মিডল ইস্ট আই
'ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নিপীড়নের শিক্ষা ইসরাইল আমেরিকা থেকেই নিয়েছে'
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনাদের যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত প্রকাশিত প্রতিবেদনে পশ্চিমাদের বিস্ময় প্রকাশের বিষয়টি একটি মিথ্যা প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়।
"মিডল ইস্ট আই" সংবাদ মাধ্যম মার্কিন ও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের নির্যাতনের দীর্ঘ রেকর্ড তুলে ধরে এবং একইসঙ্গে ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠীর কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে এক ফিলিস্তিনি বন্দীর ধর্ষণের ছবির প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমারা যে বিস্ময় প্রকাশ করেছে তা তাদের মিথ্যা অভিনয়। পার্সটুডের রিপোর্ট অনুসারে এবং ইসনার উদ্ধৃতি দিয়ে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের কারাগারে ফিলিস্তিনি পুরুষ বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনের কেলেঙ্কারির দায়ে যেখানে এই শাসক গোষ্ঠীর নয়জন সৈন্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তারপর তাদেরকে মুক্তি এবং গৃহবন্দী করে রাখা হয় সেটির খবর পশ্চিমা মিডিয়ায় এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যেন এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই বেদনাদায়ক বিষয়টির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের ধারনা যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের কারাগারে যৌন নির্যাতন অহরহ এবং প্রতিদিনের কোনো ঘটনা নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইসরাইলের সাদি টিমান কারাগার থেকে প্রকাশিত ছবিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রতিদিনের নির্যাতনের বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই বলে মনে করে হোয়াইট হাউস এবং ইহুদিবাদী শাসনামলে যৌন নির্যাতনের প্রতিবেদনকে 'খুবই উদ্বেগজনক' বলে বর্ণনা করেছে। ইহুদিবাদী শাসকদের কারাগারে যৌন নির্যাতনের এসব ছবি ও প্রতিবেদন দেখার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নও ‘খুব উদ্বিগ্ন’ বলে দাবি করেছে।
ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়ন ও নিপীড়নের পদ্ধতিতে এই সমস্যাটি নতুন কোনো বিষয় নয় কারণ এই শাসক গোষ্ঠীর সেনাবাহিনী সেই ১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনকে পদ্ধতিগতভাবে ব্যবহার করে আসছে এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই তিক্ত সত্যটি কয়েক বছর আগে প্রকাশ করেছে।
এই রিপোর্ট অনুসারে ১৮৮০ এর দশক থেকে যৌন নির্যাতন বা 'অন্যান্য নির্যাতন' ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইহুদিবাদী ঔপনিবেশিকদের আচরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এবং এমনকি কিছু মধ্যপন্থী ইহুদিবাদী নেতাও সেই সময়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: "এই স্যাডিজম বা যৌন নির্যাতন এটি কেবল ইউরোপীয়দের ঔপনিবেশিক ঔদ্ধত্যের মধ্যেই নিহিত নয় বরং এই মতামতগুলোর মধ্যেও রয়েছে যেগুলো বলে যে আরবরা কেবলমাত্র বলপ্রয়োগের ভাষা বোঝে এবং ইউরোপীয়দের তুলনায় আরববা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে আরও সংবেদনশীল।
সাধারণ নির্যাতন
ইসরাইলি কারাগারে ধর্ষণের খবরে পশ্চিমারা যখন বিস্মিত তখন দখলকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী ইহুদিবাদীরা "নেসেট" এর কিছু সদস্যের সঙ্গে আটক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়েছিল যেখানে এই নয় ধর্ষক কারারক্ষীকে মুক্ত করার জন্য রাখা হয়েছিল। দখলদার শাসকগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন মন্ত্রীও প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনি বন্দীদের লঙ্ঘনকে সমর্থন করেছেন এবং এটিকে একটি বৈধ কাজ বলে মনে করেছেন!
