অপরাধের ছায়ায় ভারতের বিধানসভা
পশ্চিমবঙ্গের ৫৮ শতাংশ বিধায়কের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক নবনির্বাচিত বিধায়কের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। সদ্য প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের (এডিআর) রিপোর্টে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু তা-ই নয়, বিধায়কদের (সংসদ সদস্য) সম্পত্তির পরিমাণও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এডিআরের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্লেষণ করা ২৯২ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ, অর্থাৎ ১৭০ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধমূলক মামলা বিচারাধীন। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১৩। সব মিলিয়ে ১৯০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে, যা মোটের প্রায় ৬৫ শতাংশ।
এডিআর জানিয়েছে, গুরুতর ফৌজদারি মামলা বলতে এমন অপরাধ বোঝানো হয়েছে, যার সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর বা তার বেশি, অথবা যেগুলো অজামিনযোগ্য। এর মধ্যে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, দুর্নীতি এবং সরকারি তহবিল সংক্রান্ত অপরাধ।
রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ১৪ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রয়েছে। ৫৪ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নারী সংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত বিধায়কের সংখ্যা ৬৩। এদের মধ্যে দু’জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।
২০২৬ সালের দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপির ২০৬ জন বিধায়কের মধ্যে ১৪১ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা রয়েছে, যা প্রায় ৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ২৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩১ শতাংশের বিরুদ্ধে এমন মামলা রয়েছে।
এডিআর আরো জানিয়েছে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী), অল ইন্ডিয়া সেকুলার ফ্রন্ট এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সব জয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধেই গুরুতর মামলা রয়েছে। তবে কংগ্রেসের দুই জয়ী বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক মামলা নেই।
অপরাধমূলক মামলার পাশাপাশি বিধায়কদের সম্পত্তির পরিমাণও নজর কেড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৯২ জনের মধ্যে ১৭৮ জন বিধায়কের সম্পত্তির পরিমাণ এক কোটির বেশি। বর্তমানে সব বিধায়কের মোট ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ ১ হাজার ৯১ কোটি টাকা। গড় সম্পত্তির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৭ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালে ছিল ২ দশমিক ৫ কোটি।
দল অনুযায়ী সম্পত্তির গড় হিসাবেও পার্থক্য দেখা গেছে। তৃণমূল বিধায়কদের গড় সম্পত্তি ৫ দশমিক ৩ কোটি টাকা, বিজেপির ক্ষেত্রে তা ২ দশমিক ৯ কোটি। অন্যদিকে কংগ্রেসের দুই বিধায়কের গড় সম্পত্তি সবচেয়ে বেশি ১৭ দশমিক ৯ কোটি টাকা।
রিপোর্টে বিজেপি নেতা দিলিপ সাহার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ সম্পত্তির ঘোষণা করেছেন, যার পরিমাণ ৪৩ কোটিরও বেশি। এছাড়া, টিএমসির জাকির হোসেনের সম্পত্তির পরিমাণ ১৩৩ কোটিরও বেশি বলে অন্য রিপোর্টে উঠে এসেছে।
পুনর্নির্বাচিত ১০২ জন বিধায়কের সম্পত্তির হিসাব বিশ্লেষণ করে এডিআর জানিয়েছে, তাদের গড় সম্পত্তি ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে গড় সম্পত্তি ছিল ২ দশমিক ৩ কোটি টাকা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ কোটি টাকায়।
নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছবি উঠে আসেনি। ২৯২ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৩৭ জন মহিলা, যা মোটের মাত্র ১৩ শতাংশ। আগের বিধানসভায় এই হার ছিল ১৪ শতাংশ।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও নানা চিত্র উঠে এসেছে। এডিআর জানিয়েছে, ৬৩ শতাংশ বিধায়কের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা তার বেশি। ৩২ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে। এছাড়া একজন বিধায়ক নিজেকে নিরক্ষর বলে ঘোষণা করেছেন।
এডিআরের এই রিপোর্ট রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে যেমন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বিধায়কদের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনই দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের সম্পত্তির পরিমাণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় আরো কড়াকড়ি আনা এবং অপরাধমূলক পটভূমি থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে ভোটারদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।#
পার্সটুডে/জিএআর/ ৭