সৌদি প্রীতি বনাম ইরান বিরোধিতা
সৌদি-মার্কিন পরমাণু চুক্তি: ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী নীতির নতুন অধ্যায়
-
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান
পার্সটুডে: সৌদি আরবের সাথে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সাথে একটি বহুপ্রতীক্ষিত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যা দেশটির মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথ উন্মুক্ত করবে।
মার্কিন প্রভাবশালী দুই দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার। চুক্তির অধীনে ওয়াশিংটনের কারিগরি সহায়তায় রিয়াদ বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জন করবে। এর ফলে সৌদি আরবের পারমাণবিক অবকাঠামো তৈরি ও সম্প্রসারণে মার্কিন কোম্পানিগুলো মূল ভূমিকা পালন করবে, যা অন্য যেকোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করে দেবে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবকে পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তরে ট্রাম্পের নীতিগত সম্মতি বৈশ্বিক গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর অজুহাতে রিয়াদ পারমাণবিক প্রযুক্তি চাওয়ার কথা বললেও, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ সংক্রান্ত কঠোর আন্তর্জাতিক আইনের কারণে যেকোনো চূড়ান্ত সমঝোতা মার্কিন কংগ্রেসে কঠিন পর্যালোচনার মুখোমুখি হবে।
চুক্তির একটি প্রধান শর্ত হলো—দুই দেশের যৌথ গবেষণা সফল হলে মার্কিন কোম্পানিগুলো সরাসরি সৌদির মাটিতে একটি পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপন করবে। তবে মার্কিন প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁদের মতে, এই পদক্ষেপটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এখানে মূল আলোচনার বিষয় হলো—পশ্চিম এশিয়ায় পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দ্বিমুখী নীতি। ওয়াশিংটন যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অহেতুক অজুহাত তুলে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির বিরোধিতা করে আসছে, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্রদের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত ও উৎসাহব্যঞ্জক ভূমিকা পালন করছে।
২০১৫ সালের জুনে ইরান ও ৫+১ (P5+1) গোষ্ঠীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পরমাণু সমঝোতা (জেসিপিওএ) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অধীনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কঠোরতম পরিদর্শন ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, ২০১৮ সালের মে মাসে ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যান এবং "সর্বোচ্চ চাপ" প্রয়োগের অংশ হিসেবে ইরানের ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন কোনো প্রমাণ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা স্বয়ং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কখনোই ছিল না। এনপিটি (এনপিটি) চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার আইনগত অধিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই এই অধিকার অস্বীকার করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প এই নীতি আরও আগ্রাসী রূপ দেন। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের সংঘাতের সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তথাকথিত "জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে"র অজুহাতে ইরানের বিরুদ্ধে ৪০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি করলেও, যুদ্ধবিরতির পর এবং ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ থেকে সরে এসেও ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছেন।
সুতরাং সামগ্রিক চিত্রটি পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনে পূর্ণ সমর্থন ও প্রযুক্তি সরবরাহ করছে, অন্যদিকে একই ধরনের বেসামরিক কার্যক্রমের জন্য অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস ও বন্ধের চেষ্টা করে চলেছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/২৩