সৌদি শাসকগোষ্ঠী সুন্নি মাজহাবের প্রতিনিধিত্ব করে না: আল-হুথি
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i163800-সৌদি_শাসকগোষ্ঠী_সুন্নি_মাজহাবের_প্রতিনিধিত্ব_করে_না_আল_হুথি
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর নেতা সাইয়্যেদ আবদুল মালিক আল-হুথি নিপীড়ন ও দ্বিচারিতার জন্য আমেরিকা, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের নিন্দা করেছেন। তিনি সৌদি শাসকদের বিরুদ্ধে ইসলামি স্লোগান ব্যবহারের অভিযোগ এনে বলেছেন, একই সময়ে তারা বাস্তবে মুসলমানদের হত্যা করছে।
(last modified 2026-10-08T14:53:14+00:00 )
অক্টোবর ০৮, ২০২৬ ২০:৪৬ Asia/Dhaka
  • আবদুল মালিক আল-হুথি
    আবদুল মালিক আল-হুথি

ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর নেতা সাইয়্যেদ আবদুল মালিক আল-হুথি নিপীড়ন ও দ্বিচারিতার জন্য আমেরিকা, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের নিন্দা করেছেন। তিনি সৌদি শাসকদের বিরুদ্ধে ইসলামি স্লোগান ব্যবহারের অভিযোগ এনে বলেছেন, একই সময়ে তারা বাস্তবে মুসলমানদের হত্যা করছে।

২০১৬ সালে সৌদি যুদ্ধবিমান দিয়ে সানার ‘গ্র্যান্ড হল’-এ হামলার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে আজ দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, সৌদি আগ্রাসনকে যারা সমর্থন করে—তা কোনো সরকার হোক, গোষ্ঠী হোক কিংবা সংগঠন—তারা নিজেদের পাপ, অপরাধ ও অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলছে। এর দুনিয়া ও আখিরাতে পরিণতি রয়েছে।

তিনি বলেন, উম্মাহর বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। আনুগত্য ও শত্রুতার প্রশ্নে অনেক সিদ্ধান্ত এখন ইসলামি নীতি, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গেছে।

'সৌদি শাসকগোষ্ঠী জায়নবাদী পথ অনুসরণ করছে'

সাইয়্যেদ আবদুল মালিক আল-হুথি বলেছেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ বা সুন্নি মাজহাবের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং তারা জায়নবাদী পথ অনুসরণ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, সৌদি আরব ইসলামি স্লোগান ব্যবহার করলেও বাস্তবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ও আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।

আল-হুথি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৌদি আগ্রাসীদের সঙ্গে মিলে শিশু ও নারী হত্যা এবং ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, সে নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং নিজের দেশেরও ক্ষতি করে। শিশু ও নারীদের হত্যাকারীর পাশে দাঁড়ানো এবং তার সঙ্গে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বড় কলঙ্কগুলোর একটি।’

আনসারুল্লাহর শীর্ষ নেতা বলেন, বর্তমান আরব ও ইসলামি বিশ্বে সৌদি শাসকগোষ্ঠী কঠোর আগ্রাসনের অন্যতম প্রধান উদাহরণ। তার প্রশ্ন, ‘সৌদি আরব কখন আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অবস্থানও নিয়েছে?’

আল-হুথি অভিযোগ করেন, সৌদি হামলায় ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ, শিশু, নারী, শিক্ষার্থী, মসজিদ ও বাজারও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি শত্রুরা নতুন করে হামলা জোরদার করার পর আবারও শিক্ষার্থী, শিশু ও নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

তিনি বিশেষভাবে দাহইয়ানে শিশুদের বহনকারী একটি বাসে হামলার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বাসে থাকা ব্যক্তিদের সৌদি পক্ষ 'সামরিক বিশেষজ্ঞ' বলে দাবি করেছিল। পরে জানা যায়, তারা ছিল অল্পবয়সী শিক্ষার্থী।

আল-হুথি বলেন, সৌদি হামলার অনেক ঘটনা রয়েছে, যার মধ্যে সানার আল-রুয়াইশান পরিবারের জানাজার অনুষ্ঠানে হামলাও রয়েছে। তার দাবি, জানাজার হলে জড়ো হওয়া বিপুল মানুষের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল এবং যত বেশি সম্ভব মানুষকে হত্যা করাই ছিল হামলাকারীদের লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের হামলায় জানাজা ও বিয়ের অনুষ্ঠানও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। হাজ্জাহ প্রদেশে আলী আদলির পরিবারের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ওই হামলায় একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

‘আমেরিকা ও ব্রিটেনের ওপর নির্ভর করে সৌদি আরব’

আনসারুল্লাহ নেতা বলেন, সৌদি আরব হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ব্রিটেনের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, আমেরিকার অংশগ্রহণে সৌদি শাসকগোষ্ঠী ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সৌদি আগ্রাসনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ইয়েমেনের জনগণের মনোবল ভেঙে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। তবে তার ভাষায়, এটি ‘একটি মরীচিকা’।

আল-হুথি বলেন, আগ্রাসন শুরুর সময়ের তুলনায় ইয়েমেনের জনগণের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন আরও শক্তিশালী ও কার্যকর এবং নিজেদের অধিকার ও ন্যায্যতার বিষয়ে তাদের বিশ্বাসও আরও দৃঢ় হয়েছে।

কাতারকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান

বক্তব্যে কাতারের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন আল-হুথি। তিনি কাতারকে সৌদি আরবের সঙ্গে তার অতীত অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ২০১৫ সালে কাতার ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনে সামরিকভাবেও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু পরে সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং দেশটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রচারণা চালিয়ে তাকে অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে।

তিনি বলেন, সৌদি আরব কাতারের ওপর সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালায়। উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আমেরিকাকে কাতারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগও তোলা হয়। এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও কাতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যারা ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আগ্রাসনকে সমর্থন করছে, তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

আল-হুথি অভিযোগ করেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী বাহরাইনের আল খলিফা পরিবারের মতো কাতারেও সরকার পরিবর্তনের আশা করছে। কাতারের প্রতি ‘ভ্রাতৃসুলভ’ পরামর্শ দিয়ে আল-হুথি তাদের হিসাব-নিকাশ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

'আমাদের জনগণ অপমান ও দাসত্ব মেনে নেবে না’

আব্দুল মালিক আল-হুথি বলেন, ইয়েমেনের জনগণ কোনো সাময়িক বা আকস্মিক সত্তা নয়; তারা একটি ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী, যাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তারা অপমান ও দাসত্ব মেনে নেবে না।

তিনি বলেন, পবিত্র স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় ইয়েমেনের জনগণ সামনের সারিতে থাকার জন্য প্রস্তুত।

আল-হুথির ভাষায়, ‘আমাদের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না।’ তিনি দাবি করেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী ইয়েমেনের জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না এবং বর্তমানে তারা আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ওমর আল-বশিরের উদাহরণ

নিজের অবস্থান পরিবর্তনের পর ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায় অবস্থান নেওয়ার জন্য সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের উদাহরণ তুলে ধরেন আল-হুথি। তিনি বলেন, ইয়েমেন ও সুদানের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আল-বশির স্বার্থের কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে যোগ দেন এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আগ্রাসনে অংশ নেন। তিনি সুদানের সেনাবাহিনী এবং জানজাভিদ বাহিনীকে ইয়েমেনে পাঠান। আল-হুথির দাবি, তারা কোনো অধিকার ছাড়াই ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ অপরাধ করেছে।

তিনি প্রশ্ন করেন, এর ফল কী হয়েছিল?

আল-হুথি বলেন, অর্থনৈতিক লাভের আশা শেষ পর্যন্ত মরীচিকায় পরিণত হয়, আর এর বিপরীতে আসে ‘ঐশী শাস্তি’।

তিনি বলেন, সুদানে যা ঘটছে তা তাদের জন্য দুঃখজনক। তবে আল-বশিরের হিসাব-নিকাশ ব্যর্থ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সবাই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

‘ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানো উচিত’

আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, ইসলামি অঙ্গনে ভূমিকা রাখতে চায়—এমন প্রতিটি দেশ, সরকার, সেনাবাহিনী ও সংগঠনের উচিত নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানো। কারণ ফিলিস্তিনের বিষয়টি স্পষ্ট এবং এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

আল-হুথি বলেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণ নিপীড়িত। তাদের দাবি ন্যায়সংগত এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের সমর্থন করা উম্মাহর দায়িত্ব।’

তিনি প্রশ্ন করেন, সৌদি আরবের কীসের অভাব—অর্থ, নাকি সামরিক সক্ষমতা? তার মতে, সৌদি আরবের বিপুল অর্থ ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরায়েলের অংশীদার। তাই সৌদি আরবের কারও সহায়তার প্রয়োজন নেই। বরং যারা তাদের পাশে দাঁড়াবে, তারাই পাপ ও আগ্রাসনের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলবে।

আল-হুথি বলেন, কিছু পক্ষ ইসলামি নীতি ও আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে সরে গিয়ে অর্থের প্রলোভনে পরিচালিত হচ্ছে। অর্থ পাওয়ার জন্য নিপীড়কদের সঙ্গে যোগ দেওয়া এবং নিপীড়িতদের ওপর আগ্রাসনে অংশ নেওয়া একটি শয়তানি প্ররোচনা। এটি ধর্ম ও দুনিয়া—দুই ক্ষেত্রেই স্বার্থের বিনিময়ে নীতি বিক্রি করার মতো।

বাব আল-মান্দাব নিয়ে নতুন অভিযোগ

বক্তব্যের শেষদিকে আল-হুথি অভিযোগ করেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী লাহিজ প্রদেশের উপকণ্ঠ থেকে বাব আল-মান্দাবের দিকে হামলা চালানোর জন্য একটি নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। একই সঙ্গে তারা একটি ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি, যেখানে কিছু গণমাধ্যমও জড়িয়ে পড়েছে।#

পার্সটুডে/এমএআর/৮