “এক বৃদ্ধ ও অসহায় নেতৃত্বের” প্রতীক হিসেবে দেখেন, যে তার ধনী বন্ধুর বাঙ্কারে লুকিয়ে থেকে সাহস ও দায়িত্বশীলতার কথা বলছে।

গোনেন শুধু বাহ্যিক বিষয়ের বর্ণনাতেই থেমে থাকেননি; তিনি এই সাক্ষাৎকারকে এক রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন এবং লিখেছেন: “তিনি এমন এক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনে হচ্ছিলেন, যিনি নিরন্তর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার কথা বলছেন, অথচ সেই ক্ষমতার ভারেই নুয়ে পড়েছেন।” এরপর তিনি নেতানিয়াহুর নিজেরই বলা সরকার পতনের মন্তব্য তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছেন; যেখানে তিনি বলেছিলেন: “এটি প্রথমে ধীরে ধীরে ঘটে, তারপর হঠাৎ ভেঙে পড়ে।” গোনেন জোর দিয়ে বলেন, এই একই নিয়ম নেতানিয়াহুর তথাকথিত চিরস্থায়ী মন্ত্রীসভার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; এই সরকার ধীরে ধীরে স্তর স্তর করে ভাঙতে থাকবে এবং একসময় হঠাৎ করেই ধসে পড়বে।

হারিয়ে যাওয়া দিক-নির্দেশনা

“মারিভ” পত্রিকার সিনিয়র আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক “শ্লোমো শামির” লিখেছেন, এই সাক্ষাৎকার এমন এক কর্মকর্তার ছবি এঁকেছে, “যিনি এক কাল্পনিক জগতে বাস করেন এবং বাস্তবতার প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছেন।” শামিরের মতে, নেতানিয়াহু এই সাক্ষাৎকারে “এক ক্লান্ত ও জীর্ণ বৃদ্ধের” মতো মনে হচ্ছিলেন, যার কাছে আমেরিকান বা ইসরায়েলি দর্শকদের বোঝানোর মতো নতুন কিছু ছিল না।

এই লেখকের মতে, “এই সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়েছে, তা হল ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্রনীতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা।” তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প একদিকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছেন এবং অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারে ব্যস্ত আছেন; যেসব দেশকে শামির “ইসরায়েলবিরোধী অক্ষ” হিসেবে বর্ণনা করেন। অথচ নেতানিয়াহু “এসব বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।”

শামির ২০১৬ সালে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর দেয়া বক্তব্য এবং পারমাণবিক চুক্তির কারণে বারাক ওবামার বিরুদ্ধে তার আক্রমণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নেতানিয়াহুর নীরবতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং লিখেছেন: “সমস্যা শুধু একটি দুর্বল সাক্ষাৎকারে নয়, একইসঙ্গে তার গভীর রাজনৈতিক বিভ্রান্তিতেও নিহিত।”

পরস্পরবিরোধী ও মিথ্যা বক্তব্য

“ইয়েদিওত আহরোনোত” পত্রিকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক “ইতামার আইখনার” নেতানিয়াহুর সাক্ষাৎকারের আরেকটি দিক—অর্থাৎ “ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি”—নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তার বিশ্লেষণে তিনি নেতানিয়াহুর বক্তব্যের একটি মৌলিক অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। নেতানিয়াহু ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের (ইসরায়েলে তথাকথিত “গর্জনকারী সিংহ” অভিযান) পর দাবি করেছিলেন: “আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে যেকোনো উপায়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করব এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে।” কিন্তু ২০২৬ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট অবস্থান পরিবর্তন করে বলেছেন: “কাজ এখনো শেষ হয়নি; এমন পারমাণবিক উপাদান রয়েছে যা ইরান থেকে বের করে আনতে হবে এবং এখনো এমন পারমাণবিক স্থাপনা আছে যেগুলো নিষ্ক্রিয় করতে হবে।”

দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া

তবে ৭ অক্টোবরের ঘটনা (“তুফান আল-আকসা” অভিযান) এবং তার পরিণতি—যার ফলে গাজায় আড়াই বছরেরও বেশি যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা এবং বিশেষ করে আমেরিকা ও পশ্চিমে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এই সাক্ষাৎকারের “ব্ল্যাক হোল” বা 'কলঙ্কিত গর্ত' হিসেবেই রয়ে গেছে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক “ইয়োসি ভার্টার” ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায় স্বীকারে নেতানিয়াহুর অস্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন: “তিনি যেকোনো ব্যক্তিগত দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।” যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করলেও তিনি কীভাবে এখনো ক্ষমতায় আছেন, তখন নেতানিয়াহু প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে বলেন: “সবাই বলে আমি দায়ী এবং আমার চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু কে বলেছে দায়িত্ব মানেই চলে যাওয়া? হয়তো দায়িত্ব মানে থেকে যাওয়া এবং চালিয়ে যাওয়া।” এটি ছিল জবাবদিহিতার মানদণ্ড পরিবর্তনের জন্য এক ধরনের শব্দের খেলা।

ভার্টার বলেন: “এই বক্তব্য এমন এক প্রধানমন্ত্রীর সংকটের সারাংশ প্রকাশ করে, যিনি জবাবদিহি ও বিচারের ঊর্ধ্বে থাকতে চান, অথচ ব্যর্থতার পরিণতি ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী, সেনাবাহিনী ও ইসরায়েলি সমাজকে আঘাত করেছে।” লেখকের মতে, যেখানে নিরাপত্তা কমান্ডাররা নিজেদের পদ ছেড়ে দিয়েছেন বা ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন, সেখানে নেতানিয়াহু দায়িত্বের ধারণাটিকে একটি ফাঁকা বুলির ভাষাগত বিতর্কে পরিণত করতে চাইছেন, কোনও স্পষ্ট রাজনৈতিক বা নৈতিক জবাবদিহিতা হিসেবে নয়।

উপসংহার

বর্ণবাদী ও দখলদার ইসরায়েলের “হারেৎজ”, “মারিভ” এবং “ইয়েদিওত আহরোনোত” পত্রিকার বিশ্লেষণের পাশাপাশি সামরিক রেডিওর “ইয়ানির কোজিন”-এর পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে নেতানিয়াহুর এই সাক্ষাৎকারকে আর কেবল একটি মিডিয়া-উপস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটিকে “একটি যুগের সমাপ্তির” লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে— এ এমন এক যুগ যেখানে নেতানিয়াহু এখনো প্রধান চরিত্র হয়ে থাকতে চান, যদিও তার রাজনৈতিক মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।

গোনেনের দৃষ্টিতে, ইসরায়েল এমন এক শাসক-কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি, যা সম্পূর্ণ ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভার্টার ও কোজিনের মতে, সমাজ এমন এক নেতার সম্মুখীন, যার শারীরিক অবস্থা তার যোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শামিরের দৃষ্টিতে, তারা এমন এক প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি, যিনি ট্রাম্প এবং আমেরিকার নতুন পরিবর্তনের সামনে গভীর বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। আর আইখনারের মতে, তারা এমন এক কর্মকর্তাকে দেখছেন, যিনি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এখনো “মিথ্যা বিজয়ের” বয়ান এবং ভুয়া দাবির পুনরুৎপাদনের আশ্রয় নিচ্ছেন, যাতে নতুন যুদ্ধের আগুন জ্বালানো যায়।

সিবিএস-এর পর্দায় যা দেখা গেছে, তা ছিল এক ভিন্ন চিত্র: এমন এক প্রধানমন্ত্রীর ছবি, যিনি যুদ্ধের ভারে নুয়ে পড়েছেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং মিথ্যা অর্জনের পরস্পরবিরোধী গল্প বলে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছেন। #
 

পার্সটুডে/এমএএইচ/১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন