পুঁজিবাদ ও সামাজিক অস্থিরতা
https://parstoday.ir/bn/news/world-i156892-পুঁজিবাদ_ও_সামাজিক_অস্থিরতা
পার্সটুডে: পুঁজিবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার সম্পর্ক মানবিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
(last modified 2026-02-10T13:29:28+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬ ১৯:২৩ Asia/Dhaka
  • ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হওয়ার অভিযোগে ম্যাকডোনাল্ডসের পণ্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
    ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হওয়ার অভিযোগে ম্যাকডোনাল্ডসের পণ্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

পার্সটুডে: পুঁজিবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার সম্পর্ক মানবিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

পার্সটুডে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার সম্পর্ক অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন শাস্ত্রে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়। পুঁজিবাদ বা পুঁজিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমন একটি কাঠামো, যেখানে ব্যক্তিমালিকানা, মুক্তবাজার ও পুঁজি সঞ্চয় মূল ভূমিকা পালন করে। ইতিহাসের ধারায় এই ব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে একই সঙ্গে এই ব্যবস্থাই বাস্তবে বৈষম্য, সামাজিক উত্তেজনা এবং শেষ পর্যন্ত সমাজে অস্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

পুঁজিবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ ও সুযোগের বণ্টন সাধারণত সমাজের সবস্তরের মানুষের মধ্যে সমানভাবে হয় না। যাদের কাছে প্রাথমিক পুঁজি, ভালো শিক্ষা বা সম্পদের ওপর বেশি প্রবেশাধিকার থাকে, তারা দ্রুত উন্নতি করে এবং বেশি সম্পদ অর্জন করে। অন্যদিকে, দরিদ্র ও পুঁজিহীন শ্রেণির মানুষ অনেক সময় দারিদ্র্য ও বঞ্চনার একটি স্থায়ী চক্রের মধ্যে আটকে থাকে। এই শ্রেণিবৈষম্য যখন অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায়, তখন সমাজে অবিচারের অনুভূতি শক্তিশালী হয় এবং সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও দ্রুত অর্থনৈতিক পরিবর্তন। পুঁজিবাদ মূলত প্রতিযোগিতা, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। মুনাফা বাড়ানোর জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমায়, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাই করে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী পেশা বিলুপ্ত হয় এবং শ্রমিক শ্রেণি ও মধ্যবিত্তের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যখন মানুষ অনুভব করে যে তাদের চাকরির নিরাপত্তা নেই এবং সামাজিক উন্নতির সুযোগ কমে যাচ্ছে, তখন সমাজে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও উত্তেজনা বেড়ে যায়।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা আরও দেখিয়েছে যে, অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণেও রূপ নিতে পারে। অনেক সমাজে বড় বড় করপোরেশন ও ধনকুবেররা নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের স্বার্থে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। এর ফলে সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, তাদের কণ্ঠস্বর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হচ্ছে না। এর পরিণতিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়, যা সামাজিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ হয়ে ওঠে।

এছাড়াও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সময় সময় যে, অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়, তা সামাজিক অস্থিরতা আরও তীব্র করে তোলে। মন্দা, মুদ্রামূল্যের অবনমন, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক প্রতিবাদ, ব্যাপক অভিবাসন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতাও বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় অর্থনৈতিক সংকটগুলো প্রায়ই বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে।

তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, পুঁজিবাদ নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে- এমনটি নয়। বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের কিছু দেশে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, পুনর্বণ্টনমূলক নীতি এবং শক্তিশালী শ্রম আইন পুঁজিবাদের নেতিবাচক প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পেরেছে। ন্যায়সংগত করব্যবস্থা, সবার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমানো সম্ভব হয়েছে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ বাজারভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক নীতির সমন্বয় সামাজিক উত্তেজনা হ্রাস করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, পুঁজিবাদ যা অনেক ক্ষেত্রে পুঁজিতন্ত্রে রূপ নেয় এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেকার সম্পর্ক একটি জটিল ও বহুমুখী সম্পর্ক। এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে, অন্যদিকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণ ছাড়া তা বৈষম্য, শ্রেণিভেদ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে। মূল বিষয় হলো—এই ব্যবস্থাকে কীভাবে আইন, নীতি ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে এমনভাবে পরিচালিত করা হয়, যাতে সামাজিক ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। শুধুমাত্র তখনই পুঁজিবাদের সুফল পাওয়া সম্ভব এবং একই সঙ্গে এর অস্থিতিশীলতাসৃষ্টিকারী প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।#

পার্সটুডে/এমএআর/১০