'যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করছে'
রয়টার্স থেকে নিউইয়র্ক টাইমস: কোহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন অস্ত্র আঘাত হানার প্রমাণ
-
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিকের কোহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন অস্ত্র আঘাত হানে
পার্সটুডে: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিকের কোহেস্তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধকে আর যুদ্ধের পরস্পরবিরোধী বর্ণনার আড়ালে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পশ্চিমা গণমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা একের পর এক এমন প্রমাণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন অস্ত্রের সরাসরি আঘাত এবং বেসামরিক মানুষের নিহত ও আহত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
রয়টার্স একটি অস্ত্রবিশ্লেষণে যাচাইকৃত ছবি ও ভিডিও এবং চারজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ঘটনাস্থলের বিস্ফোরণ ও ধ্বংসের ধরন একটি ৫০০ পাউন্ড ওজনের মার্কিন অস্ত্রের সরাসরি আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের একজন আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, “প্রমাণগুলোর সামগ্রিক চিত্র আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত ৫০০ পাউন্ডের একটি মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে।”
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি স্বাধীন তদন্তও এই বর্ণনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। স্যাটেলাইট ছবি, যাচাইকৃত ভিডিও এবং অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ মিলিয়ে পত্রিকাটি ঘটনাস্থলে পাওয়া অংশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত JSOW নির্দেশিত বা গাইডেড বোমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে শনাক্ত করেছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ প্রযুক্তিবিদ ট্রেভর বল ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে এর পেছনের পাখনা এবং দেহের কিছু অংশকে ওই অস্ত্র-শ্রেণীর বলে শনাক্ত করেছেন।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা গণমাধ্যম, দুটি স্বাধীন তদন্ত এবং দৃশ্যমান ও অস্ত্রসংক্রান্ত প্রমাণের একটি সমষ্টি এখন একটি অভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। একটি মার্কিন অস্ত্র এমন একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হেনেছে, যেখানে মানুষ একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সমবেত হয়েছিলেন।
তবে কোহেস্তাকের গুরুত্ব শুধু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এবার সমালোচকদের কণ্ঠ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর ভেতর থেকেও উঠেছে। পেন্টাগনের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সাবেক কর্মকর্তা এবং যুদ্ধাপরাধ বিশ্লেষক ওয়েস জি. ব্রায়ান্ট এই হামলার প্রতিক্রিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করছে কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন: “হ্যাঁ।” এরপর মার্কিন সামরিক কাঠামোর অভ্যন্তরে নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন তার সামরিক অভিযানে “বেপরোয়াভাবে ও অবহেলার সঙ্গে বেসামরিক মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং হত্যা করে।”
এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়। যিনি এ কথা বলেছেন, তিনি মার্কিন সামরিক কাঠামোর বাইরের কোনো ব্যক্তি নন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আগে পেন্টাগনে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের দায়িত্বে ছিলেন। ফলে মার্কিন সামরিক অভিযানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতা সম্পর্কে তাঁর সাক্ষ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
রাজনৈতিক পর্যায়েও মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ডেলিয়া রামিরেজ একই বাস্তবতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছেন। কোহেস্তাক হামলার পর তিনি লিখেছেন: “ফিলিস্তিন থেকে ইরান পর্যন্ত, আমাদের বোমা নিরীহ নারী ও শিশুদের হত্যা করছে।” এরপর তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কংগ্রেস আর “ট্রাম্প ও হেগসেথের যুদ্ধাপরাধের” প্রতি চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না।
এই বক্তব্যটি সম্ভবত কোহেস্তাকে যা ঘটেছে তার সবচেয়ে স্পষ্ট সারসংক্ষেপ: “আমাদের বোমা।” কোনো অজ্ঞাত বোমা নয়, এমন কোনো অস্ত্র নয় যার উৎস অজানা; বরং এমন একটি বোমা, যেটিকে মার্কিন কংগ্রেসের একজন সদস্য নিজের দেশের অস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং একই সঙ্গে তা দিয়ে নারী ও শিশুদের হত্যার কথা বলেছেন।
এখন এসব বক্তব্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। রয়টার্স মার্কিন অস্ত্রের কথা বলছে। নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন সাবেক বিশেষজ্ঞ এসব প্রমাণকে একটি মার্কিন বোমার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
পেন্টাগনের একজন সাবেক কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে বেসামরিক মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলা ও হত্যার কথা বলছেন। মার্কিন কংগ্রেসের একজন সদস্যও “আমাদের বোমা” দিয়ে নারী ও শিশুদের নিহত হওয়ার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করছেন। এটি আর কোনো মার্কিন হামলা নিয়ে শুধু ইরানের বর্ণনা নয়; বরং এটি এমন একটি ঘটনা, যার কাহিনি পশ্চিমেরই কিছু অংশ নিজেদের নথি ও বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছে।
কোহেস্তাক শুধু ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি শহরের নাম নয়। কোহেস্তাক এমন একটি প্রমাণে পরিণত হয়েছে, যা পশ্চিমের মানবাধিকার বিষয়ক দাবির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলোর বাস্তবতার ব্যবধানকে উন্মোচিত করে। এখানে নিহত ও আহত ব্যক্তিরা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন না; তারা ছিলেন একটি বাড়িতে, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের মাঝখানে। শিশু ও নারী নিহত এবং আহত হয়েছেন, আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মার্কিন অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে।
সুতরাং এখন বিশ্ব এমন একটি অপরাধের মুখোমুখি, যার দায়ী পক্ষ আর অস্বীকারের দেয়ালের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। কোহেস্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলোর প্রকৃত চেহারা— এসবই এমন যুদ্ধের অংশ যেখানে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্যবাদী লক্ষ্য ও দাবি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। #
পার্সটুডে/এমএআর/০৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।