ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা; ল্যাটিন আমেরিকায় ক্ষমতার জন্য ট্রাম্পের নতুন পদক্ষেপ
-
ভেনেজুয়েলার ওপর আমেরিকার হামলা; ল্যাটিন আমেরিকায় ক্ষমতার জন্য ট্রাম্পের নতুন পদক্ষেপ
পার্সটুডে-ভেনেজুয়েলায়-আমেরিকা হামলা চালিয়ে দাবি করেছে যে দেশটির প্রেসিডেন্ট 'নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে ভেনেজুয়েলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় হামলার সময় বিমানবন্দরসহ কয়েকটি অবকাঠামোতে বোমা হামলা চালায়। আর তখনই মার্কিন দাবি যে, তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। অভিযানের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে অভিযানকে 'সফল] বলে অভিহিত করেছেন এবং এটিকে মাদুরো শাসনের অবসান বলে মনে করেছেন।
পার্সটুডে জানিয়েছে, এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে নেওয়া হলো যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক প্রচারণা চালিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে, তিনি মাদুরোর বিরোধীদের ওপর সরকারের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যুত্থান, হুমকি এবং সমর্থনতে কাজে লাগিয়েছে। মূলত ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এবং জনগণকে মাদুরোর সরকারের বিরুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার জন্য ট্রাম্প দেশটির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল।
গত কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ক্যারিবিয়ান জলসীমায় মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে উপস্থিত ছিল এবং আমেরিকা বারবার ভেনেজুয়েলাকে সামরিক আক্রমণের হুমকি দিয়ে যচ্ছিল। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ সেদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন; আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই একটি বিদেশী শক্তি একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করা আন্তর্জাতিক নিয়মের বৈধতাকে দৃঢ়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ প্রসঙ্গে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন সামরিক হামলা এবং দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাতের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন সামরিক আক্রমণ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশেষ করে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধকরণ এবং 'আগ্রাসনের কাজ'-এর ওপর ভিত্তি করে সনদের ধারা ৪, অনুচ্ছেদ ২- এ বলা হয়েছে, এটি জাতিসংঘে আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত সব রাষ্ট্রকে অবিলম্বে নিন্দা জানাতে হবে।
আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় শুধু হামলাই চালায়নি একই সাথে তাদের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদের ধারক হিসেবে ভেনেজুয়েলা জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দেশে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব বিশ্ব তেল বাজারে পড়তে পারে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত এবং অনুমোদিত ব্যক্তিকে দিয়ে দেয় তাহলে তারা সহজেই ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। দেশটি কেবল তার প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশ সরবরাহই করে না বরং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার এবং বিশ্বব্যাপী তেলের দাম নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণও নিতে পারে।
এই প্রসঙ্গে, ভেনেজুয়েলার সাবেক তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেজ বলেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে এবং মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য হল মার্কিন এবং পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলিকে এই দেশে ফিরিয়ে আনা।' এছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন তার এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, ভেনেজুয়েলায় তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কারাকাসে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন করে রূপ দিতে পারে।' এই স্বীকারোক্তিগুলি স্পষ্ট করে যে, আমেরিকার বর্তমান আক্রমণের একটি কারণ ওয়াশিংটন যাকে ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বাধীনতা বলে অভিহিত করে তা নয় বরং তেল সম্পদ অর্জন এবং এই দেশে আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তি সুসংহত করা।
ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলি যেমন স্পষ্ট তেমনি রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা লক্ষ্যগুলি ওয়াশিংটনের কাছেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে, আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলাকে ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ফিরিয়ে আনার এবং মনরো মতবাদ বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখে আসছে। এখন ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করে আমেরিকা তার উপস্থিতি বৃদ্ধি করার এবং এই অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলির উপস্থিতি রোধ করার চেষ্টা করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আবারও প্রমাণ করেছে যে, ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ববাদী এবং উপনিবেশবাদী নীতি কেবল ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাই বিনষ্ট করেনি বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাও হুমকিতে ফেলেছে। ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন হামলা স্পষ্টত আগ্রাসনের একটি উদাহরণ। আর এর পরিণতি ভেনেজুয়েলার সীমানা ছাড়িয়ে যাবে।
এই ধরনের আন্তর্জাতিক রীতি লঙ্ঘনের মুখে নীরব থাকা মানে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলির ধ্বংসকে মেনে নেওয়া এবং অন্যান্য দেশে এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির পথও প্রশস্ত করা। বিশ্বকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার নিন্দা করতে হবে এবং আমেরিকার জবরদস্তিমূলক নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। কারণ কেবলমাত্র সম্মিলিত প্রতিরোধই আধুনিক উপনিবেশবাদের বিস্তার এবং বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি রোধ করতে পারে। এই আক্রমণ কোনও সরকারের সমাপ্তি নয় বরং আমেরিকান আধিপত্যের একটি নতুন পর্বের সূচনা। যদি আমেরিকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির একটি কঠোর সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি না হয় তাহলে বিশ্ব ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়তে পারে।#
পার্সটুডে/জিএআর/৪