ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার কিছু খণ্ডচিত্র-৪ (স্লাইডশো)
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i32397-ইরানের_ইসলামি_বিপ্লবের_সময়কার_কিছু_খণ্ডচিত্র_৪_(স্লাইডশো)
১৯৭৮ সালের ২৯ শে মার্চ। পরিস্থিতি তখনও থমথমে। মানুষ শাহের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। কোমের বিক্ষোভে গুলির পর তাব্রিজের শোকানুষ্ঠানে নৃশংস হামলা; মানুষের ধৈর্যের বাধ যেন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। তাব্রিজের শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠান শেষ করেই ক্ষুব্ধ জনতা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। তারা প্রকাশ্যে শাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। হত্যাকান্ডের পুণরাবৃত্তির ব্যাপারে মানুষরূপী হায়েনাদের সতর্ক করে দেয়া হয়।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৭ ১১:৫১ Asia/Dhaka

১৯৭৮ সালের ২৯ শে মার্চ। পরিস্থিতি তখনও থমথমে। মানুষ শাহের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। কোমের বিক্ষোভে গুলির পর তাব্রিজের শোকানুষ্ঠানে নৃশংস হামলা; মানুষের ধৈর্যের বাধ যেন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। তাব্রিজের শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠান শেষ করেই ক্ষুব্ধ জনতা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। তারা প্রকাশ্যে শাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। হত্যাকান্ডের পুণরাবৃত্তির ব্যাপারে মানুষরূপী হায়েনাদের সতর্ক করে দেয়া হয়।

২৯ শে মার্চ কোন অঘটন না ঘটলেও ৩০ শে মার্চ ইরানের আরেক শহর ইয়াযদের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.)-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ সাদুকি ইমামের মুক্তির দাবিতে ইয়াযদ জামে মসজিদে এক সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। সমাবেশ শেষে উপস্থিত জনতা রাস্তায় শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেয়। সেদিনের বিক্ষোভও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতে দেয়নি শাহের বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ঐ হামলায় ১৫ জন বিক্ষোভকারী শহীদ এবং আরও অনেকে আহত হন। কিন্তু সেদিন শাহের বাহিনী গুলি চালিয়েও বিক্ষোভ বন্ধ করতে পারেনি। ওই বিক্ষোভ টানা তিনদিন অব্যাহত ছিল। শাহের নির্যাতন যত বাড়ছিল আন্দোলনও ততটাই বেগবান হচ্ছিল।

ইসলামী বিপ্লবের সেই দিনগুলির ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহীদদের স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানগুলো ইসলামী বিপ্লবকে সফল করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের মতো ইরানেও কেউ মারা গেলে এর তৃতীয়,সপ্তম ও চল্লিশতম দিবসে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন এবং মরহুমের পরকালীন শান্তির জন্য দোয়া করেন। ইরানে বিপ্লবের দিনগুলিতে স্বৈরাচারী শাহের বাহিনীর হাতে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন দিবসে যেসব অনুষ্ঠান হতো,তাতে মানুষের ব্যাপক সমাবেশ ঘটতো। কোন কোন শহীদের স্মরণে ইরানের প্রায় সকল শহরে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর প্রধাণ কারণ হলো, শহীদদের প্রতি জনগণের গভীর শ্রদ্ধাবোধ। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবনদান করেন,ইরানীরা তাদেরকে অতি আপনজন বলে মনে করে। শহীদদের স্মরণকে তারা অপরিহার্য বলে বিশ্বাস করেন। কাজেই শাহ প্রতিটি হত্যার মাধ্যমে নিজেরই পতন ডেকে আনছিলেন। একেকটি শাহাদাতের ঘটনা অন্তত তিনটি শোক সমাবেশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতো। শহীদদের স্মরণে তৃতীয়,সপ্তম ও চল্লিশতম দিবসে যেসব অনুষ্ঠান হতো, তার প্রত্যেকটিতে স্বাভাবিক ভাবেই স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হতো এবং বিপ্লবী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেত। শহীদদের রক্ত যাতে বৃথা না যায়, সে ব্যাপারে ইরানীরা শপথ নিতো। ইরনের সমকালীন ইতিহাস সম্পর্কে পাশ্চাত্যের লেখক জন ফুরান একটি বই লিখেছেন। 'কঠোর প্রতিরোধ' নামক ঐ বইয়ে তিনি বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে চেহলাম অনুষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছেন, শাহ সরকার চেহলাম উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশগুলোর বিষয়ে আগে থেকে ভাবতেও পারেনি। ইরানে কেউ শহীদ হলে তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শাহাদাতের চল্লিশতম দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারি কোম শহরে যারা শহীদ হয়েছিল তাদের স্মরণে ১৮ই ফেব্রুয়ারি তাব্রিজ,কোম, মাশহাদ এবং আরও নয়টি শহরে চেহলামের আয়োজন করা হয়। পুলিশ তাব্রিজের অনুষ্ঠানে সেদিন এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে। এরপরই ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের উপরও হামলা চালানো হয়। ঐ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারায়। তাব্রিজের শহীদদের চেহলাম দিবসে ৫৫ টি শহরে পুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষ হয়।

ইরানের জনগণের মাঝে প্রথম দিকে যে ভীতি কাজ করছিল ক্রমান্নয়ে তা দূরীভুত হয় এবং শাহের দমন-পীড়ন আন্দোলনে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততাকে আরও বেশি জোরদার করে। আর এর মাঝে নির্বাসনে থেকেই ইমাম খোমেনী (রহ.) নিয়মিত দিক-নির্দেশনামূলক বাণী পাঠাতে থাকেন। ইমামের বক্তব্যে বারবারই আশাবাদ ফুটে ওঠত। তার আশাবাদ থেকে জনগণ শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করতেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) সব সময় ঐক্য বজায় রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এর ফলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

এর কয়েক মাস আগেও ইরানে ভালো কোন বিশেষণ যোগ না করে শাহের নাম উচ্চারণ করলে বা তার সামান্যতম সমালোচনা করা হলে কঠোর শাস্তি পেতে হতো। শুধু শাহ নয় তার পরিবারের কারো সমালোচনা করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আন্দোলন বেগবান হবার সাথে সাথে সেসব নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও লোপ পায়। ইরানের জনগণ তাদের নিজস্ব মত-পার্থক্য ভুলে ইমাম খোমেনী (রহ.)-র নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পেরেছিলেন বলেই আজ স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন।