গাজা গণহত্যার মাঝেও ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠাচ্ছে ভারত: অ্যামনেস্টির তথ্য
-
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও নরেন্দ্র মোদি
পার্সটুডে: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ভারতের সরবরাহ করা অস্ত্র ব্যবহৃত হওয়ার 'যথেষ্ট ঝুঁকি' থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠনটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে এবং ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমকে সহায়তাকারী অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অ্যামনেস্টির "The Supply of Weapons and Ammunition to Israel" শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ভারত থেকে ইসরায়েলে পাঠানো অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও সামরিক উপাদানের ২ হাজার ৫৯৬টি চালান বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলি সামরিক সরবরাহকারীদের কাছে অন্তত ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, বিস্ফোরক অস্ত্রের ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি উপাদান এবং সামরিক যানবাহনের ২৯৮টি উপাদান সরবরাহ করেছে।
অ্যামনেস্টি বলেছে, এসব তথ্য তারা বাণিজ্যিক চালানের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে। সংস্থাটির দাবি, ভারত থেকে পাঠানো এসব অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও সামরিক উপাদান এমন ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গেছে, যারা দেশটির সেনাবাহিনীকে সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
মানবাধিকার সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা বেসামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকা চালানগুলো বিশ্লেষণ থেকে বাদ দিয়েছে। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হারমোনাইজড সিস্টেম (HS Code) অনুযায়ী অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির তথ্য পর্যালোচনা করেছে।
এর আগে আল জাজিরা ২০২৪ সালে ইসরায়েলে অস্ত্র সম্পর্কিত ভারতীয় রপ্তানি চালানের ৯১টি কাস্টমস নথি প্রকাশ করেছিল। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ৯৩০৬৯০০০ কোডের আওতায় থাকা পণ্যের মধ্যে বোমা ও গ্রেনেডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এসব নথিতে দেখা যায়, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অস্ত্রের উপাদান রপ্তানি করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা চলার পরও ভারতের ইসরায়েলি সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারত গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইসরায়েলে স্থানান্তরিত অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্ত্র রপ্তানি আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে ভারত ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভারত-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সম্পর্ক
ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতের মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ২৯ শতাংশ এসেছে ইসরায়েল থেকে।
একই সময়ে ভারত ইসরায়েলের অন্যতম বড় অস্ত্র বাজার হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। ভারতের অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে রাশিয়া ৪০ শতাংশ এবং ফ্রান্স ২৯ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে থাকলেও ইসরায়েল ছিল গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশগুলোর একটি।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ভারত ও ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে সামরিক, প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পদক্ষেপের মধ্যেও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক হতাহত এবং অস্ত্র সরবরাহের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩০