জাতিসংঘে ভাষণে ট্রাম্পের ১০টি মিথ্যা: গার্ডিয়ান
https://parstoday.ir/bn/news/event-i163374-জাতিসংঘে_ভাষণে_ট্রাম্পের_১০টি_মিথ্যা_গার্ডিয়ান
পার্সটুডে: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহে বিজয়ী, সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই চিত্রের বড় একটি অংশ পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
(last modified 2026-09-24T14:25:06+00:00 )
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ ২০:০২ Asia/Dhaka
  • মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
    মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

পার্সটুডে: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহে বিজয়ী, সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই চিত্রের বড় একটি অংশ পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের মতো গণমাধ্যমের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভাষণের বিভিন্ন অংশে ট্রাম্প হয় পরিসংখ্যানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে বলেছেন, অথবা যেসব ঘটনা এখনো চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছায়নি, সেগুলোকে নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

বিশ্বে ৬০ শতাংশ তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যের সঙ্গে এই দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দেশের সম্মিলিত তেল মজুত বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ২২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক উৎপাদনে তাদের সম্মিলিত অংশ প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৬০ শতাংশের দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিসংখ্যানের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

গাজা যুদ্ধের সমাপ্তির দাবি

ট্রাম্প গাজা যুদ্ধের সমাপ্তিকে নিজের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এমন ফলাফলকে সমর্থন করে না। যুদ্ধবিরতির অর্থ পুরোপুরি হামলা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয় এবং যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। তাই শুধু যুদ্ধবিরতি অর্জনকে যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তির সমতুল্য বলা যায় না।

মাদক পাচার ৯৭ শতাংশ বন্ধ করার দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছেন, মাদক পাচারকারী নৌযানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা সমুদ্রপথে মাদক পরিবহনের ৯৭ শতাংশ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এত বড় হ্রাসের পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে দেখা যায়, মাদক পাচার নেটওয়ার্কের একটি অংশ কেবল তাদের রুট পরিবর্তন করেছে। ফলে ৯৭ শতাংশের সংখ্যাটি প্রমাণিত পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বড় এবং পর্যাপ্ত ভিত্তিহীন একটি দাবি বলে প্রতীয়মান হয়।

আটটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর তিনি আটটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। তবে সিএনএনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার তালিকায় থাকা অন্তত কয়েকটি ঘটনা মূলত তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় সংঘটিত যুদ্ধই ছিল না। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও রুয়ান্ডার ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তি সংঘাতের সম্পূর্ণ সমাপ্তি বোঝায়নি এবং গাজাতেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প নিজেই ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় যুদ্ধ শুরু করেছেন—এমন দাবিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণের দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু সিএনএন জানিয়েছে, এই অঙ্কটি যাচাই করা সম্ভব নয়। এমনকি হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা অঙ্কও প্রায় ১১.২ ট্রিলিয়ন ডলার। তাছাড়া এই অঙ্কের মধ্যে প্রতিশ্রুতি, মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ এবং এমন কিছু অঙ্গীকার রয়েছে, যেগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের অর্থ বহন করে না।

প্রায় সীমাহীন অস্ত্র ও গোলাবারুদ থাকার দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে যে সেগুলোর সব ব্যবহার করার কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রতিবেদন এবং কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের মূল্যায়নে বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদের ঘাটতি, উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যা এবং কিছু মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর সম্পর্কেও মজুত পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে। সিএনএন সামগ্রিক অপরাধের পরিসংখ্যান দিয়ে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত নিবন্ধিত অপরাধের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি এবং ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক হ্রাস প্রায় ২৩ শতাংশ—৮৭ শতাংশ নয়।

‘পৃথিবী শীতল হয়ে যাওয়ায়’ জলবায়ু পরিবর্তনের নামকরণের দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, যারা একসময় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন, পরে পৃথিবী শীতল হয়ে যাওয়ায় তারা এর নাম জলবায়ু পরিবর্তন করে দেন। বৈজ্ঞানিক তথ্য এই দাবির বিপরীত চিত্র দেখায়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত আগের ১১ বছর ছিল রেকর্ডকৃত সময়ের উষ্ণতম বছরগুলো। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালও রেকর্ডের অন্যান্য বছরের তুলনায় উষ্ণতম তিন বছরের অন্তর্ভুক্ত।

সিএনএন আরও উল্লেখ করেছে, ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত প্রতিবেদনে বলা হয়নি যে ‘সবাই ১২ বছরের মধ্যে মারা যাবে’; বরং সেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ব্যাপকভাবে কমানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি

ট্রাম্প তার ভাষণে আবারও ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে মার্কিন নীতির যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং ইরানের সক্ষমতা ধ্বংসের কথা বলেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রাথমিক দাবিগুলো নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কংগ্রেসের এক বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে হামলার সাফল্যের মাত্রা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও ট্রাম্পের সর্বোচ্চ মাত্রার দাবির সঙ্গে ভিন্নতা দেখিয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের দাবি

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরানের যুদ্ধ সম্পর্কে তার বর্ণনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেকে একটি সফল ও নির্ধারণমূলক অভিযানের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন, অথচ যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে এবং এখনো শেষ হয়নি। সিএনএন জানিয়েছে, জাতিসংঘে ট্রাম্প আবারও ইরানকে ‘ধ্বংসের’ হুমকি দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির কথাও বলেছেন। এই বৈপরীত্য থেকে বোঝা যায়, ইরান ইস্যু এখনো ওয়াশিংটনের জন্য সমাধান হয়নি।

ভাষণের আগেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ‘অনেক অগ্রগতি’র কথা বলেন। অথচ একই সিএনএন প্রতিবেদনে এমন একটি জরিপের উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায়, মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি সন্তুষ্ট। মার্কিন জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও মনে করে না যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ওয়াশিংটন বিজয়ী হয়েছে।

বাস্তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের মূল বিষয়টি ‘বিজয়ের বর্ণনা’ এবং ‘যুদ্ধের বাস্তবতার’ মধ্যকার ব্যবধানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে থাকত, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একই সঙ্গে ইরানের ধ্বংস, আলোচনা এবং সম্ভাব্য চুক্তির কথা বলতে হতো না। যে যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা সাত মাস পরও অব্যাহত রয়েছে এবং ওয়াশিংটন এখনো এর সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা করছে।

এ কারণে জাতিসংঘে ট্রাম্পের দাবিগুলোর তালিকা শুধু পরিসংখ্যানগত ভুলের সমষ্টি নয়। এসব সংখ্যা ও বর্ণনা এমন একটি সরকারের চিত্র তুলে ধরে, যা তার অর্জনগুলোকে বাস্তবতার তুলনায় বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছে—তেল ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে সমাপ্ত হওয়া যুদ্ধ, সামরিক মজুত এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের যুদ্ধ পর্যন্ত। এই প্রেক্ষাপটে ইরান ট্রাম্পের বর্ণনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি; কারণ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত ফলাফল উপস্থাপন করতে না পারার বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপস্থাপিত ‘সুস্পষ্ট বিজয়ের’ চিত্রের সঙ্গে ভিন্নতা তৈরি করছে। #
 

পার্সটুডে/এমএএইচ /২৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।