শাহেদ ১৪৯ (গাজা): ইরানের দূরপাল্লার ড্রোন সক্ষমতার এক নতুন ধাপ
-
শাহেদ ১৪৯ (গাজা) ড্রোন
চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন ডিজাইন, উন্নয়ন, নির্মাণ এবং তা সফলভাবে পরিচালনার দ্রুত অগ্রগতির কারণে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বড় শক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
২০২১ সালের ২১ মে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর বিমান বাহিনী তাদের নতুন ড্রোন 'গাজা'র উন্মোচন করে। এটি প্রমাণ করে যে, ড্রোন উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইরানের একটি কৌশলগত এবং দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ওই বছরেই গাজা ড্রোনের প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা সম্পন্ন করে ২০২২ সালে একে আইআরজিসির বিমান বাহিনীর ড্রোন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এক নজরে 'গাজা' ড্রোন
২০২০ সালে প্রথমবার 'শাহেদ ১৪৯' নামের একটি ড্রোনের অস্তিত্বের কথা জানা যায়, যা তৎকালীন অন্যান্য ড্রোনের চেয়ে আকারে অনেক বড় এবং এটি একটি 'টার্বোপ্রপ' (Turboprop) ইঞ্জিনচালিত ড্রোন। পরবর্তীতে আইআরজিসির স্থলবাহিনীর ড্রোন ইউনিটের তৎকালীন কমান্ডারের এক সাক্ষাৎকারে এই ড্রোনের কথা উল্লেখ করা হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন যে, এর কার্যক্ষমতা আমেরিকার তৈরি বিখ্যাত এমকি-৯ রিপার (MQ-9 Reaper) ড্রোনের কাছাকাছি।
এর আগে আইআরজিসির তৎকালীন প্রধান কমান্ডার হোসেন সালামিও একটি দূরপাল্লার ড্রোনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা অনেকেই শাহেদ ১২৯-এর একটি ব্যাপক উন্নত সংস্করণ বলে মনে করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে যে, 'গাজা' ড্রোনটিই ছিল প্রধান কমান্ডারের ইঙ্গিত করা সেই ড্রোন; কারণ শাহেদ ১২৯-এর চেয়ে আকারে প্রায় দ্বিগুণ বড় একটি ড্রোন 'শাহেদ ১৪৯' নামে উন্মোচন করার কথা ছিল।
গাজা ড্রোনটি ইরানের ড্রোন প্রযুক্তিকে এক ধাক্কায় কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এটি ইরানকে উচ্চ-উচ্চতায় দীর্ঘস্থায়ী (High-altitude long-endurance বা HALE) ড্রোন প্রযুক্তির কাতারে শামিল করেছে, যা মাঝারি-উচ্চতার (MALE) ড্রোনের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এর মাধ্যমে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী উচ্চ-উচ্চতার আকাশভিত্তিক পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রযুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ১৯৮০-এর দশকে 'মোহাজের ১' দিয়ে শুরু হওয়া আইআরজিসির ড্রোন সক্ষমতা ২০০০-এর দশকে 'শাহেদ ১২১', ২০১০-এর দশকে 'শাহেদ ১২৯' এবং নতুন শতাব্দীর শুরুতে 'শাহেদ ১৪৯ গাজা' ড্রোনে এসে এক নতুন উচ্চতা ছুঁয়েছে।
বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্ষমতা
গাজা ড্রোনটিকে 'পর্যবেক্ষণ, যুদ্ধ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের বহুমুখী ক্ষমতাসম্পন্ন' একটি ড্রোন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- উড্ডয়ন সময়কাল: এটি টানা ৩৫ ঘণ্টা আকাশে উড়তে পারে।
- অপারেশনাল রেঞ্জ: ২,০০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে এটি ১৩টি বোমা বহন করতে সক্ষম।
- গোয়েন্দা সক্ষমতা: ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে পরিবেশগত এবং সিগন্যাল তথ্য সংগ্রহের জন্য ৫০০ কেজি ওজনের বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম বহন করতে পারে।
- রাডার ফাঁকি দেওয়া বিমান শনাক্তকরণ: আইআরজিসির বিমান বাহিনীর তৎকালীন কমান্ডার আমির আলী হাজিজাদেহের মতে, গাজা ড্রোনটি ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম (Stealth) বিমানগুলোকেও শনাক্ত করতে পারে।
- আকার ও গতি: এর দৈর্ঘ্য ১০.৫ মিটার, উচ্চতা ৩.২ মিটার এবং ডানার বিস্তার (Wingspan) ২১ মিটার। এর সর্বোচ্চ উড্ডয়ন উচ্চতা ৩৫,০০০ ফুট (১০,৬৬৮ মিটার) এবং এর গতি ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার।
কারিগরি দিক ও প্রযুক্তি
