মেয়াদ শেষের পথে গঙ্গা চুক্তি
গঙ্গা চুক্তি নিয়ে নতুন অবস্থান ভারতের: আলোচনা হবে যৌথ নদী কমিশনেই
-
রণধীর জয়সোয়াল
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনা বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অর্থাৎ যৌথ নদী কমিশনের আওতাতেই পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত পাক্ষিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত পানিসম্পদ ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল। তিনি বলেন, নদী ও পানিসম্পদ সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় যৌথ নদী কমিশনের আওতায় নির্ধারিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উভয় পক্ষের বিষয়গুলো সেখানেই কারিগরি পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে।
চুক্তির প্রেক্ষাপট
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফারাক্কা ব্যারেজের উজানে পানি প্রত্যাহার নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি হয়েছিল। এতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির একটি নির্দিষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে।
জেআরসির আলোচনা
নবায়ন নিয়ে দুই দেশ ইতিমধ্যে যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোর মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। চলতি বছর মে মাসে কলকাতায় জেআরসির বৈঠকে ২০২৬ সালের পর নতুন চুক্তির কাঠামো, পানির প্রবাহের তথ্য, কারিগরি বিষয় ও অন্যান্য অভিন্ন নদী নিয়ে আলোচনা হয়। একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরেই চুক্তি করার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে উভয় পক্ষ।
বাণিজ্য বৈঠক
এদিকে প্রায় তিন বছরের বিরতির পর নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সংক্রান্ত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক। যুগ্ম সচিব পর্যায়ের এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এজেন্ডা, বিদ্যমান বাণিজ্য বাধা নিরসন এবং সীমান্ত বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় সচল হওয়াকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
নতুন চুক্তির দাবি
বুধবার (৭ অক্টোবর) পলাশী চত্বরে শহীদ আবরার ফাহাদের ৭ম শাহাদাতবার্ষিকীর স্মরণসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গঙ্গা চুক্তি শুধু নবায়ন করলে হবে না, নতুন করে চুক্তি করতে হবে। তাঁর দাবি, এতে গ্যারান্টি ক্লজসহ বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে এবং তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে সমান অংশীদার করতে হবে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার কথা থাকলেও গত ৫০ বছরেও বাংলাদেশ তা পায়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার দেশ। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি নবায়ন না হলে রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চলের কৃষি, গড়াই নদীর প্রবাহ এবং সুন্দরবনসহ পরিবেশ চাপের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের পানির চাহিদাও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চুক্তিতে নদীর প্রবাহ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও তথ্য আদান-প্রদানের মতো বিষয় যুক্ত হতে পারে। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে এই চুক্তি দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য রাজনৈতিক পর্যায়ের সিদ্ধান্তই নির্ণায়ক।#
পার্সটুডে/এমএআর/৯