ট্রাম্পের প্রচারযুদ্ধ ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবে না: মিয়ারশাইমার
'প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে ডুবে যাওয়ার ভয়ে পারস্য উপসাগরের বাইরে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী'
-
বিশিষ্ট মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ারশাইমার
পার্সটুডে: বিশিষ্ট মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ারশাইমার ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান কৌশল প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সমন্বিত প্রচারযুদ্ধ চালিয়ে তেহরানকে ভয় দেখিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা ব্যর্থ হবে।
নিজের ইউটিউব সিরিজের একাদশ পর্বে মিয়ারশাইমার চলমান সংঘাত মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর উপসংহার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কার্যকর কোনো সামরিক বিকল্প নেই এবং সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানের মনোবল ভাঙা যাবে না।
মিয়ারশাইমার বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশাসন মূলধারার গণমাধ্যমে একটি প্রচারযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ইরানিদের বোঝানো যায় যে তাদের পরাজয় অনিবার্য এবং পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি স্পষ্টতই আমেরিকার পক্ষে চলে গেছে।” তিনি উল্লেখ করেন, মূলধারার গণমাধ্যম “কর্তব্যপরায়ণভাবে এই প্রচারে অংশ নিচ্ছে” এবং সরকারি দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই না করেই সেগুলো পুনরাবৃত্তি করছে।
তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, ইরানিদের প্রতারিত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার এই প্রচেষ্টা... সফল হবে না। এর বড় একটি কারণ হলো, বাস্তব তথ্যই এর বিপরীত কথা বলে।”
মিয়ারশাইমার ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখান যে, সেগুলো মূলত দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে: অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে শ্বাসরুদ্ধ করা এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি।
সামরিক দিক: যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা ও একটি বিমানবাহী রণতরি এই অঞ্চলে পাঠানোর গুরুত্বকে তিনি খাটো করে দেখেন। তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে ৪০ দিন ধরে চালানো কৌশলগত বোমাবর্ষণ অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। তাহলে নতুন আরেকটি অভিযান সফল হবে বলে কেউ কেন আশা করবে—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ ছাড়া, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে “গোলাবারুদের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি” রয়েছে বলে তিনি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বর্তমানে বোমাবর্ষণ সীমিত থাকার অন্যতম প্রধান কারণ এটি।
নৌবাহিনীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিয়ারশাইমার জানান, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরিটি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে না; বরং সেটির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে। ইউএসএস জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ বর্তমানে থাইল্যান্ডে অবস্থান করায় এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে মাত্র একটি বিমানবাহী রণতরি। সেটিও ইরানের আশপাশের অঞ্চলে যাওয়া মাত্রই “প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে'' ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় পারস্য উপসাগরের বাইরে অবস্থান করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, উচ্চমাত্রার সামরিক তৎপরতা মার্কিন নৌবাহিনীকে চরম চাপের মুখে ফেলছে এবং সরবরাহসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোও বিশাল। এ ক্ষেত্রে দিয়েগো গার্সিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ইরানের তেল অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মিয়ারশাইমার তেহরানের “দ্বিতীয় আঘাত হানার সক্ষমতা” সম্পর্কে সতর্ক করেন। তাঁর যুক্তি, ইরানের তেল স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালানো থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিরত রয়েছে, কারণ তাদের “প্রবল আশঙ্কা রয়েছে যে ইরানিরাও বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশের অভ্যন্তরে এবং ইসরায়েলের তেল অবকাঠামোতে একই ধরনের হামলা চালাবে।”
ইরানে স্থল অভিযান চালানোও বাস্তবসম্মত নয়
মিয়ারশাইমার ইরানে মার্কিন স্থল অভিযান চালানোর ধারণাকেও উপহাস করেছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলে অবস্থানরত প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন সেনার মধ্যে সর্বোচ্চ ৭,৫০০ জন স্থল হামলায় অংশ নেওয়ার উপযোগী যুদ্ধসেনা।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনাবাহিনীর চার তারকা জেনারেল ব্যারি ম্যাকক্যাফ্রির বক্তব্য উদ্ধৃত করে মিয়ারশাইমার বলেন, শুধু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্যই ১ লাখ ৫০ হাজার যুদ্ধসেনা এবং তিন থেকে ছয় মাসের লড়াই প্রয়োজন হবে।
১ লাখ ৯০ হাজার সেনা নিয়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের জনসংখ্যা রাশিয়ার তুলনায় দ্বিগুণ এবং দেশটির ভূপ্রকৃতিও অনেক বেশি দুর্গম।
তিনি বলেন, “মাত্র ৭,৫০০ সেনা নিয়ে আমরা ইরানে আক্রমণ চালাতে পারব কিংবা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারব—এমন ধারণা কোনোভাবেই গুরুতর যুক্তি নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, বিপুলসংখ্যক সেনার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা আমেরিকার জনগণ কখনোই মেনে নেবে না।
অর্থনৈতিক চাপেও আত্মসমর্পণ করবে না ইরান
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মিয়ারশাইমার স্বীকার করেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ইরানের ওপর “ব্যাপক দুর্ভোগ” সৃষ্টি করছে। তবে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, এর ফলে ইরান আত্মসমর্পণ করবে।
নিজের মূল্যায়নের পক্ষে তিনি তিনটি কারণ তুলে ধরেন।
প্রথমত, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, এমন কোনো বড় যুদ্ধের উদাহরণ তাঁর জানা নেই, যেখানে শুধু অবরোধের মাধ্যমে কোনো দেশকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছ থেকে ইরান একটি “অস্তিত্বগত হুমকির” মুখোমুখি।
মিয়ারশাইমার বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার কথা বলেছেন। আমার হিসাব অনুযায়ী, অন্তত সাতবার তিনি কার্যত ইরানকে ধ্বংস করে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথা বলেছেন।” তিনি আরও বলেন, “আর আপনি যদি অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়েন, তাহলে আপনার জাতির শেষ ব্যক্তিটিও লড়াই চালিয়ে যান।”
তৃতীয়ত, চরম পরিস্থিতিতে ইরানের পাল্টা আঘাত। তিনি সতর্ক করেন, ইরানকে কোণঠাসা করা হলে দেশটি “বিধ্বংসী চূড়ান্ত পাল্টা জবাব” দিয়ে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, “এখানে ইরানিদের পাল্টা আঘাত হানার একটি বিকল্প রয়েছে। তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে... তাছাড়া, তারা পুরো অঞ্চলের লবণাক্ত পানি পরিশোধনাগারগুলোতে হামলা চালিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, এমনকি ইসরায়েলের মতো দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।”
তাঁর সতর্কতা অনুযায়ী, এ ধরনের হামলা “সৌদি আরবকে একটি কার্যকর সমাজ হিসেবে ধ্বংস করে দিতে পারে” এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও পশ্চিমা অর্থনীতি সংকটে
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসছে—এমন দাবির প্রসঙ্গে মিয়ারশাইমার বলেন, ইরান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং “নতুন, আরও উন্নত ও আরও কার্যকর হামলা” চালাচ্ছে।
তিনি সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, হুতিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বর্তমানে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও মিয়ারশাইমার উল্লেখ করেন, বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক—যেমন ইউরোপের মূল্যস্ফীতির হার, ঋণপত্র বা বন্ডের মুনাফার হার এবং যুক্তরাষ্ট্রে গৃহঋণের খরচ—দেখিয়ে দিচ্ছে যে পশ্চিমা ও এশীয় অর্থনীতিগুলো এখনো “গভীর সংকটে” রয়েছে।
উপসংহারে মিয়ারশাইমার বলেন, “বর্তমানে আমাদের হাতে কোনো সামরিক বিকল্প নেই এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও এমন কোনো বিকল্প আমাদের হাতে আসবে না।”
তিনি আরও বলেন, “এই মুহূর্তে ইরানিদের ধোঁকা দিয়ে বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। তারা অনেক বেশি বুদ্ধিমান, অনেক বেশি জ্ঞানসম্পন্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবিলায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ। তাই আমাদের হাতে সুবিধা রয়েছে—এমন ধারণা দিয়ে তাদের প্রতারিত করা সম্ভব নয়।” #
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।