ধর্ষণ সভ্যতা: পাশ্চাত্যে নারী ও শিশু অধিকার হরণের এক অবিশ্বাস্য চিত্র
-
২৯ বছর বয়সী মারিয়াস বোর্গ হুইবের বিরুদ্ধে ৩৮টি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে
পার্সটুডে- জেফ্রি এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপগুলো থেকে শুরু করে অসলো আদালত এবং নরওয়ের যুবরাজ্ঞীর ছেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ—যৌন কেলেঙ্কারি, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তির ধারাবাহিকতা বর্তমান পশ্চিমা বিশ্বের এক উদ্বেগজনক চিত্রে তুলে ধরে। এটি এমন এক সভ্যতা, যেখানে রয়েছে অসংখ্য দার্শনিক ও রয়েছে ঝলমলে মানবাধিকার আইন এবং তারা বিশ্বে নৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের দাবি করে আসলেও বাস্তবে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—শারীরিক নিরাপত্তা ও নারীর মর্যাদা—রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পশ্চিমে কী ঘটছে?” এই প্রশ্নটি আর কোনো বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল নয়; বরং এটি একটি গুরুতর নৈতিক ও রাজনৈতিক দাবি হয়ে উঠেছে। যে সভ্যতা কয়েক দশক ধরে মানবাধিকার, নারীর স্বাধীনতা ও মানব মর্যাদার স্লোগান সামনে রেখে বিশ্বকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, আজ সেই সভ্যতাই অসংখ্য ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা এবং নারীদের কাঠামোগতভাবে নিপীড়নের মামলার সামনে অর্থবহ নীরবতা বা অসহায়ত্ব প্রদর্শন করছে।
নরওয়ের যুবরাজ্ঞীর ছেলে মারিয়ুস বর্গ হোইবির বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ বহু মামলা এই বৈপরীত্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৮টি ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে—এর মধ্যে চার নারীকে ধর্ষণ, নারী সঙ্গীর বিরুদ্ধে চরম সহিংসতা, হুমকি, সম্পত্তি ধ্বংস, মাদক সেবন ও বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। এসব অভিযোগের কিছু এমন নারীদের ধর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত, যারা ঘুমন্ত বা অক্ষম অবস্থায় ছিলেন—যা নরওয়ের আইনে স্পষ্টভাবে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হলেও পশ্চিমা জনমত ও গণমাধ্যমে প্রায়ই আরও নরম ও নিরপেক্ষ শব্দে ননা বয়ান তুলে ধরা হচ্ছে।
কিন্তু মূল বিষয় শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নন—মূল প্রশ্ন হলো ক্ষমতার অবস্থান। এই অভিযোগগুলো ঘটেছে নরওয়ের রাজপরিবারের সরকারি বাসভবনে; যে প্রতিষ্ঠানটি “নৈতিকতা”, “দায়িত্ব” ও “সামাজিক আদর্শ”-এর প্রতীক হওয়ার কথা ছিল। অথচ যখন ভুক্তভোগীদের শত শত সাংবাদিকের সামনে নিজেদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষত আবারও উন্মোচন করতে হয়, তখন রাজপরিবার দূরত্ব বজায় রাখে, অনুপস্থিত থাকে এবং নীরবতাকেই “সংকট ব্যবস্থাপনা” বলে আখ্যা দেয়।
কিন্তু বিষয়টি শুধু নরওয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জেফ্রি এপস্টেইনের নাম গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে—এপস্টেইন এমন এক ব্যক্তি যিনি রাজনীতিবিদ, রাজপুত্র, বিলিয়নেয়ার এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর যৌন অনাচারের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। প্রিন্স অ্যান্ড্রু থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাজনীতি ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু ব্যক্তিত্বের নাম এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এপস্টেইন মারা গেছে, কিন্তু সে যে ভিত্তি ও কাগামো গড়ে দিয়ে গেছে তা টিকে রয়েছে।
নরওয়ের যুবরাজ্ঞীর নাম জেফ্রি এপস্টেইনের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, নরওয়ের যুবরাজের স্ত্রী মেত্তে-মারিতের সরকারি অ্যাকাউন্ট ও এপস্টাইনের মধ্যে একাধিক ইমেইল আদান-প্রদান হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এমনকি পাম বিচে তার বাড়িতে চার রাত অবস্থান করেন—যদিও বলা হয়, সে সময় এপস্টাইন নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
একটি ইমেইলে এপস্টেইন “স্ত্রী খোঁজা”-র কথা বলেন, আর অন্য ইমেইলগুলোতে যোগাযোগের ভাষা এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, নরওয়ের যুবরাজের স্ত্রী তাকে লেখেন: “তুমি আমার মস্তিষ্ককে সুড়সুড়ি দাও।” পরে রাজপরিবার এই সম্পর্ককে “ভুল বিচার” ও “লজ্জাজনক” বলে অভিহিত করে এবং এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের প্রতি সমবেদনা জানায়। কিন্তু মূল প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত: কীভাবে মানবাধিকারের দাবিদার একটি দেশের সর্বোচ্চ নৈতিক প্রতীক, বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত যৌন নিপীড়কের সঙ্গে এমন সম্পর্ক রাখতে পারে?
