ট্রাম্প কি গ্রিনল্যান্ডে নিরাপত্তা খুঁজছে নাকি কৌশলগত সম্পদ?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i155472-ট্রাম্প_কি_গ্রিনল্যান্ডে_নিরাপত্তা_খুঁজছে_নাকি_কৌশলগত_সম্পদ
পার্সটুডে-গ্রিনল্যান্ড মামলা কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি আমেরিকার একতরফা নীতি এবং একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি স্পষ্ট প্রতীক।
(last modified 2025-12-27T11:23:17+00:00 )
ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫ ১৯:০৪ Asia/Dhaka
  • গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা
    গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা

পার্সটুডে-গ্রিনল্যান্ড মামলা কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি আমেরিকার একতরফা নীতি এবং একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি স্পষ্ট প্রতীক।

কয়েক দশক আগে পর্যন্ত, গ্রিনল্যান্ডকে একটি প্রত্যন্ত, হিমায়িত এবং বিচ্ছিন্ন জনবহুল অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করা হত যার একমাত্র গুরুত্ব উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে এর বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আবহাওয়া পরিবর্তন, মেরু বরফ গলে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিশ্ব শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এই দ্বীপটিকে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বিন্দুতে পরিণত করেছে। মেহরের উদ্ধৃতি দিয়ে পার্সটুডে আরও জানায়, গ্রিনল্যান্ডে আজ কেবল নতুন জাহাজ চলাচলের পথই নেই বরং বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুসারে, উন্নত শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল উপাদান, কৌশলগত ধাতু এবং খনিজ সম্পদেরও উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে আমেরিকার সরাসরি জড়িত থাকা, "মালিকানা" এবং "অধিগ্রহণের" ধারণাগুলোকে তুলে ধরা অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইউরোপের জন্য, গ্রিনল্যান্ড কেবল একটি ভূখণ্ড নয় বরং মহাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ; জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং চাপ ও হুমকির মাধ্যমে সীমান্ত পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি; কূটনীতি নাকি রাজনৈতিক চাপ?

গ্রিনল্যান্ডে "বিশেষ প্রতিনিধি" নিয়োগের ব্যাপারে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত একটি প্রতীকী কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কূটনৈতিক অনুশীলনে এই পদক্ষেপ সাধারণত সংকট-কবলিত অঞ্চল বা জটিল সম্পর্কযুক্ত দেশগুলোর জন্য করা হয়, এমন কোনও অঞ্চলের জন্য নয় যা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মার্কিন মিত্রের সার্বভৌমত্বের অধীনে। এর ফলে ডেনিশ কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে হস্তক্ষেপমূলক এবং অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন।

"গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা" সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য বিবৃতি কার্যত সমস্ত সন্দেহ দূর করে দেয় এবং প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা সহযোগিতার বাইরে। এই পদক্ষেপ কেবল ডেনিশ সার্বভৌমত্বের নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না বরং বিশ্বকেও একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত স্বার্থ নিশ্চিত দেখলে এমনকি তার মিত্রদের ওপরও চাপ প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক।

সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক ভারসাম্য রক্ষা: ইউরোপের প্রতিক্রিয়া

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের ব্যাপারে ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত, স্পষ্ট এবং সিদ্ধান্তমূলক। "গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়" এই কথা জোর দিয়ে দেশটির কর্মকর্তারা বৈধ সহযোগিতা এবং অবৈধ হস্তক্ষেপের মধ্যে একটি স্পষ্ট রেখা টানার চেষ্টা করেছিলেন। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, এই অবস্থান একতরফা মার্কিন নীতির প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে ইউরোপের গভীর উদ্বেগকেই প্রতিফলিত করে; ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও ওই নীতি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কে বারবার উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বিষয়টি কেবল গ্রিনল্যান্ড নয়; এটি আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধার নীতি। আজ যদি ডেনমার্কের ওপর এ ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয় তবে আগামীকাল তারা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ বা বিশ্বের সংবেদনশীল অন্যান্য অঞ্চলেও প্রয়োগ করতে পারে। অতএব, গ্রিনল্যান্ড মামলা "ক্ষমতা-কেন্দ্রিক" আমেরিকার যুক্তির বিরুদ্ধে ইউরোপের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মনরো মতবাদ এবং একটি পুরোণো যুক্তির পুনরুৎপাদন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ট্রাম্পের নীতিকে "মনরো মতবাদ" এর ব্যবহারিক পুনরুজ্জীবনের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে এটি এমন এক মতবাদ যা উনিশ শতকে তার সীমানা অঞ্চলের ওপর আমেরিকার আধিপত্যকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য গঠিত হয়েছিল। যদিও আজকের বিশ্ব সেই যুগ থেকে মৌলিকভাবে আলাদা, তবু বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলার প্রাচীন নীতি-প্রবণতা তাদের মাথা থেকে এখনও সরে যায় নি।

প্রাকৃতিক সম্পদ; সংকটের নেপথ্য কারণ

যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা নিরাপত্তা কিংবা অর্থনৈতিক সহযোগিতার আঙ্গিকে তাদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, বাস্তবতা হল গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ এই সমীকরণে একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। দ্বীপের বিরল মাটির উপাদান এবং কৌশলগত ধাতু, উচ্চ-প্রযুক্তির শিল্প, নতুন শক্তি এবং এমনকি সামরিক ক্ষেত্রের জন্য অত্যাবশ্যক। বর্তমান বিশ্বে এই দুর্লভ সম্পদের সরবরাহ নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হচ্ছে।

ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি ঠিক সেই বিন্দু যেখানে মার্কিন নীতি, বৈধ সহযোগিতা থেকে ভূ-রাজনৈতিক চাপে পরিণত হয়। একটি অঞ্চলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, তার রাজনৈতিক ইচ্ছা নির্বিশেষে, স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নীতিগুলোকে উপেক্ষা করার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

গ্রিনল্যান্ড সংকটের ট্রান্স-আটলান্টিক প্রভাব

গ্রিনল্যান্ড ফাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় সম্পর্কের মাঝে গভীর ফাটল সৃষ্টি করেছে। এই সংকট প্রমাণ করে ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যেও, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং স্বার্থের মতো ধারণাগুলোর কোনও সাধারণ ধারণা নেই। গ্রিনল্যান্ড ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।#

পার্সটুডে/এনএম/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন