জাতিসংঘে পেজেশকিয়ানের ভাষণ: কঠোর প্রতিরোধ ও শর্তসাপেক্ষ কূটনীতি
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i163356-জাতিসংঘে_পেজেশকিয়ানের_ভাষণ_কঠোর_প্রতিরোধ_ও_শর্তসাপেক্ষ_কূটনীতি
পার্সটুডে-জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ হওয়ায় বিশ্বপর্যায়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
(last modified 2026-09-24T13:15:47+00:00 )
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ ১৪:৫০ Asia/Dhaka
  • ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
    ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান

পার্সটুডে-জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ হওয়ায় বিশ্বপর্যায়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন। প্রায় সাত মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলার প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই ভাষণকে ইরানের প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সমালোচনা এবং সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আরও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ভাষণের আগের দিন একই মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকিমূলক ভাষায় বলেছিলেন, তিনি একটি ‘বড় সিদ্ধান্তের’ মুখোমুখি-ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে দেশটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া অথবা ইরানকে ‘ধ্বংস’ করা। ফলে পেজেশকিয়ানের ভাষণে ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব থাকবে-এমন প্রত্যাশা ছিল।

সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান এবং ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের অভিযুক্ত’ নয়, বরং ‘সন্ত্রাসবাদের শিকার’ হিসেবে তুলে ধরা।

তিনি মিনাবের ‘শাজেরে তাইয়্যেবা’ স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১৫০-এর বেশি শিশুর ছবি এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ছবি হাতে নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানকে সন্ত্রাসী বলেছেন, অথচ ইরান নিজেই সন্ত্রাসবাদের শিকার।

ইরানের নেতার ওপর হামলা, স্কুলে বোমাবর্ষণ, মার্কিন ও ইসরাইলি অস্ত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিহত হওয়া এবং নিজের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের দিন তেহরানে ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান আগ্রাসন শুরু করেনি এবং ভূখণ্ড সম্প্রসারণেরও কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই; বরং তারা আত্মরক্ষার অবস্থানে রয়েছে।

গাজায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন—ইরান যদি শুধু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, তাহলে কীভাবে তাকে অস্থিতিশীলতার কারণ বলা হয়? তাঁর দাবি, গত ২০০ বছরে ইরান কোনো দেশের ওপর হামলা করেনি এবং সবসময় আত্মরক্ষা করেছে।

সামরিক শক্তি: আগ্রাসন নয়, প্রতিরক্ষা

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইরানের সামরিক শক্তির চরিত্র। পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা নিজেদের রক্ষার জন্য শক্তি চাই; আগ্রাসনের জন্য শক্তি চাই না।’

তিনি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে কেউ মনে না করে যে ইরানের শহরগুলোতে বোমাবর্ষণ করলেও কোনো জবাব আসবে না। ইরানের সামরিক শক্তি প্রতিরক্ষার জন্য এবং আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে ইরান কারও অনুমতি নেবে না।

এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতি প্রতিরোধের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের স্বাধীনতার অবস্থানও তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্র অবরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইরানের পথ বন্ধ করা হচ্ছে, অথচ একই জলপথ দিয়ে অস্ত্র, বিস্ফোরক, ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি পরিবহন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, বিদেশি সামরিক বহরের স্থায়ী উপস্থিতি ও যুদ্ধের বিস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। উপকূলীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

পরমাণু ইস্যু ও দ্বৈত মানদণ্ড

ভাষণের অন্যতম আলোচিত অংশ ছিল পরমাণু ইস্যুতে তথাকথিত দ্বৈত মানদণ্ডের সমালোচনা। পেজেশকিয়ানের বক্তব্য-‘ইসরাইলে পরমাণু বোমা, আর ইরানে পরিদর্শক।’

তিনি বলেন, ইসরাইল গাজায় ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে, অথচ ইরান যখন আলোচনার টেবিলে ছিল তখনও বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে, তারা এনপিটি-র সদস্য নয় এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নেয়নি; তারপরও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সহায়তা পায় এবং বিভিন্ন রাজধানীতে হামলার ক্ষেত্রে দায়মুক্তি ভোগ করে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ইসরাইলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং দেশটি আইএইএর স্বাভাবিক পরিদর্শন ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। বিপরীতে, ইরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের মুখোমুখি হয়েছে এবং তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত-৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজিরও বেশি ইউরেনিয়ামসহ-নজরদারির আওতায় ছিল। তবে ২০২৫ সালের জুনের হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের স্থাপনায় পরিদর্শকদের প্রবেশ বন্ধ রয়েছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান মেনে নেবে না যে পারমাণবিক জ্ঞান কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকার হবে। তিনি পরমাণু অস্ত্রকে নিরাপত্তার উপায় হিসেবে দেখেন না, তবে বিজ্ঞান, শিল্প ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের অধিকার থেকেও সরে আসবেন না। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা দরিদ্র মানুষ, রোগী ও নিরপরাধ জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি হাতিয়ার।

প্রতিরোধ ও কূটনীতির সমন্বয়

চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রতিরোধ ও কূটনীতির সমন্বয়। একদিকে পেজেশকিয়ান ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, হুমকি ইরানি জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী ও প্রতিরোধী করে তুলবে এবং ইরানের জনগণ শক্তির কাছে মাথা নত করবে না।

অন্যদিকে তিনি জানান, ইরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে শক্তির ভাষা মেনে নেবে না। এই অবস্থানকে ‘আলোচনায় প্রস্তুত প্রতিরোধনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

ইরানের জনগণ সাত মাস ধরে দেশের প্রতিরক্ষায় রাজপথে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণই ইরানের প্রধান শক্তি এবং সরকার জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে অবস্থান করছে।

কূটনৈতিক দিক থেকে আলোচনার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে পেজেশকিয়ান কার্যত আলোচনার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দেন এবং ইঙ্গিত দেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে শক্তি ও ধ্বংসের হুমকির পথ বেছে নেওয়া পক্ষকেই তার দায় নিতে হবে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অভিন্ন ভবিষ্যৎ

পঞ্চম বিষয় ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা। পেজেশকিয়ান বলেন, এই অঞ্চলের কোনো দেশ একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। ‘হয় আমরা একসঙ্গে নিরাপত্তা গড়ে তুলব, অথবা একসঙ্গে অনিরাপত্তা সহ্য করব।’

তিনি মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি ও ইরানের ওপর সামুদ্রিক অবরোধের সমালোচনা করে বলেন, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি নিরাপত্তা আনে না; বরং উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা বাড়ায়।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সবাই হরমুজ প্রণালির সুবিধা ভোগ করবে, অথচ ইরানকে সেখান থেকে বঞ্চিত করা হবে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে তিনি ইরানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার একজন দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।

মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার

ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার। পেজেশকিয়ান বলেন, ন্যায়বিচার চাইলে বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী-উভয়কেই একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। মানবাধিকারকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ইরান বিশেষ সুবিধা চায় না; তারা সমান অধিকার চায় এবং সেই অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বও গ্রহণ করে।

তাঁর মতে, একটি কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা জাতিগুলোর সমতা, ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা এবং মানবজাতির সম্মিলিত ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। কারণ সবার জন্য শান্তি না থাকলে তা প্রকৃত শান্তি নয় এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার না থাকলে তা প্রকৃত ন্যায়বিচার নয়।

ভাষণের শেষদিকে পেজেশকিয়ান ট্রাম্পের বক্তব্যকে জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী ‘দাদাগিরি ও শক্তির রাজনীতির’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হুমকি ইরানের জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে এবং আগ্রাসীদের অনুতপ্ত হতে বাধ্য করবে।

পেজেশকিয়ানের ভাষণে আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় দেখা গেছে-নিহত শিশুদের ছবি প্রদর্শন থেকে শুরু করে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের যুক্তি পর্যন্ত। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের বিপরীতে ইরানের অবস্থানকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং বলেছেন, ইরান আগ্রাসনের সূচনাকারী নয়, বরং আগ্রাসনের শিকার।

কৌশলগতভাবে ভাষণটি ইরানের ‘সক্রিয় প্রতিরোধ’ নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে-অর্থাৎ সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখা।

যদিও এই ভাষণ তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা কমাবে বা যুদ্ধের অবসান ঘটাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। ভাষণটিতে ইরান স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার অবস্থান থেকে সরে না যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।#

পার্সটুডে/এনএম/২৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।