এগুলো কোনো “ব্যক্তিগত বিচ্যুতি” নয়; এগুলো একটি ধারা। যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইন, যুক্তরাজ্যে প্রিন্স অ্যান্ড্রু, আর এখন নরওয়েতে যুবরাজ্ঞীর পুত্র—একই প্যাটার্ন বারবার দেখা যায়: ক্ষমতা, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান ধর্ষক ও ন্যায়বিচারের মাঝে এক অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে তোলে।
পশ্চিম একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী বয়ান চালিয়ে যাচ্ছে:
মঞ্চে—নারীর অধিকার রক্ষায় জোরালো বক্তব্য, যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই, সম্মতির শিক্ষা।
বাস্তবে—নীরবতার নেটওয়ার্ক, বিচারিক দায়মুক্তি, ভুক্তভোগীদের ওপর গণমাধ্যমের চাপ এবং ধর্ষণকে “কাঠামোগত অপরাধ”-এর বদলে “ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি” হিসেবে উপস্থাপন।
তবুও পরিসংখ্যানগুলো উচ্চকণ্ঠে বলছে: ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইউরোপীয় নারী শারীরিক বা যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে—যেগুলোকে “লিঙ্গসমতা”-র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় সেগুলোতে ধর্ষণের হার ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার শিকার।
#MeToo আন্দোলনকে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু কী হলো? কিছু চেহারা বলি হলো, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত রইল। বড়, ধনী ও প্রভাবশালী ধর্ষকরা হয় খালাস পেল, নয়তো তাদের মামলাগুলো আইনি জটিলতায় হারিয়ে গেল। তবু গণমাধ্যমের মনোযোগ ভুক্তভোগীর দিকে নয় বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষার দিকে। ভুক্তভোগীরা “সাধারণ মেয়ে" তারা ক্ষমতাহীন, কণ্ঠহীন, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের নিচে নিজেদের যন্ত্রণা বারবার বলতে বাধ্য। আর ধর্ষকরা “জটিল মামলা”, “সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি” বা “মানসিক রোগী”-র মতো নানা অজুহাত উত্থাপনের মাধ্যমে বেঁচে যায়, রক্ষা পায়।
সমস্যা শুধু “ধর্ষণ” নয়; সমস্যা হলো এমন এক সভ্যতার ভেতরে ধর্ষণকে স্বাভাবিক করে তোলা, যে সভ্যতা সুন্দর শব্দ, জাঁকজমকপূর্ণ দর্শন ও শান্তি পুরস্কারের আড়ালে সবকিছু লুকিয়ে রাখে। এখন পাশ্চাত্যের উচিৎ নিজেকেই এই প্রশ্ন করা যে- এত দার্শনিক, আইনবিদ ও মানবাধিকার উপদেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ফলাফল কেন এমন?
এটি কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি রাজপরিবারের সংকট নয়।
এটি হলো “ধর্ষণ-সভ্যতা”-র স্পষ্ট লক্ষণ- একটি সভ্যতা, যা নৈতিকতার উপদেশ দেয়, কিন্তু ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনে না।#
পার্সটুডে/এসএ/৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।