ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সংকট: যুদ্ধ, নাকি চুক্তি থেকে পলায়ন?
-
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট
পার্সটুডে-মার্কিন সরকারের কর্মকর্তাদের আচরণ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানকে নিয়ে ওয়াশিংটন কার্যত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে এবং যুদ্ধ অথবা চুক্তি-এই দুইয়ের সংকটে আটকে আছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ৪০ দিনের যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। ৪০ দিন পর উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও তা স্থায়ী হয় নি এবং যুদ্ধেরও অবসান ঘটে নি। বরং বিভিন্ন সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়েছে। এখনো কোনো চুক্তির দিকে অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এরইমধ্যে মার্কিন অর্থমন্ত্রী যাকে ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে দেশটিকে আলোচনার টেবিলে এনে নিজেদের দাবি চাপিয়ে দিতে, অথবা নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে চাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কেন মনে করছে যে যুদ্ধের বিকল্প কার্যকর হতে পারে? এর প্রধান কারণ হলো মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়া। মার্কিন বিশ্লেষক ফারিদ জাকারিয়া সম্প্রতি লিখেছেন, ইরানের যুদ্ধ ছিল “একটি পরাশক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে ধ্বংস হয়, তার একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ।”
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আধিপত্যশীল শক্তি হিসেবে নিজেকে দাবি করা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও ইরানের বিরুদ্ধে তার প্রধান লক্ষ্য অর্জন করতে পারে নি। এমনকি জন মারশাইমারের মতো খ্যাতনামা মার্কিন তাত্ত্বিকরাও স্পষ্টভাবে বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে। একইভাবে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনে নিজেদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে নি।
জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক ও কর্মকর্তা স্কট রিটার বলেন, আজ বিশ্বে কেউ বিশ্বাস করে না যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। এমনকি কেউ এটাও বিশ্বাস করে না যে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের ও নির্ণায়ক অর্থনৈতিক আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা রাখে। তার ভাষায়, “এসবই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কল্পিত জগতের অংশ।”
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ও তার দলের প্রত্যাশা হলো, নতুন একটি যুদ্ধের মাধ্যমে তারা ইরানের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে পারবে। তবে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ব্যাপক সংশয় রয়েছে। ফলে মার্কিন ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে কোনো ঐকমত্য নেই। বরং কেউ কেউ এটিকে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী বলেও মনে করছেন।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানের সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত চুক্তির দিকে এগোচ্ছে না? বাস্তবে মার্কিন সরকার ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না, কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রকৃত চুক্তিতেও আগ্রহী নয়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় ও অবৈধ দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয়। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ৪০ দিনের যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিল ব্যবহার করে এসব দাবি ইরানের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু তেহরান ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা মার্কিন দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। ফলে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিতে ইরানের সঙ্গে যে-কোনো আলোচনা শেষ পর্যন্ত তেহরানকে কিছু না কিছু ছাড় দেওয়ার দিকে নিয়ে যাবে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র যখন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা এবং ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর মধ্যে অচলাবস্থায় পড়েছে, এমনকি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, তখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। তবে সমস্যা হলো, ইরান এই অর্থনৈতিক চাপকেও সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে, এই চাপ অব্যাহত থাকলে তারা নিজেদের সামরিক কৌশল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে পরিবর্তন করবে।
এই সতর্কবার্তার অর্থ হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের হুমকি-‘সব বিকল্পই টেবিলে রয়েছে’-তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধকে আর ভয় পাচ্ছে না।#
পার্সটুডে/এনএম/২৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন