পার্সটুডে'র সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাতকার জাপানি বিশেষজ্ঞ
'যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দৃষ্টিতে আইন কেবল সরলমনা ও পরাজিতদের জন্য প্রযোজ্য'
-
সাওল তাকাহাশি
পার্সটুডে- একজন জাপানি বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেলআবিব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করার নিয়মগুলো ধ্বংস করতে চায়।
জাপানি মানবাধিকার আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তরের সাবেক উপপ্রধান সাওল তাকাহাশি পার্সটুডের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রভাব বিশ্লেষণ করে বলেছেন, এই হামলাগুলো শুধু সামরিক আগ্রাসনই নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার গভীর ভাঙন এবং জাতিসংঘের দুর্বলতারও ইঙ্গিত।
সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো:
পার্সটুডে – ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মাত্রা ও প্রকৃতি কতটা জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের কাঠামোগত ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়? আমরা কি বলপ্রয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থেকে স্থায়ীভাবে এমন এক যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে রাষ্ট্রগুলো যা ইচ্ছে তাই করার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে?
তাকাহাশি- আমরা যা দেখছি, তা হলো আন্তর্জাতিক আইন-শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া; আর এর বড় অংশের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই দেশগুলো “জঙ্গলের আইন”-এ ফিরে যেতে চায়; যেখানে শক্তিশালীরা যা খুশি করতে পারে আর দুর্বলদের ভোগান্তি ছাড়া উপায় থাকে না। এই প্রবণতার মূল লক্ষ্য হলো বলপ্রয়োগের ওপর থেকে সব ধরনের সীমাবদ্ধতা সরিয়ে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করে তারা যেকোনো দেশে হামলা চালানোর অধিকার রাখে এবং এই পথে যেকোনো আন্তর্জাতিক অপরাধ এমনকি গণহত্যাও করতে পারে।
পার্সটুডে – গত ৪ মার্চ ইরানের নিরস্ত্র জাহাজ দেনা-কে মার্কিন বাহিনী ডুবিয়ে দেয়। আপনার মতে, বর্তমান নৌ অবরোধ এবং বেসামরিক জাহাজকে টার্গেট করা কি অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক শক্তির এমন সমন্বয়কে নির্দেশ করে, যা বিদ্যমান সামুদ্রিক ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত করা কঠিন?
তাকাহাশি – আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি বেসামরিক জাহাজে হামলা করা যুদ্ধাপরাধ—এটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার। সমস্যা হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আইন প্রয়োগের বাস্তব ব্যবস্থা নেই। যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়, তখন তাদের থামানোর মতো কার্যকর কোনো কাঠামো নেই। একমাত্র প্রতিষ্ঠান হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, যা স্পষ্টতই তার পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রভাবাধীন।
পার্স টুডে – এই যুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের ব্যাপক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, এসব কর্মকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও অন্যান্য সংস্থাগুলো এ ক্ষেত্রে নীরব রয়েছে, এটা কেন?
তাকাহাশি – এখানে আবারও বিস্ময়কর দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যাচ্ছে। আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও তা বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তা পরিষদই একমাত্র সংস্থা, যা বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারে, কিন্তু সেটি এখন পুরোপুরি অবিশ্বাসযোগ্য: গাজায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্পের গাজা দখল ও শোষণের পরিকল্পনাকে সমর্থন দেওয়ার চাপেও পড়েছিল। ইরানের বিরুদ্ধে স্পষ্টতই অবৈধ যুদ্ধের ক্ষেত্রেও পরিষদ কেবল হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের ব্যাপারে নীরব থেকেছে। এই মাত্রার ভণ্ডামির কারণে নিরাপত্তা পরিষদ—এমনকি জাতিসংঘও—টিকে থাকতে পারবে কিনা তা সন্দেহজনক।
পার্সটুডে – ইরানের মিনাবের একটি স্কুলে হামলা এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছৈ, যার মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিতে একটি সক্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা কীভাবে বিবেচিত হয়? নির্ভুল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্রের যুগে ভুল করে হামলার অজুহাত কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
তাকাহাশি – স্কুল চলাকালীন সময়ে একটি স্কুলে হামলা সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, ওই স্কুলটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল; এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এমন দাবি করেনি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধের নিয়ম উপেক্ষা করছে। তাদের মানসিকতা হলো: আমরা যা চাই তাই করব, আইন কেবল সরল ও দুর্বলদের জন্য। আমার মনে হয় না যুক্তরাষ্ট্র এখন তার কাজের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে।#
পার্সটুডে/এসএ/২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন