তৃণমূল শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের তৎপরতা বৃদ্ধি, উদ্বিগ্ন সিপিআই(এম)
-
পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল শাসনামলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিআই(এম)। রাজ্যে আরএসএসের বৃদ্ধিসহ ‘গরু গণনা’ এবং ‘গরু পুজো’র আয়োজনকে মোটেও ভালো চোখে দেখছে না সংগঠনটি।
গণমাধ্যমে আরএসএসের তৎপরতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ,পশ্চিমবঙ্গের ২০১১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গে সংগঠনটির মোট শাখা ছিল ৫৮০ টির মতো। এখন দক্ষিণবঙ্গেই কমপক্ষে ১২৫০ টি শাখা রয়েছে। গত পাঁচ বছরে উত্তরবঙ্গে প্রায় ৪৫০ টি শাখা সক্রিয় হয়েছে। এ ছাড়া ‘সাপ্তাহিক মিলন’ গড়ে উঠেছে প্রায় ৯০০ টি। মাসিক বৈঠক (সঙ্ঘমণ্ডলী) গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০০০ টি।
গণমাধ্যমে প্রকাশ, আরএসএসের ‘প্রাথমিক পাঠ’ শিবির চলছে পশ্চিমবঙ্গের উলুবেড়িয়ার তাঁতিবেড়িয়ায়। সাতদিনের ‘প্রাথমিক পাঠ’ শিবিরের পর আগামী ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় শিবির চলবে। প্রত্যেক দিন গড়ে প্রতিটি জেলা থেকে ৩ থেকে ৫ জন অনলাইনে আরএসএসের সদস্য হওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন।
আরএসএসের ‘সাপ্তাহিক মিলন’-এ তৃণমূলের কাউন্সিলর যোগ দিচ্ছেন এমন খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। বীরভূম এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলার চারটি পৌরসভায় আরএসএস সাফল্য পেয়েছে। রাজ্যের শাসক দলের ৫৩ বিধায়কের মধ্যে তারা হিন্দুত্বর প্রতি সহানুভূতি, দরদ খুঁজে পেয়েছে। একটি সূত্রে প্রকাশ, এসব বিধায়কের এলাকায় তাদের কাজ নাকি ভালোভাবেই এগোচ্ছে।
সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ, রাজ্যে ক্রমাগত বেড়ে চলা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নরম মনোভাব নিয়েছেন।
দলটির পক্ষ থেকে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাস থেকে রাজ্যে ‘গরু জরিপ’ শুরু করেছিল আরএসএস। এ প্রসঙ্গে গত ২১ জুলাই কোলকাতার ধর্মতলায় এক সমাবেশ মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আমি শুনছি কোনো কোনো সংগঠন বাড়ি বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞাসা করছে বাড়িতে ক’টা গরু আছে? তুমি কে হে! গরুর হিসাব নেয়ার? ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। ওদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে লড়াই করব আমরা।’
সিপিআইএমের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী সেই রাজনৈতিক লড়াই করেননি। তার দলের নেতা-কর্মীরা রাজ্যে নিশ্চুপ হয়ে থাকায় প্রায় বিনা বাধায় রাজ্যে সাড়ে ৫ লাখ গরু গণনা করেছে আরএসএসের ‘কাউ ডেভেলপমেন্ট সেল’। আরএসএস নেতা, বিজেপি কর্মী তথা ‘কাউ ডেভেলপমেন্ট সেল’-এর সভাপতি সুব্রত গুপ্তের মতে, যা থাকা উচিত তার থেকে ৫৩ হাজারের বেশি গরু কম আছে রাজ্যে।
তিনি বলেছেন, ‘গরুর পুজো হবে। গরু কেন আমাদের ধর্মে এবং সমাজে গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরা হবে।’ কোলকাতার যাদবপুর থেকে গরু পুজো শুরু হবে। গরু গণনা শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের নারায়ণগড়ের বেলদা ১ নং পঞ্চায়েতের পাতলী গ্রামে।
আগামী কালীপূজোর দিন ‘গো-পূজন’ শুরু হবে। তারপর রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় তা করা হবে। ‘গো-পূজন’ কর্মসূচিতে ‘কাউ ডেভেলপমেন্ট সেল’-এর পাশাপাশি বিজেপি, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ আয়োজকদের পাশে থাকবে।
রাজ্যে হিন্দুত্ববাদীদের এ ধরণের তৎপরতা প্রসঙ্গে সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘রাজনৈতিক হিংসার মনোভাব থেকেই এ ধরনের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের ফলে মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে, কাজের অভাবে মানুষ বিপর্যস্ত হচ্ছে। এ সময়ে মানুষের দুর্দশা ঘোচানোর ব্যর্থতা আড়াল করতে, মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে এ ধরনের কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে।’ ‘রাজ্যের মাটি এমন রাজনীতিকে কখনো মেনে নেয়নি’ বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
এ সব ঘটনার সূত্র ধরে পশ্চিমবঙ্গের সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক ও রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্র গতকাল (সোমবার) কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এ রাজ্যে শিল্প নেই, কর্মসংস্থান নেই, নারীদের নিরাপত্তাও নেই। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় আক্রমণ নামিয়ে আনছে মানুষের ওপর। প্রকৃত সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে মুখ্যমন্ত্রী পুজো উদ্বোধন করছেন আর প্রতিমা নিয়ে প্যারেড করাচ্ছেন।’ প্রকৃত সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী দু’জনেই চরম দক্ষিণপন্থার তাস খেলছেন বলেও সূর্যকান্ত মিশ্র অভিযোগ করেছেন।#
পার্সটুডে/এমএএইচ/এআর/১৮