ইয়াহিয়া সিনওয়ার: ফিলিস্তিনি জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অমর কিংবদন্তি
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i163984-ইয়াহিয়া_সিনওয়ার_ফিলিস্তিনি_জাতির_মুক্তিসংগ্রামের_ইতিহাসে_এক_অমর_কিংবদন্তি
পার্সটুডে: ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড দখলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিশেষ ভূমিকার কারণে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক অমর কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন।
(last modified 2026-10-16T12:19:26+00:00 )
অক্টোবর ১৬, ২০২৬ ১৮:১৬ Asia/Dhaka
  • শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার
    শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার

পার্সটুডে: ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড দখলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিশেষ ভূমিকার কারণে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক অমর কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন।

ইরনার বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, আজ ১৬ অক্টোবর হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের শাহাদাতের দ্বিতীয় বার্ষিকী। ইসলামী বিশ্বসহ বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষ এমন এক ব্যক্তির শাহাদাত স্মরণ করছে, যার নাম গাজার ভূখণ্ড এবং ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

‘আবু ইব্রাহিম’ নামে পরিচিত ইয়াহিয়া সিনওয়ার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণ এবং বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের স্মৃতিতে তাঁর নাম চিরকাল বেঁচে থাকবে।

শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ারের কাহিনি কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি এমন এক জনগোষ্ঠীর গল্প, যারা নির্মম যুদ্ধের মুখেও নিজেদের ভূখণ্ড, পরিচয় ও স্বাধীনতার অধিকারের প্রতি দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থেকেছে।

গাজার এই জনগোষ্ঠী নিজেদের বিশ্বাস ও লক্ষ্যের জন্য চড়া মূল্য দিয়েছে। এ পথে তারা এমনভাবে সন্তানদের হারিয়েছে, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন।

একজন কমান্ডার কিংবা নেতা শহীদ হতে পারেন, কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আদর্শ বিলীন হয়ে যায় না। তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।

ইয়াহিয়া সিনওয়ারের প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে, তাঁর শাহাদাতের পর ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের একাংশও স্বীকার করেন, আবু ইব্রাহিম এক অর্থে লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁদের মতে, তিনি কয়েক প্রজন্ম ধরে ইসরায়েলিদের মোকাবিলায় প্রভাব ফেলেছেন এবং দেশটিকে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

এসব বিশ্লেষকের মতে, সিনওয়ার তাঁর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যুকে আবারও বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতির নতুন ঢেউ সৃষ্টি হয়।

আবু ইব্রাহিমের শাহাদাতের দুই বছর পরও ফিলিস্তিনিরা দেখিয়েছেন, নেতা ও কমান্ডারদের শাহাদাতে ফিলিস্তিন প্রশ্নের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়। তাঁদের পথচলা অব্যাহত রয়েছে। দখলদারদের ধ্বংসযজ্ঞ ও অপরাধ সত্ত্বেও গাজাকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না, কারণ সেখানে এমন এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা নিজেদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার।

দুর্দশাগ্রস্ত এই মানুষগুলো এখনো নিজেদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন। তাঁরা সংগ্রাম এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।

ফিলিস্তিন কোনো একক নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার অস্তিত্ব মুছে ফেলার সব প্রচেষ্টার চেয়েও তার পরিচয় দীর্ঘস্থায়ী। ফিলিস্তিনি জনগণের কাহিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।

ইয়াহিয়া সিনওয়ারের জীবন ও সংগ্রাম

শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার ১৯ অক্টোবর ১৯৬২ সালে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শহরের একটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং আরবি ভাষায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮৮ সালের ২০ জানুয়ারি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। জীবনের ২৩ বছর তিনি কারাগারে কাটান।

কারাগারে থাকাকালে সিনওয়ার হিব্রু ভাষা শেখেন। এ সময় তিনি বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক ও সাহিত্যকর্ম অনুবাদ ও রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ২০০৪ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘কাঁটা ও কার্নেশন’ এবং ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘মহিমা’।

২০১১ সালের ১১ অক্টোবর হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দির সঙ্গে সিনওয়ারও মুক্তি পান। ২০১২ সালে তিনি হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হন এবং ২০১৭ সালে গাজা উপত্যকায় সংগঠনটির রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সংগঠনটির শুরা কাউন্সিল সিনওয়ারকে নতুন রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে সিনওয়ার ছিলেন ‘অপারেশন তুফান আল-আকসা’র মূল পরিকল্পনাকারী। সে কারণে তাঁকে ইসরায়েলের হত্যার লক্ষ্যবস্তুর তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর গাজার তেল আল-সুলতান এলাকায় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ৮২৮তম ইউনিটের সংঘর্ষের সময় সিনওয়ার যে ভবনে অবস্থান করছিলেন, সেটি ট্যাংকের গোলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আহত হওয়ার পর সিনওয়ার তাঁর দেহরক্ষী মাহমুদ হামদানের সঙ্গে ওই ভবনে আশ্রয় নেন। শাহাদাতের আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যান।#

পার্সটুডে/এমএআর/১৬