ইসরায়েল আবারও গোটা বিশ্বকেই ক্ষুব্ধ করে তুললো
পার্সটুডে- দখলদার ইসরায়েলের পশ্চিম তীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করার মাধ্যমে দখলদার ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভা আবারও গোটা বিশ্বকেই ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
রোববার ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভা একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমের মতে দখলকৃত পশ্চিম তীরের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে এবং ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পথ আরও সুগম করবে। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন রয়েছে: ১৯৬৭ সালের আগের সেই পুরোনো আইন বাতিল করা, যা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি নয় এমন ব্যক্তিদের কাছে জমি বিক্রি সীমিত করত; জমি কেনার আগে লেনদেনের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং পশ্চিম তীরে সম্পত্তি নিবন্ধনকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল, যাতে ইসরায়েলি ক্রেতারা মালিকদের সহজে শনাক্ত করতে পারেন।
এছাড়াও নিউইয়র্ক টাইমস ও টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দখলদার ইসরায়েল অসলো চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনি স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনের আওতাভুক্ত অঞ্চল 'এ' ও 'বি' এর কিছু অংশে বিশেষ করে পানি, পরিবেশ ও প্রত্নতত্ত্ব খাতে নিজের নির্বাহী ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: কারা নিন্দা করেছে এবং কী বলেছে?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
আল-জাজিরা ও আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্পষ্ট ভাষায় এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছে। ইইউর মুখপাত্র আনোয়ার আল-আউনি বলেছেন, “এটি ভুল পথে আরেকটি পদক্ষেপ।”
ব্রিটেন
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকার সবচেয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছে:
“পশ্চিম তীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে ব্রিটেন তীব্রভাবে নিন্দা জানিয়েছে।” “ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত কাঠামো একতরফাভাবে পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। আমরা ইসরায়েলকে অবিলম্বে এসব সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানাই।”
যুক্তরাষ্ট্র
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম তীর সংযুক্তির বিরোধী। তিনি বলেন, “একটি স্থিতিশীল পশ্চিম তীর ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক এবং আঞ্চলিক শান্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
এই অবস্থানকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সংযুক্তির পথ থেকে কিছুটা দূরে সরে আসা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
জাতিসংঘ
নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে অবৈধ বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এসব সিদ্ধান্ত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়। তিনি আরও বলেন, এসব পদক্ষেপ বিশ্বকে শান্তি থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
আরব ও মুসলিম দেশসমূহ (যৌথ বিবৃতি)
টাইমস অব ইসরায়েল ও দ্য মিডিয়া লাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটটি দেশ মিশর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া যৌথ বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, “এই পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য অবৈধভাবে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়া, বসতি স্থাপন আরও জোরদার করা এবং পশ্চিম তীরের অবৈধ সংযুক্তি দ্রুততর করা, যার ফল হবে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি।”
স্পেন
আল-জাজিরার মতে, স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছে এবং এই বলে সতর্ক করেছে যে, এটি সহিংসতার নতুন ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে। স্পেন ইসরায়েলকে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের অধীনে তার অঙ্গীকার মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বশাসন কর্তৃপক্ষ
টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, মাহমুদ আব্বাসের দপ্তর এই সিদ্ধান্তগুলোকে অবৈধ ও বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। আব্বাসের উপপ্রধান হুসেইন আল-শেইখ বলেছেন, এসব পদক্ষেপ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংস করে এবং অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।
হামাস
দ্য মিডিয়া লাইন হামাসের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছে। হামাস এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে। তারা আঞ্চলিক দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে এবং পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি যুবকদের প্রতিরোধ জোরদার করার ডাক দিয়েছে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভার নতুন সিদ্ধান্ত কার্যত পশ্চিম তীরের ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণের পরিসর বাড়িয়েছে এবং জমি ক্রয় ও বসতি সম্প্রসারণকে আরও সহজ করেছে। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে: ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, স্পেন, জাতিসংঘ এবং আটটি আরব ও মুসলিম দেশ এর নিন্দা জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বশাসন কর্তৃপক্ষ একে অবৈধ বলেছে এবং হামাস প্রতিরোধ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।#
পার্সটুডে/এসএ/১০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।