পশ্চিমবঙ্গের দুই সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত আসনে বিজেপির বড় জয়, ভোট লুটের অভিযোগ
-
বিজেপি-কে ভোট দেওয়ায় মুসলিম ভোটারদের ধন্যবাদ জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুটি আসনের উপনির্বাচনেই বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
আজ (শুক্রবার) ঘোষিত ফলাফলে নন্দীগ্রামে বিজেপির হাসি রানী রথ এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে শাখারভ সরকার জয়ী হয়েছেন। তবে এই ফলাফল ঘিরে ভোট লুট ও বিরোধীদের প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দলগুলো। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছেন ভোটাররা।
দুটি আসনেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম ভোটার রয়েছেন। রেজিনগরে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৭৪ শতাংশ এবং নন্দীগ্রামে প্রায় ৩০ শতাংশ বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, উপনির্বাচন-সংক্রান্ত আরেকটি প্রতিবেদনে রেজিনগরে সংখ্যালঘু ভোটারের হার প্রায় ৭০ শতাংশ এবং নন্দীগ্রামে মুসলিম ভোটারের হার ২৭ শতাংশ বলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির নেতারা দাবি করেছেন, দুই আসনেই মুসলিম ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁদের দলকে সমর্থন করেছেন।
নন্দীগ্রামে রেকর্ড ব্যবধানে জয়
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম আসনে বিজেপির হাসি রানী রথ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের মিলন প্রধান পেয়েছে ৪১ হাজার ৬৭৪ ভোট। বিজেপি প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি ভোট।
এ আসনে কংগ্রেস দ্বিতীয়, বামফ্রন্ট তৃতীয় এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) চতুর্থ স্থানে রয়েছে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস।
এর আগে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৩০১ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের পবিত্র কর পেয়েছিলেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৩৬ ভোট। অর্থাৎ, মাত্র ৯ হাজার ৬৬৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু। উপনির্বাচনে বিজেপির প্রার্থীর বিপুল ব্যবধানের জয় আগের ফলাফলের তুলনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রেজিনগরেও বিজেপির বড় জয়
মুর্শিদাবাদ জেলার মুসলিম-অধ্যুষিত রেজিনগর আসনেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে বিজেপি। দলটির প্রার্থী শাখারভ সরকার ৭৫ হাজার ৭৯১ ভোট পেয়েছেন বলে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ, যিনি দলটির নেতা হুমায়ুন কবীরের ছেলে। তিনি ৫৪ হাজার ৯৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।
এ আসনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি দ্বিতীয়, কংগ্রেস তৃতীয়, তৃণমূল কংগ্রেস চতুর্থ, বামফ্রন্ট পঞ্চম এবং গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস ষষ্ঠ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রেজিনগরে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর পেয়েছিলেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৬ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির বাপন ঘোষ পেয়েছিলেন ৬৪ হাজার ৬৬০ ভোট। অর্থাৎ, তখন বিজেপি প্রার্থী ৫৮ হাজার ৮৭৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। সেই আসনেই উপনির্বাচনে বিজেপির জয়কে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবি বিজেপির
উপনির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি আগে মুসলিম ভোটারদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফল ঘোষণার পর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের সংখ্যালঘু ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে ৮০ শতাংশ মুসলিম ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করেছেন এবং রেজিনগরে এই হার ৬০ শতাংশের বেশি।
রাজ্য সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, মুসলিমরা সরকারের পাশে থাকতে চাওয়ায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, মুসলিমদের মধ্যে আটককেন্দ্রে পাঠানো এবং ধর্মাচরণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা ছড়ানো হয়েছিল, কিন্তু গত পাঁচ মাসে এসব আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
ভবিষ্যতেও বাংলাভাষী মুসলিমরা বিজেপিকে সমর্থন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন আগের সরকারগুলোর আমলেও বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি অংশ ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করেছেন। আগামী দিনের নির্বাচন, এমনকি রাজ্যের পুরসভা নির্বাচনেও বিজেপি মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভোট লুট ও প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ
উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিরোধী দলগুলো অনিয়ম ও ভোট লুটের অভিযোগ তুলেছে। তাদের আশঙ্কা ছিল, বিজেপি ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হতে পারে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আইএসএফ, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি ও বামপন্থী দলগুলোও নির্বাচনের আগে ভোট লুটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল।
নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। কলকাতা হাইকোর্টের শর্তসাপেক্ষ জামিন পাওয়ার পর তিনি মাত্র চার দিন প্রচার চালানোর সুযোগ পান। রেজিনগরেও বিরোধী প্রার্থীরা অবাধে প্রচার চালাতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন।
কেন উপনির্বাচন হলো?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুটি আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরে তিনি ভবানীপুর আসনটি ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। ফলে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে, আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর নওদা ও রেজিনগর—দুটি আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে তিনি রেজিনগরের বিধায়ক পদ ছেড়ে দেওয়ায় ওই আসনেও উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।#
পার্সটুডে/এমএআর/৯