ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার কিছু খণ্ডচিত্র-৬ (স্লাইডশো)
১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা। দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ধর্মঘট শুরু হয়। ৯ই সেপ্টেম্বর ইরানের সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগারের কর্মচারী ও শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করে। এর পরপরই দেশের অন্যান্য শহরের তেল স্থাপনাগুলোতেও ধর্মঘট শুরু হয়। এর ফলে কার্যত তেল উত্তোলন ও রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
তেল স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানেও ধর্মঘট শুরু হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.) এক বার্তায় শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘট বিশেষকরে তেল শিল্পে ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন এবং ধর্মঘটকারীদের ক্ষতি যতটুকু সম্ভব পুষিয়ে দিতে সাধারণ জনগণ ও আলেম-ওলামাদের প্রতি আহ্বান জানান। সরকারী অফিস, ব্যাংক, কারখানা এমনকি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্মঘট চলতে থাকে। তবে শাহ তার প্রধান আয়ের উৎস তেল শিল্পে ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয় । তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গোটা বিশ্বেই এর প্রভাব পড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি গোটা বিশ্বই এটা উপলব্ধি করতে পারে যে, ইরানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শাহের পতনের আগ পর্যন্ত তেল শিল্পে ধর্মঘট অব্যাহত ছিল।
সে সময় আরেকটি মজার ঘটনা ঘটানো হতো। সেটি হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি রাতের একটা নির্দ্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতেন যাতে বিপ্লবীরা বিক্ষোভ করতে পারেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিপ্লবীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতো এবং বাসার ছাদ থেকে শাহ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতো। এ অবস্থায় শাহ ও তার সহযোগীরা আরও এক নারকীয় তান্ডবের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।
১৯৭৮ সালের ১৬ই অক্টোবর। তেহরানে ৮ই সেপ্টেম্বরের গণহত্যার চেহলাম উপলক্ষ্যে কেরমান শহরের জামে মসজিদে ২০ হাজার মুসল্লী সমবেত হয়। অনুষ্ঠানের মাঝখানে হঠাৎ চিৎকার-চেচামেচি শোনা গেল। বেশ কিছু ব্যক্তি চাকুসহ হাতে তৈরী ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক মানুষ খুন করছে। মসজিদের মেঝে রক্তে ভিজে যায়। এরপর এসব ব্যক্তি মসজিদে আগুন লাগিয়ে চলে যায়। সেদিন শাহের পুলিশ বাহিনী সাদা পোশাকে নারকীয় এই তান্ডব চালিয়েছিল। বিষয়টি সবাই উপলব্ধি করতে পারে। ইমাম খোমেনী (রহ.) এক শোকবার্তায় ঐ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।
এর ক'দিন পরই শাহের জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। মোহাম্মদ রেজা শাহের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো তার কাছে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠায় এবং শাহের প্রতি তাদের সমর্থন পুণরায় ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ইমাম খোমেনী (রহ.) শাহের জন্মদিনকে শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।
ইরানে যখন আন্দোলন তুঙ্গে তখন ইরাকের বাথ সরকার নাজাফে নির্বাসিত ইমাম খোমেনী (রহ.)-র আবাসস্থল অবরোধ করে। ইমাম খোমেনী (রহ.) কে আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এটিও ছিল একটি পন্থা। ইরানের শাহ ও ইরাকের বাথ পার্টির সরকারের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শাহ চাচ্ছিল ইমাম খোমেনীর রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ করতে। আর অন্যদিকে ইরাকি জনগণের উপর ইমামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব পড়তে পারে, সে আশংকায় বাগদাদ উদ্বেগের মধ্যে ছিল। কাজেই তারা ইরাকে ইমামের উপস্থিতিকে নিজেদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছিলনা। এ পরিস্থিতিতে ইমাম খোমেনী (রহ.) ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহর ছেড়ে কুয়েতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু ইরানের শাহ ও মার্কিন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে কুয়েত সরকারও ইমামকে গ্রহণ করতে রাজী হয়নি।
এরপর সবাই ভেবেছিল ইমাম হয়ত অপর কোন মুসলিম দেশকে বেছে নেবেন। কিন্তু না। দেখা গেল তিনি অপ্রত্যাশিত ভাবে ফ্রান্সে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৭৮ সালের ৭ই অক্টোবর তিনি ফ্রান্সে যান। ইরানের শাহী সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ খবর শুনে বেশ খুশীই হয়েছিল। তারা ভেবেছিল পাশ্চাত্যের দেশে ইমাম কোনঠাসা হয়ে পড়বেন এবং ইরানের জনগণের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস এর উল্টো কথাই বলে। ইমাম খোমেনী (রহ.) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পৌছার কয়েক দিন পরই সেখানকার নুফেল লুশাতু গ্রামে যান। ইরানের শাহের প্রতি ফরাসী সরকারেরও সমর্থন ছিল। একারণে ফ্রান্স সরকার ইমামের সাথে সাংবাদিকদের যোগাযোগ ও জামাতে নামাজের উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক সাংবাদিক ও ভক্তের চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত সে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকেনি। ইমামের উপস্থিতির চার মাসের মধ্যে প্যারিসের অদূরবর্তী নুফেল লুশাতু গ্রামটি বিশ্বের গণমাধ্যমে একটি পরিচিত গ্রামে পরিণত হয় এবং সেখান থেকেই ইমাম খোমেনী, ইরানের শাহের অন্যায় ও অপরাধ ফাঁস করতে থাকেন।
এ সময় ইরানে নয়া প্রধানমন্ত্রী শরীফ ইমামী, শাহকে টিকিয়ে রাখার জন্য লোক দেখানো কিছু গণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে নিজেকে দল-নিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। এক পর্যায়ে ১৯৭৮ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে শাহের গঠিত রাস্তখিয দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। শাহ যে নিকৃষ্টতম স্বৈরশাসক ছিল,তার একটি বড় উদাহরণ হলো এই রাস্তখিয পাটি। রাস্তখিয পার্টি গঠনের আগে ইরানে দুটি দলের অস্তিত্ব ছিল এবং উভয় দলই শাহের আনুগত্য পরিপূর্ণ ভাবে মেনেই নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো। আনুগত্য বজায় রাখার পরও এই দল দুটির অস্তিত্বকে তিনি সহ্য করতে পারেননি। শাহ ঐ দল দুটি বিলুপ্ত করে রাস্তখিয নামের নতুন পার্টি গঠন করেন এবং সবাইকে তার দলে যোগ দেবার নির্দেশ দেন। তিনি ঐ দল গঠনের পর শাহ বলেছিলেন, রাস্তখিয দলে যারা যোগ দেবেনা তাদেরকে ইরান ছেড়ে চলে যেতে হবে অথবা কারাবরণ করতে হবে। এই দম্ভোক্তির সাড়ে তিন বছর পর জনগণের চাপের মুখে শাহের ইঙ্গিতেই এই দলটি বিলুপ্ত করা হয়।
এটি ছিল শাহের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য শাহ টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে স্বীকার করেন যে, অতীতে অনেক ভুল হয়েছে। তবে এসব ভুলের জন্য তিনি তার অনুগত পূর্বের সরকারগুলোকে দায়ি করেন। এরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমির আব্বাস হুবাইদা এবং গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সাভাকের সাবেক প্রধান নাসিরীকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ইরানি জনগণ শাহের এসব প্রতারণামূলক পদক্ষেপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় এবং অতীতের সকল কর্মকান্ডের জন্য শাহকে দায়ি করে তার পতনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিও জোরেসুরে উচ্চারিত হতে থাকে।
নয়া শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম থেকেই ইরানের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শাহ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দূর্গে পরিণত হয়। ছাত্ররা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমবেত হয়ে শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এর ফলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। বিপ্লবী আন্দোলনকে বেগবান করতে ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করার পর শাহের বাহিনী তা দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭৮ সালের চৌঠা নভেম্বর ছিল ইমাম খোমেনী (রহ.)কে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানোর ১৮তম বার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষ্যে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ গুলির শব্দ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে লাশ হয় ৫৬ জন বিপ্লবী ছাত্র। আহত হয় আরও শত শত বিক্ষোভকারী। এরপর ছাত্রদের বিক্ষোভ আরও তুঙ্গে ওঠে। উপায়ান্তর না দেখে শাহের সরকার সকল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে।