'ইরানকে আজকের মানচিত্র দিয়ে হিসাব করবেন না'
রুবিওকে ইতিহাসের পাঠ দিলেন ইরানের জরথুস্ত্রীয় সংসদ সদস্য
-
বেহশিদ বারখোরদার
পার্সটুডে: ইরানের সংসদে (মজলিস) জরথুস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বেহশিদ বারখোরদার এক নিবন্ধে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও'র দাবির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থার (আইআরআইবি) বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, রুবিও এথেন্সে জেরক্সিসের অভিযান ও এথেন্সের মন্দিরে আগুন লাগার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। এর জবাবে বারখোরদার ইতিহাসের বাছাই করা পাঠ এড়িয়ে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইরান সংস্কৃতি, সভ্যতা ও দৃঢ়তার ভূমি। হুমকি ও অবমাননা ইরানি জাতির ইচ্ছাশক্তি ভাঙতে পারে না।
তিনি বলেন, ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে হলে তার পুরো বর্ণনাই শোনা উচিত, শুধু সেই অংশটুকু নয় যা আজ রাজনীতি ও ক্ষমতার কাজে লাগে। তাই আপনাকে এমন একটি বইয়ের কথা মনে করিয়ে দিই, যা কোনো ইরানি লেখেননি, লিখেছেন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস। সেই ইতিহাসেই এথেন্সীয় ও আয়োনীয়দের সার্ডিস আক্রমণের বিবরণ লেখা আছে। সার্ডিস ছিল হাখামানেশীয় (আখেমেনীয়) সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বারখোরদার জোর দিয়ে বলেন, "জনাব রুবিও! ইতিহাস কোনো সরকারের প্রচার-দপ্তর নয়। এটি এমন একটি আয়না, যেখানে অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে প্রত্যেকের নিজের চেহারা দেখা উচিত।"
তিনি বলেন, "আমি ইরানের মজলিসে জরথুস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে এমন এক জাতির পক্ষ থেকে কথা বলছি, যার সাংস্কৃতিক শিকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। তাদের চিন্তার উত্তরাধিকারে সত্য মিথ্যার মুখোমুখি, প্রজ্ঞা অজ্ঞতার মুখোমুখি এবং সমৃদ্ধি ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। জরথুস্ত্রীয় সংস্কৃতিতে সৎ চিন্তা, সৎ কথা ও সৎ কাজ কেবল কথা সাজানোর শব্দ নয়। এগুলো মানুষের আচরণ ও ক্ষমতা পরিমাপের মানদণ্ড।"
বারখোরদার আরও বলেন, "এই অবস্থান থেকেই আমরা বলি: সভ্যতার কথা বললে সভ্যতাকে সম্মান করুন। ইতিহাসের কথা বললে তা বিকৃত করবেন না। আর শান্তি ও নিরাপত্তার কথা বললে একটি জাতিকে হুমকি দেওয়ার সঙ্গে সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্বের ভাষা মেশাবেন না। ইরান একটি বক্তৃতায় জন্ম নেয়নি, একটি বক্তৃতায় শেষও হবে না। ইরান সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভূমি। চিন্তা ও কবিতার ভূমি, জ্ঞান ও স্থাপত্যের ভূমি। এমন এক উত্তরাধিকারের ভূমি, যা ইতিহাসের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে এসে আজও জীবিত।"
তিনি বলেন, "ইরানি জাতি বহুবার কালের ঝড় দেখেছে, কিন্তু নিজের পরিচয় হারায়নি। শহর ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সীমানা বদলাতে পারে, কিন্তু একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতিকে হুমকি ও অবমাননা দিয়ে স্তব্ধ করা যায় না।"
জরথুস্ত্রীয় প্রতিনিধি বলেন, "শক্তি দেখিয়ে একটি জাতির ইচ্ছাশক্তি ভাঙার দিন শেষ। ইরানকে কয়েকটি রাজনৈতিক বাক্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। ঠিক যেমন কোনো সভ্যতাকে শুধু তার যুদ্ধ ও ঐতিহাসিক পরাজয় দিয়ে চেনা যায় না। আমরা যুদ্ধকে স্বাগত জানাই না, কিন্তু হুমকির সামনে আত্মসমর্পণকেও সম্মানজনক মনে করি না। আমরা পারস্পরিক সম্মান, স্থায়ী নিরাপত্তা এবং এমন এক ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে জাতিগুলো অবমাননার ভাষায় নয়, প্রজ্ঞার ভাষায় কথা বলবে। যারা ইরানকে ছোট করে দেখে, তাদের উদ্দেশে বলছি: ইরানকে আজকের মানচিত্র দিয়ে হিসাব করবেন না। ইরান হাজার হাজার বছরের স্মৃতি, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা ও জাতীয় ইচ্ছাশক্তির ফল।"
তিনি আরও বলেন, "কেউ যদি ভাবে হুমকি দিয়ে এই জাতিকে হাঁটু গেড়ে বসাতে পারবে, তার জানা উচিত, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু অস্ত্র ও সরঞ্জামের সংখ্যায় নয়। শক্তি আছে জনগণের সঙ্গে মাটির বন্ধনে, সাংস্কৃতিক পুঁজিতে, দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্যে এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সংকল্পে। ইরানের সম্মানিত জনগণ ২২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মাঠে উপস্থিত থেকে তা প্রমাণ করেছে।"
বারখোরদার বলেন, "আমরা এমন ভূমির সন্তান, যার সভ্যতার স্মৃতিতে সাইরাস ও দারিয়ুস থেকে ফেরদৌসি, এবং সমকালের চিন্তাবিদ ও আত্মোৎসর্গকারীরা আছেন। এঁদের মধ্যে আছেন হেম্মাত, সোলেইমানি ও বাকেরির মতো সেনাপতিরা, মিনাব ও লামর্দের শিক্ষার্থীরা, লাখ লাখ অজ্ঞাত সৈনিক, লঞ্চারের পেছনের সৈনিকেরা এবং সামনের সারিতে থাকা বিপ্লবের শহীদ নেতা। এঁরা সবাই ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও পরিচয়ের নানা বর্ণনা উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন।
তিনি যোগ করেন, "ইরানের জরথুস্ত্রীয়দের প্রতিনিধি হিসেবে, সত্য ও প্রজ্ঞার উত্তরাধিকারের ওপর ভর করে আমি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছি: ইরান সম্মান চায়, করুণা নয়। নিরাপত্তা চায়, হুমকি নয়। পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক চায়, এমন শ্রেণিবিন্যাস নয়, যেখানে এক জাতি নিজেকে অন্যদের সভ্যতার বিচারক মনে করে। কেউ যদি তবুও হুমকির ভাষাই বেছে নেয়, আমাদের জবাব স্পষ্ট: ইরানি জাতি নিজের সচেতনতা, ঐক্য ও ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করবে।"
শেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, "জনাব রুবিও, আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, পশ্চিমাদের সক্রেটিসের সাদা দাড়ির দোহাই দিয়ে ইরান আক্রমণে যোগ দিতে শপথ করানোর বদলে প্রজ্ঞার পথ নিন। আজ এই নিবন্ধে আমি মহান দারিয়ুসের একটি কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি, যা আপনারা দিনে তিনবার নিজেদের কাছে আওড়াতে পারেন: 'উত্তেজিত জাতির ক্রোধ যেকোনো অসুরকে পুড়িয়ে ফেলবে। তাই ভয় পান এবং জেনে রাখুন, আমরা অবশ্যই বিজয়ী'।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৩