বিশ্লেষণ | ইসরায়েলে ৩ হাজার মার্কিন সেনা: প্রতিরক্ষা নাকি ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রস্তুতি?
-
মার্কিন সেনাসদস্যরা
পার্সটুডি- ইসরায়েলি একটি গণমাধ্যম দেশটির নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বর্তমানে অধিকৃত ফিলিস্তিনে প্রায় ৩ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য অবস্থান করছে।
পার্সটুডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়ালা’ জানিয়েছে, বর্তমানে অধিকৃত ফিলিস্তিনে প্রায় ৩ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে সেখানে আরও মার্কিন সেনা ও সামরিক বিমান মোতায়েনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ালা। তবে অতিরিক্ত কত সেনা বা বিমান পাঠানো হবে কিংবা কখন তারা সেখানে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ওয়ালার প্রতিবেদন এবং আনাদোলু ও জেরুজালেম পোস্ট-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনে মোতায়েন মার্কিন সেনারা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা, ফ্লাইট ক্রু, সহায়তা, লজিস্টিকস এবং কমান্ড সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালনের মতো বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সেনাকে কোনো আনুষ্ঠানিক ও ঘোষিত সামরিক ঘাঁটির আওতায় মোতায়েন করা হয়নি; বরং ‘নিয়মিত রোটেশন’-এর আড়ালে ধীরে ধীরে অধিকৃত ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও সেনা ও সামরিক বিমান পাঠানো হবে এবং এই পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
মনে হচ্ছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনে প্রায় ৩ হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতিকে শুধু একটি সংখ্যা বা নিয়মিত সেনা রোটেশন হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অধিকৃত ফিলিস্তিনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রাক্কালে এই মোতায়েন একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রভাব ইসরায়েলি সরকারের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এই মোতায়েনের মূল কারণ দুটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়।
সামরিক দিক
সামরিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা স্পষ্ট। ৪০ দিনব্যাপী যুদ্ধের সময় অধিকৃত ফিলিস্তিনে এফ-২২ যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের পদক্ষেপ- যা দুই পক্ষের সম্পর্কের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে- একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এসব যুদ্ধবিমান শুধু ইসরায়েলি সরকারকে প্রতিরক্ষা দেওয়ার জন্য নয়, ইরানের ওপর হামলার পরিস্থিতিতে আক্রমণাত্মক মিশন পরিচালনার জন্যও প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একই সময়ে একাধিক বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি এবং মেরিন বাহিনীর ব্রিগেডগুলোকে অঞ্চলে পাঠানোর ফলে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির একটি চিত্র ফুটে উঠেছে।
তবে বিষয়টি শুধু সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা এবং ‘পরিস্থিতির অবনতি’ বা উত্তেজনা বৃদ্ধির বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তাদের সামরিক কার্যক্রম আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করছে।
রাজনৈতিক দিক
এই মোতায়েনের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সামরিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
ইসরায়েলি সরকারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ালাকে বলেছেন, ইসরায়েলের শত্রুরা এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব নির্বাচনে কীভাবে প্রভাব ফেলা যায় তা মূল্যায়ন করছে- যেসব পদক্ষেপ ‘বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি না করেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে’।
এই বক্তব্যের ফলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময়ে নির্বাচনী প্রতিরোধ ও সংকট ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সম্ভাব্য পরিণতি
এই পরিস্থিতির প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, ইরান একটি নতুন সমীকরণের মুখোমুখি হচ্ছে। অধিকৃত ফিলিস্তিনে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির কারণে তেহরানের যেকোনো পাল্টা পদক্ষেপ সরাসরি মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং তাদের হতাহতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
একই সঙ্গে এই মোতায়েন কার্যত অধিকৃত ফিলিস্তিনকে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর একটি অংশে পরিণত করেছে। ইসরায়েলি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর ‘কার্যত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে’ এবং বছরের শেষ পর্যন্ত সেখানে কয়েক ডজন মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান অবস্থান করবে।
বেসামরিক অবকাঠামোর এই সামরিকীকরণ ইসরায়েলি সরকারের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, এই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় চাপ সৃষ্টির একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে। ওয়ালার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইরানিরা ‘যুক্তরাষ্ট্র হামলার জন্য কতটা প্রস্তুত, তা মূল্যায়ন করছে এবং সেই হিসাবের ভিত্তিতেই আলোচনা করছে’।
অতএব, অধিকৃত ফিলিস্তিনে ৩ হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতি শুধু একটি সামরিক বাস্তবতা নয়; এটি এমন একটি চাপ সৃষ্টির কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য আলোচনার টেবিলে ইরানকে তার অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করা।
মনে হচ্ছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনে মার্কিন সেনা মোতায়েন একটি পরিচিত কৌশলগত ধাঁচের অংশ- কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগেই একটি সামরিক বাস্তবতা তৈরি করা, যাতে কূটনীতি ব্যর্থ হলে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর বিকল্প প্রস্তুত থাকে।
কিন্তু এই উপস্থিতি একই সঙ্গে একটি ‘নিরাপত্তা ফাঁদ’-এর ঝুঁকিও তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি ছোট ঘটনা—ভুলবশত গুলি ছোড়া, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো ভুল বোঝাবুঝি—খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ব্যাপক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সুতরাং বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ৩ হাজার মার্কিন সেনার মোতায়েন বাইরে থেকে যতই একটি নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে দেখা হোক না কেন, বাস্তবে এটি অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে উত্তেজনা ও সংঘাত উসকে দেওয়ার একটি উপাদান হয়ে উঠতে পারে।#
পার্সটুডে/এমআরএইচ/৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।