মিডল ইস্ট আই-এর মতে এই রিপোর্টগুলোর বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর বিস্ময় একটি মিথ্যা প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয় কারণ ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা 'বেতসালিম' জানিয়েছে যে সরকার গত বছরের অক্টোবর থেকে বন্দীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত নির্যাতন এবং নির্যাতনের নীতি অনুসরণ করে আসছে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া কারাগারের একজন নিরাপত্তাকর্মী তার মুখ ঢেকে ইহুদিবাদী টিভি চ্যানেল ১৪-এ উপস্থিত হয়েছিল এবং একটি লাইভ প্রোগ্রামে এই অমানবিক কাজের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন। একটু পরে তিনি ভার্চুয়াল স্পেসে তার অ্যাকাউন্টে তার মুখ থেকে মুখোশটি সরিয়ে ফেললেন এবং প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তিনি এবং তার গ্রুপ এসব কর্মের জন্য গর্বিত! কারাগারের রক্ষীদের হাতে ফিলিস্তিনি বন্দীর শ্লীলতাহানির ভিডিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হাতে তুলে দেওয়া ব্যক্তির শাস্তির দাবিও জানিয়েছে ইহুদিবাদী টেলিভিশন। তারা তাকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
বর্ণবাদী নির্যাতন:
ব্রিটিশ মিডিয়া তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ইহুদিবাদী ইসরাইলের এই পদক্ষেপ বিশ্বে নজিরবিহীন নয় বরং এর প্রধান সমর্থকদেরও এই আগ্রাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০০৩ সালে আমেরিকানদের দ্বারা গোয়াান্তামো বে কারাগারে ইরাকি বন্দীদের সাথে অমানবিক আচরণের প্রকাশের পর প্রবীণ সাংবাদিক সেমুর হার্শ প্রকাশ করেছিলেন যে রক্ষণশীল এবং যুদ্ধংদেহী মার্কিনীরা ইরাক আক্রমণের কয়েক মাস আগে আরবদের সংবেদনশীলতার বিষয়টি উত্থাপন করেছিল।
একজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দীর "মর্নিং অফ দ্য মর্নিং" বইটি উল্লেখ করে যেখানে তিনি নির্যাতিত বন্দীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মিডল ইস্ট আই ফিলিস্তিনি উপনিবেশের প্রথম দিকে ইহুদিবাদী এবং ইহুদিবাদী ব্রিটিশদের অপরাধের তার বিবরণ উল্লেখ করে।
সাবেক উপনিবেশবাদীদের নীতি অনুসরণ
পার্সটুডে এবং মিডল ইস্ট আই-এর মতে, ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠীর কারাগারে নির্যাতন নিয়ে পশ্চিমাদের বিস্ময় প্রকাশ যে একটি বানোয়াট এবং মিথ্যা প্রতিক্রিয়া তা প্রমাণে তারা এই সত্যটির দিকে ইঙ্গিত করেছে যে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। আমেরিকান সৈন্যদের দ্বারা ভিয়েতনামী গেরিলা মহিলাদের ধর্ষণের বিষয়টি একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছিল এবং মার্কিন সেনাবাহিনী তাতে সায় দিয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "যে প্রাচ্যবাদী এবং যৌনতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ফিলিস্তিনি বন্দীদের প্রতি ইসরাইল অনুসরণ করছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয়ে আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গিও একই ধরনের ছিল।
মিডল ইস্ট আই অনুসারে,১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের হত্যা এবং তাদের জমি চুরি করা ইহুদিবাদীদের একটি স্থায়ী কৌশলে পরিণত হয়েছে এবং এই বিষয়ে 'তদন্ত' করার অনুরোধ জানিয়েও কোথাও থেকে জবাব পাওয়া যায় নি।
প্রতিবেদনের শেষে ইংরেজি মিডিয়া ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠী এই বিষয়ে তার 'তদন্তে' আবারও আত্মরক্ষার অধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলার মূল্যবোধ ও নীতির উপর জোর দেবে। ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠী ১৯৪৮ সাল থেকেই ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের এই নীতি বজায় রেখে চলেছে। এই অবৈধ শাসক গোষ্ঠী ইহুদিবাদীদের ফিলিস্তিনি জনগণের উপর অত্যাচার করার অনুমতি দিয়েছে এবং এই আচরণের জন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে তারা দায়বদ্ধ নয়।#
পার্সটুডে/এমবিএ/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।