আল-আকসা তুফানের ধাক্কায় ইসরায়েলের ভিত কেঁপে উঠেছে: আল-হুথি
-
আবদুল মালিক আল-হুথি
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আল-আকসা তুফান অভিযানকে ফিলিস্তিনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, আকস্মিক এই হামলা ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক ধাক্কা সৃষ্টি করেছে এবং এর মৌলিক দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে।
গতকাল (বুধবার) সন্ধ্যায় আল-আকসা তুফান অভিযানের তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে আল-হুথি বলেন, আকস্মিক এই অভিযান ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের কয়েক দশকের সংগ্রামে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে।
আল-হুথি বলেন, “দখলকৃত ভূখণ্ডে বর্তমানে যে উদ্বেগ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আল-আকসা তুফান অভিযানের গভীর ও অনস্বীকার্য প্রভাবের সরাসরি ফল।”
তিনি বলেন, এই অভিযান মুসলিম দেশগুলোর সামনে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি তাদের মানবিক, নৈতিক ও নিরাপত্তাগত দায়িত্ব পালনের একটি সুযোগও তৈরি করেছিল।
আল-হুথির ভাষায়, “আল-আকসা তুফানের পর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কিছু পশ্চিমা দেশ জায়নবাদীদের সহায়তায় দ্রুত এগিয়ে এলেও মুসলিম দেশগুলো নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জাতিকে সমর্থন করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি বলেন, অভিযানটির পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় চলে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলকে সব ধরনের সহায়তা দেয় এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
আনসারুল্লাহ নেতা আরও বলেন, ইয়েমেনের সর্বস্তরের জনগণ—সরকারি ও জনগণ উভয় পর্যায়েই—ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের পাশে রয়েছে।
তাঁর দাবি, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান, লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ, ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এবং ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ ছাড়া আর কেউ ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি।
আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, ইসরাইলের অপরাধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত। তাঁর দাবি, গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে চলমান ইসরাইলি নৃশংসতার জন্য ওয়াশিংটন দায়ী; কারণ যুক্তরাষ্ট্র গোটা অঞ্চলে থাকা তার অস্ত্রভাণ্ডার ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং তেল আবিবকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে।
গাজায় ইসরাইলি নৃশংসতার ভয়াবহতার কথাও তুলে ধরেন আল-হুথি। তিনি বলেন, মার্কিন নির্মিত বোমা ব্যবহার করে গাজার আবাসিক এলাকাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যার জন্য স্নাইপার এবং নির্বিচার বোমাবর্ষণও ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গাজায় ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারেরও তীব্র নিন্দা জানান আল-হুথি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় ফিলিস্তিনিরা এখনো অনাহারে রয়েছে। খাদ্য সরবরাহ ভয়াবহভাবে কমে গেছে এবং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় গুঁড়া দুধও ফুরিয়ে আসছে।
আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, “এ ধরনের বর্বর আচরণের কিছু দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পুরো বিশ্বকে হতবাক করেছে। এত ভয়াবহ নৃশংসতার পরও মুসলমানরা যথাযথভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
ইসরাইলি বাহিনীর ভয়াবহ সামরিক শক্তির মুখেও ফিলিস্তিনি জনগণের অসাধারণ দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের প্রশংসা করেন আনসারুল্লাহ নেতা। তিনি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি সবচেয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্রে সজ্জিত ইসরাইলি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মুখেও ফিলিস্তিনিরা দৃঢ়ভাবে টিকে রয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর বিষয়ে সৌদি আরবের অবস্থানেরও তীব্র সমালোচনা করেন আল-হুথি। তিনি বলেন, গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে সৌদি আরবের বিশ্বাসঘাতক চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
আল-হুথি আরও অভিযোগ করেন, ওমানের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের বিপরীতে সৌদি আরব ইসরাইলি বিমানের জন্য নিজেদের আকাশসীমা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ সর্বাত্মক চেষ্টা করছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ইসরাইলি আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের আত্মত্যাগের কথাও তুলে ধরেন আল-হুথি। তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান জায়নবাদী নিপীড়নের মোকাবিলায় বড় ধরনের আত্মত্যাগ করেছে।
আল-হুথি বলেন, এসব আত্মত্যাগের মধ্যে ইসলামী বিপ্লবের নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির আত্মত্যাগও রয়েছে।
সবশেষে ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারকে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন আনসারুল্লাহ নেতা। তাঁর মতে, ইরাকি জনগণের মার্কিন আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম ফল ছিল ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার।#
পার্সটুডে/এমএআর/৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।