ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী পদক্ষেপ: জাতিসংঘের সতর্কতা কেন?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i154524-ট্রাম্পের_অভিবাসন_বিরোধী_পদক্ষেপ_জাতিসংঘের_সতর্কতা_কেন
পার্সটুডে–ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘ।
(last modified 2025-11-29T13:19:03+00:00 )
নভেম্বর ২৯, ২০২৫ ১৬:০৩ Asia/Dhaka
  •  ট্রাম্প আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন
    ট্রাম্প আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন

পার্সটুডে–ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘ।

পার্সটুডে আরও জানায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প "তৃতীয় বিশ্বের সকল দেশ থেকে স্থায়ীভাবে অভিবাসন স্থগিত করার" ইচ্ছা প্রকাশ করার পর, জাতিসংঘ শরণার্থী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মান ও নীতিমালা মেনে চলতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

হোয়াইট হাউজের কাছে এক আফগানির গুলিতে দেশটির দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যের একজনের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ওই ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন: প্রযুক্তির অগ্রগতি সত্ত্বেও, অভিবাসন নীতি এই অর্জনগুলোকে ধ্বংস করেছে এবং অনেকের জীবনযাত্রার অবস্থা আরও খারাপ করেছে। আমি তৃতীয় বিশ্বের সকল দেশ থেকে অভিবাসন স্থায়ীভাবে স্থগিত করব যাতে আমেরিকার সকল ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করা যায়।" ট্রাম্প বাইডেন প্রশাসনের সময় কার্যকর করা একাধিক অভিবাসন নীতিও বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন: যে কোনও বিদেশী নাগরিক যিনি আর্থিক বোঝা বা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি কিংবা যার মনোভাব পশ্চিমা সভ্যতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে প্রমাণিত হবে-তাকে নির্বাসিত করা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে আফগান পাসপোর্টধারী সকল ব্যক্তির ভিসা প্রদান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের নতুন বিবৃতি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো যখন তার প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং আসন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা মার্কিন রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। জাতিসংঘের পাশাপাশি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির মানবিক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়, জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স সাংবাদিকদের বলেন: ব্যতিক্রম ছাড়া সকল দেশেরই মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, বিশেষ করে যখন তাদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া লোকদের সুরক্ষার কথা আসে। এই ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে এবং তাদের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা উচিত।"

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র ইউজিন বিয়নও এই বার্তার পুনরাবৃত্তি করে বলেন: দেশগুলোকে সুরক্ষা প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন: যখন সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো লোক কোনও দেশে প্রবেশ করে, তখন তাদের অবশ্যই একটি আইনি আশ্রয় প্রক্রিয়া প্রদান করতে হবে এবং দেশে প্রবেশাধিকার থাকতে হবে।

জাতিসংঘ ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন বিরোধী বক্তব্য এবং পরিকল্পনা, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে স্থায়ীভাবে অভিবাসন বন্ধ করার ব্যাপারে তার পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়ায় সতর্ক করেছে। এই সতর্কীকরণের মূল কারণ হল এ ধরনের নীতি মানবাধিকার এবং শরণার্থী সুরক্ষা সম্পর্কিত কনভেনশনের ক্ষেত্রে আমেরিকার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার স্পষ্টভাবে বিরোধিতা করে এবং নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিণতি ঘটাতে পারে। জাতিসংঘ জোর দিয়ে বলেছে প্রতিটি দেশ শরণার্থী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষার বিশ্বব্যাপী মান মেনে চলতে বাধ্য এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার অজুহাতে মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করতে পারে না।

এই সতর্কীকরণের কারণগুলো একাধিক। প্রথমত, ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী নীতিগুলো নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি অভিবাসনকে বর্ধিত অপরাধ, শ্রমবাজারের উপর চাপ এবং আমেরিকার জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। কিন্তু জাতিসংঘ বিশ্বাস করে যে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি একতরফা এবং অবাস্তব। অভিবাসীরা কেবল হুমকি নয় বরং অনেক দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে অবদান রেখেছে। দ্বিতীয়ত, এই নীতিগুলো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে পরিচালিত করতে পারে। অনেক অভিবাসী যুদ্ধ, দারিদ্র্য বা রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসছে এবং তাদের আশ্রয়ের অধিকার অস্বীকার করা মানব মর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা। তৃতীয়ত, এই পদ্ধতির আন্তর্জাতিক পরিণতি রয়েছে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে, তার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে, তাহলে অন্যান্য দেশও অভিবাসন সীমিত করার অজুহাত খুঁজে পেতে পারে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সংকট দেখা দিতে পারে।

ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী নীতির পরিণতিগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। অভ্যন্তরীণভাবে, এই নীতি অভিবাসী শ্রমশক্তি হ্রাস করতে পারে, যা আমেরিকার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষি, পরিষেবা এবং প্রযুক্তি খাতগুলো অভিবাসী কর্মীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ অর্থনৈতিক স্থবিরতাসহ ব্যয় বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করতে পারে। সামাজিক স্তরে, এই জাতীয় নীতি জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজনকে আরও গভীর করবে এবং সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য ও অবিশ্বাস বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক স্তরে, এ ধরণের পদ্ধতি গ্রহণের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে এবং মিত্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে তার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জাতিসংঘের সতর্কতা ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী নীতির পরিণতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগকেও প্রতিফলিত করে। এই সতর্কতা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, সমস্ত দেশকে মনে করিয়ে দেয় যে অভিবাসন একটি বিশ্বব্যাপী বাস্তবতা এবং কঠোর ও অমানবিক নীতি দিয়ে এটি বন্ধ করা যাবে না। আসল সমাধান হল অভিবাসনকে বিচক্ষণতার সাথে পরিচালনা করা, শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা করা এবং যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের মতো জোরপূর্বক অভিবাসনকে চালিত করার মতো কারণগুলো হ্রাস করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা।

পরিশেষে, এটা বলতে হবে যে ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী নীতিগুলো, যদিও স্বল্পমেয়াদে কিছু নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করতে পারে, মানবাধিকার, বিশ্ব অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার আন্তর্জাতিক খ্যাতির জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করবে। বিশ্ব শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে-এমন পদ্ধতির বিস্তার রোধ করার জন্য জাতিসংঘের সতর্কতা ঠিক এই ভিত্তিতেই জারি করা হয়েছে।#

পার্সটুডে/এনএম/২৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।