গাজা ড্রোনের বাহ্যিক কাঠামো শাহেদ ১২৯-এর মতোই—যার মধ্যে রয়েছে ডানা, ভি-আকৃতির লেজ এবং ড্রোনের পেছনে থাকা চার পাখাবিশিষ্ট প্রপেলার। তবে পিষ্টন ইঞ্জিনের পরিবর্তে এতে টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এই ক্লাসের ড্রোনে টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনের ব্যবহারকে প্রযুক্তির শীর্ষ স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ড্রোনের উড্ডয়ন উচ্চতা ও ওজন বহনের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শাহেদ ১২৯-এর সর্বশেষ সংস্করণের মতো গাজা ড্রোনের মাথার ওপরের অংশে স্যাটেলাইট যোগাযোগের অ্যান্টেনা বসানোর জন্য একটি বিশেষ উঁচু অংশ রয়েছে। শাহেদ ১২৯-এর তুলনায় এর উড্ডয়ন উচ্চতা ৪৪%, আকাশে থাকার সময় ৪৬%, গতি দ্বিগুণেরও বেশি এবং বহন ক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে এর ডানার আকার ৪০% বৃদ্ধি, টেক-অফ ওজন প্রায় ২.৫ গুণ হওয়া এবং পিষ্টন ইঞ্জিনের বদলে টার্বোপ্রপ (জেট-প্রপেলার) ইঞ্জিন ব্যবহারের কারণে।
এই ড্রোনে ব্যবহৃত টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনের ওজন প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ কেজি এবং এর ক্ষমতা প্রায় ৬৫০ থেকে ৭৫০ হর্সপাওয়ার। ইরানের বিশেষজ্ঞরা এর মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ২১ মিটার বিস্তারের ডানা তৈরি করার বড় চ্যালেঞ্জ সফলভাবে পার করেছেন। ১০ কিলোমিটারের বেশি উড্ডয়ন উচ্চতার কারণে এই ড্রোনটি যেকোনো স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের বাইরে থাকে। যেখানে শাহেদ ১২৯ সর্বোচ্চ ৭,৬০০ মিটার উঁচুতে উড়তে পারত, সেখানে গাজা ড্রোন আরও ৩,০০০ মিটার বেশি উঁচুতে উড়তে সক্ষম।
অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম বহন ক্ষমতা
সাধারণত শাহেদ ১২৯ ড্রোনগুলো ৪টি কায়েম বা সাদিদ বোমা বহন করে, যার প্রতিটির ওজন ১৫ থেকে ২৫ কেজি (মোট বোমা বহন ক্ষমতা প্রায় ৮০ কেজি)। অন্যদিকে, গাজা ড্রোন নিখুঁতভাবে নিশানা করতে সক্ষম এবং "শুট-অ্যান্ড-ফরগেট" প্রযুক্তির সাদিদ বোমা বহন করতে পারে, যার ১৩টি বোমার মোট ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৪২৯ কেজি।
গোয়েন্দা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ মিশনের ক্ষেত্রে গাজা ড্রোনটি আধা টন (৫০০ কেজি) ওজনের সরঞ্জাম নিয়ে ৫০০ কিলোমিটার এলাকা স্ক্যান করতে পারে। এতে ইরানি ড্রোনের ইতিহাসে সবচেয়ে আধুনিক এবং সম্পূর্ণ 'ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল' সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। এই সিস্টেমে দিন ও রাতের ক্যামেরার পাশাপাশি কমপক্ষে ১০০ থেকে ১২০ গুণ জুম করার ক্ষমতা, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং লেজার রেঞ্জফাইন্ডার রয়েছে। ড্রোনের সামনের গম্বুজ আকৃতির নকশাটি নির্দেশ করে যে, এটি উন্নত স্যাটেলাইট যোগাযোগ অ্যান্টেনা দ্বারা সুসজ্জিত।
স্যাটেলাইট গাইডেড কন্ট্রোল সিস্টেমের কারণে এটি দূরবর্তী স্থান থেকেও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা যায়। এছাড়া গাজা ড্রোনের ভেতরে একটি ইন্টারনাল বোম্ব বে বা ভেতরের কামরা এবং রোটারি লাঞ্চার রয়েছে, যা কোনো ইরানি ড্রোনে প্রথমবার দেখা গেল। এটি মূলত ৫টি সাদিদ সিরিজের বোমা ভেতরে লুকিয়ে বহন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। আমেরিকার এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের চেয়ে এর বডি বা কাঠামো কিছুটা বেশি চওড়া, যা এই ইন্টারনাল বোম্ব বে-র ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করে।
অন্যান্য ব্যবহার
২,০০০ কিলোমিটারের যে রেঞ্জ ঘোষণা করা হয়েছে, গাজা ড্রোন সম্ভবত তার চেয়েও বেশি দূরত্বে উড়তে সক্ষম। স্যাটেলাইট যোগাযোগ সুবিধা এবং দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে থাকার ক্ষমতার কারণে এটি সামরিক অভিযানের পাশাপাশি একটি চমৎকার 'যোগাযোগ নোড' হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবহারের পাশাপাশি এই ড্রোনটি বনাঞ্চল পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।#
পার্সটুডে/এমএআর/২৩