প্রযুক্তি থেকে প্রতিরক্ষা- সব ক্ষেত্রে আমেরিকার বিকল্প খুঁজছে ইউরোপ
-
ইউরোপের স্বনির্ভরতা অভিযান: প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে পরিবর্তনের হাওয়া
পার্সটুডে: ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় সরকার ও কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং আর্থিক ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য নতুন উদ্যোগ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও এটি ধীরে ধীরে ট্রান্স-আটলান্টিক (আটলান্টিকের দুই পারে) সম্পর্কের সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলো বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা (Strategic Autonomy) জোরদার করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুসরণ করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি অবস্থানের ফলে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। যদিও ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রধান বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখে, তবুও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে "ঝুঁকি কমানো" (De-risking) প্রয়োজন বলে উল্লেখ করছেন।
এই পার্স টুডে প্রতিবেদনে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
ইউরোপের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা
পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলা যায়, গত কয়েক দশক ধরে ইউরোপ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ন্যাটোর ওপর এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এসেছে। তবে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও নীতিমালা—যার মধ্যে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রসঙ্গও রয়েছে, ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং তাদের বিকল্প অর্থনৈতিক অংশীদার খোঁজার দিকে ধাবিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার মার্কোসুর (Mercosur) জোটসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক নির্ভরতা এখনো ব্যাপক, এবং তা কমাতে বহু বছর সময় লাগবে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে পরিবর্তন
ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিছু ইউরোপীয় দেশের নেতারা মনে করেন, এখন সময় এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি স্বাধীন সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার। যদিও ২০০৯ সাল থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির ৪২.৭ ধারা যৌথ প্রতিরক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করেছে, বাস্তবে ন্যাটো এবং মার্কিন সামরিক সহায়তার কারণে এই কাঠামোর গুরুত্ব অনেকটাই কমে ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি কিছু ইউরোপীয় দেশকে এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে—যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে ইউরোপের নিরাপত্তায় কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি স্বাধীন সামরিক কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার পথে অগ্রযাত্রা
মার্কিন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ইউরোপের নির্ভরতাও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কিছু মার্কিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সেগুলোর পরিবর্তে নিজস্ব (বৈদেশিক নয়) প্রযুক্তি ব্যবস্থার ব্যবহার বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টেও মার্কিন সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি সরঞ্জাম ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
ইইউর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—সংবেদনশীল প্রযুক্তি খাতে একটি দেশ বা একটি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি ও আর্থিক ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা
জ্বালানি খাতেও ইউরোপ নিজের নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। যদিও ইউরোপে গ্যাস সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকা রয়েছে, ইউরোপীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন—রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যদি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়, তাহলে নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া ও কানাডাসহ নতুন জ্বালানি সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে।
আর্থিক খাতেও ইউরোপ বিকল্প পথ খুঁজছে। মার্কিন পেমেন্ট সিস্টেমের ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় নিয়ে কাজ চলছে এবং একটি স্বাধীন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে "ডিজিটাল ইউরো" চালুর পরিকল্পনাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখায় যে, এই মহাদেশ আমেরিকার সাথে তার সম্পর্কে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে; একটি প্রক্রিয়া যা যদিও ওয়াশিংটনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ নয়, তবে এটি বিশ্বব্যাপী সমীকরণে আরও স্বাধীনতা এবং বৃহত্তর ভূমিকা পালনের জন্য ইউরোপের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিতে পারে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