বিশ্লেষণ | চড়া মূল্য; আরব দেশগুলোর কোষাগার খালি করছে আমেরিকা
পার্সটুডে- পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরবর্তী আরব দেশগুলোর সম্পদ লুটের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
পার্সটুডে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ লাভজনক অস্ত্র চুক্তির একটি উদাহরণ হলো মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কাতারের কাছে চারটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান কেসি-৪৬এ পেগাসাস বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে, যার মূল্য ধরা হয়েছে বিস্ময়কর ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। চুক্তিতে আটটি পিডাব্লিউ৪০৬২ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন, ১০টি এএন/এএলআর-৬৯এ রাডার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সহায়তা ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ সামরিক চুক্তি মনে হলেও, এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী বিমানের সঙ্গে তুলনা করলে একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক শোষণের চিত্র ফুটে ওঠে। ইরানভীতি ও কৃত্রিম নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের আরব দেশগুলোর বিপুল অর্থ অস্ত্রশিল্পের কারখানাগুলোর দিকে প্রবাহিত করছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো বিমানপ্রতি মূল্য। আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ প্রতিটি কেসি-৪৬এ বিমানের জন্য কাতারকে গুনতে হচ্ছে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অথচ মার্কিন বিমানবাহিনী নিজে প্রতিটি বিমান প্রায় ২০০ থেকে ৩২২ মিলিয়ন ডলারে সংগ্রহ করে। বিদেশি মিত্রদের কাছে বিক্রয়মূল্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্রয়মূল্যের এই বিশাল পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য আদায়ের একটি পরিকল্পিত নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
কেসি-৪৬এ পেগাসাস'র সঙ্গে এর ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস এ-৩৩০ এমআরটিটি'র তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিটি এ-৩৩০ এমআরটিটি'র জন্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। অথচ এই বিমানটি শুধু উচ্চমানেরই নয়, প্রয়োজনে এটিকে আকাশপথের হাসপাতাল হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ, কাতার কেসি-৪৬এ পেগাসাস'র জন্য ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় তিন গুণেরও বেশি অর্থ দিচ্ছে—এমন একটি পণ্যের জন্য, যার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, কেসি-৪৬এ পেগাসাস শুধু ব্যয়বহুলই নয়, এটি ইতিহাসের অন্যতম সমস্যাসঙ্কুল সামরিক বিমান হিসেবেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাব নিরীক্ষা সংস্থা জিএও'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে বিমানটি নির্ধারিত প্রস্তুততা ও মিশন পরিচালনার সক্ষমতার মান পূরণ করতে পারেনি। যন্ত্রাংশের ত্রুটি, সরঞ্জামের ঘাটতি এবং বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার কারণে মার্কিন বিমানবাহিনীকে এখনো পুরোনো কেসি-১৩৫ বহরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিমানটির গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটিগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও রিমোট ভিশন সিস্টেমের (আরভিএস) সমস্যা, যার ফলে এ-১০ এর মতো কিছু যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহে জটিলতা দেখা দেয়। এ ছাড়া বিমানের কাঠামোতে ফাটল, জ্বালানি লিক, পৃথক দুটি ঘটনায় উড্ডয়নের সময় জ্বালানি সরবরাহের বুম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ত্রুটিসহ দীর্ঘ সমস্যার তালিকা রয়েছে। এসব ত্রুটি দূর করতে বোয়িংকে ইতোমধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, কাতার কেন একটি সমস্যাসঙ্কুল ও বিতর্কিত পণ্যের জন্য এত বিপুল অর্থ ব্যয় করবে? এর উত্তর খুঁজতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইরানভীতি সৃষ্টির নীতিতে। ইরানকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করে ওয়াশিংটন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে কার্যত এমন এক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তাদের সামনে বার্তা—‘অস্ত্র কিনুন, নইলে বিপদে পড়ুন’।
এই বিক্রির পক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক যুক্তি হলো, কাতারকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের হুমকি মোকাবিলায় সহায়তা করা এবং একটি কৌশলগত আঞ্চলিক অংশীদারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি ব্যবহার করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৫ সালের মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প রিয়াদ সফরের সময় কাতারের সঙ্গে ৪২ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র বিক্রি চুক্তির কথা ঘোষণা করেন, যার মধ্যে খোদ কেসি-৪৬এ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব বিশাল চুক্তি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন অঞ্চলের আরব দেশগুলো একদিকে তেলের দাম কমে যাওয়া ও বাজেট ঘাটতির চাপ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে এমন সব অস্ত্রের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, যেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং যা তাদের আরও বেশি সামরিক ও প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাতারের জন্য ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কেসি-৪৬এ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান চুক্তিকে কেবল একটি সামরিক লেনদেন হিসেবে দেখা যায় না। এটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আড়ালে অর্থনৈতিক শোষণের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। ইরানভীতির পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত সামরিক পণ্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করছে—যেখানে প্রকৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তার চেয়ে অস্ত্রশিল্পের লাভকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।#
পার্সটুডে/এসএ/২৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন