মোহাজের-৬; গোয়েন্দা নজরদারি, যুদ্ধ অভিযান এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ মিশনের জন্য কৌশলগত ড্রোন
-
ইরানের তৈরি মোহাজের-৬ ড্রোন
পার্সটুডে-ইরান বর্তমানে বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম, যারা বিভিন্ন ধরনের ড্রোনের নকশা, উন্নয়ন ও নির্মাণে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করছে।
পার্সটুডে আরও জানিয়েছে, মোহাজের-৬ ড্রোনকে মোহাজের সিরিজের সর্বশেষ প্রজন্ম হিসেবে গণ্য করা হয়, যার কার্যক্রম শুরু হয় ইরানের আরোপিত ৮ বছরের যুদ্ধের সময় থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি ইরানের প্রতিরক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সশস্ত্র ও মানববিহীন উড়োজাহাজ বাস্তব অভিযানে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়েছে।
উদ্বোধন
স্মার্ট নির্ভুল লক্ষ্যভেদী “কায়েম” বোমা-সজ্জিত কৌশলগত ড্রোন মোহাজের-৬-এর গণউৎপাদন লাইন ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ (১৬ বহমান ১৩৯৬) তারিখে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির হাতামির উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয়।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিমান শিল্প সংস্থার বিশেষজ্ঞরা “নমনীয়তা ও উন্নয়নযোগ্যতা” নীতির ভিত্তিতে মোহাজের-৬ ডিজাইন করেছেন, যাতে এটি বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নানা ধরনের অভিযানে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
ড্রোনটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিমান শিল্প সংস্থার কুদস ইন্ডাস্ট্রিজে নির্মিত হয়। দিন ও রাতের উড্ডয়ন, আক্রমণাত্মক সক্ষমতা এবং সীমান্তবর্তী অপারেশন এলাকায় দীর্ঘক্ষণ উড্ডয়নের মতো বিভিন্ন পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করার পর মোহাজের-৬ আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সেনাবাহিনীর “হযরত ওয়ালিয়ে আসর (আ.) ড্রোন গ্রুপ” এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সামগ্রিক পরিচিতি
মোহাজের-৬ মোহাজের পরিবারের সর্বাধুনিক সদস্যদের একটি, যা কৌশলগত ও যুদ্ধক্ষম ড্রোনের শ্রেণিতে পড়ে। এটি সামরিক ও বেসামরিক উভয় ধরনের মিশনে ব্যবহারের উপযোগী।
ড্রোনটি নজরদারি, পর্যবেক্ষণ ও যুদ্ধ অভিযানে দীর্ঘ অপারেশনাল পরিসর এবং উচ্চ উড্ডয়ন স্থায়িত্ব প্রদান করে। এর মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী নির্ভরযোগ্যভাবে পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের কাজ পরিচালনা করতে পারে। পাশাপাশি এটি বিভিন্ন ধরনের নজরদারি, গোয়েন্দা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম বহনে সক্ষম।
মোহাজের-৬ দীর্ঘ সময় আকাশ পর্যবেক্ষণ এবং ভিন্ন সময় ও স্থানে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের সুযোগ দেয়।
এছাড়া, দিন ও রাতে তাৎক্ষণিক তথ্য কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পাঠানো এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্তৃত গোয়েন্দা নজরদারি নিশ্চিত করার ক্ষমতাও এর রয়েছে। মোহাজের-৬ স্বল্প দৈর্ঘ্যের রানওয়েতে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। স্বয়ংক্রিয় টেক-অফ ও ল্যান্ডিং এবং দেশীয় উন্নত ইলেকট্রো-অ্যাভিওনিক্স ব্যবহারের কারণে এটি আধুনিক ও কার্যকর ড্রোনের কাতারে স্থান পেয়েছে।
যুদ্ধক্ষমতা
এই ড্রোনটি একইসঙ্গে নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়। এটি প্রায় ৮ কিলোমিটার পাল্লার অপটিক্যাল-থার্মাল নির্দেশিত “কায়েম” স্মার্ট বোমা বহন ও নিক্ষেপ করতে পারে।
“কায়েম” স্মার্ট বোমা দিন-রাতের যে-কোনো সময় স্থির ও চলমান লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আঘাত হানতে সক্ষম এবং বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষিত স্থাপনা ভেদ করার ক্ষমতা রাখে।
২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর “পায়মবারে আজম (সা.)-১৭” মহড়ায় মোহাজের-৬ ড্রোন “কায়েম” স্মার্ট বোমা নিক্ষেপের পাশাপাশি “আলমাস” টপ-অ্যাটাক অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সফলভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে।
বৈশিষ্ট্য
মোহাজের-৬ ড্রোনকে মোহাজের পরিবারের নকশাগত বিবর্তনের একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। অনেকের মতে, ইরানের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে ইতালির তৈরি উন্নত কৌশলগত ড্রোন “ফালকো” থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।
মোহাজের-৬ একটি “হাই-উইং” ড্রোন অর্থাৎ এর ডানা গায়ের উপরের অংশে স্থাপন করা হয়েছে। তবে এর দ্বৈত লেজ বা টুইন বুম নকশা মোহাজের-৪-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মোহাজের-৬ ড্রোনের কাঠামো ইতালির “ফালকো” ড্রোনের সঙ্গে কিছু মিল দেখায়, যদিও “মোহাজের ৬”-এর দেহ তুলনামূলকভাবে বেশি দীর্ঘ। এই ড্রোনের ল্যান্ডিং গিয়ার (অবতরণ চাকা) সহজ নকশার এবং ভাঁজ করা যায় না। মনে করা হয়, উৎপাদন ব্যয় কম রাখাও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। ড্রোনটির পেছনের অংশে একটি তিন-পাখার প্রপেলার ইঞ্জিন রয়েছে। এই প্রপেলারের নকশা আগের ধরনের তুলনায় ভিন্ন এবং সম্ভবত এটি কম শব্দ বা বেশি শক্তি উৎপাদনের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা আগের ডিজাইনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে। মোহাজের-৬ এর ডানা আয়তাকার ও সরল ধরনের, যেখানে একটি অসমমিত এলেরন (aileron) রয়েছে। এর ডাবল-টেইল কাঠামো অন্যান্য মোহাজের পরিবারের ড্রোনগুলোর মতোই। কম্পোজিট উপাদানে তৈরি হওয়ায় এর রাডার প্রতিফলন কম।
ইরানের অন্যতম উন্নত সামরিক ড্রোন “মোহাজের-৬”এর সর্বোচ্চ টেকঅফ ওজন ৬০০ কেজি, দৈর্ঘ্য ৫.৫ মিটার, ডানার প্রস্থ ১০ মিটার, সর্বোচ্চ উড্ডয়ন উচ্চতা ১৮ হাজার ফুট এবং সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার। এর কার্যক্ষম পরিসীমা প্রায় ২০০০ কিলোমিটার, যা দিয়ে এটি দিন ও রাতে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং অনুসরণ করতে সক্ষম। এটি স্থির ও চলমান লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনায় ব্যবহৃত হতে পারে, কারণ এতে নির্ভুলভাবে নির্দেশিত অস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে। ড্রোনটি ডানার নিচে প্রায় ৪০ কেজি অস্ত্র বহন করতে পারে এবং দূর থেকে “আলমাস” গাইডেড মিসাইল ও “কায়েম” গাইডেড বোমা নিক্ষেপ করতে সক্ষম।
নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে মোহাজের-৬ ড্রোনে ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল, লেজার, ইনফ্রারেড সেন্সর, শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক সিগন্যাল শনাক্তকারী সিস্টেম, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, জ্যামিং সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় উড্ডয়ন ও অবতরণ ব্যবস্থা রয়েছে। এটি একটি উন্নত ও কার্যকর মানববিহীন বিমান হিসেবে বিবেচিত।
ড্রোনটির নিচে, সামনের ল্যান্ডিং গিয়ারের পেছনে একটি স্থিতিশীল ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যা ধারণা করা হয় “ঈগল-১০” ধরনের একটি সিস্টেম। এটি দিন ও রাতে পর্যবেক্ষণ এবং লক্ষ্য অনুসরণ করতে সক্ষম। নাকের অংশে আরও একটি ফ্রন্ট-ফেসিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মোহাজের ৬-এ “শাহেদ ১২৯”-এ ব্যবহৃত একই ধরনের অপটিক্যাল সিস্টেম ব্যবহৃত হয়েছে।
এই অপটিক্যাল সিস্টেমটি দিনের আলোতে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূর থেকে লক্ষ্য অনুসন্ধান শুরু করতে পারে এবং প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে লক করতে সক্ষম। এতে লেজার ডিজাইনার এবং ইনফ্রারেড সিস্টেমও রয়েছে, যা লেজার-গাইডেড বা ইনফ্রারেড-গাইডেড অস্ত্র পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়।
ইরানের স্থলবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মোহাজের-৬ ড্রোনকে রাডার শনাক্তকরণ ও ইলেকট্রনিক জ্যামিং মিশনে ব্যবহার করার দায়িত্ব দিয়েছে, যাতে এটি শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দমনেও ভূমিকা রাখতে পারে। রাডার শনাক্তকারী ও জ্যামিং সিস্টেমের সঙ্গে “কায়েম” স্ট্যান্ড-অফ বোমা যুক্ত হলে, মোহাজের-৬ স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।#
পার্সটুডে/এনএম/২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।