৪০ ডলারের তেল: ওয়াশিংটনের স্বপ্ন বনাম বৈশ্বিক তেলবাজার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
https://parstoday.ir/bn/news/world-i162874-৪০_ডলারের_তেল_ওয়াশিংটনের_স্বপ্ন_বনাম_বৈশ্বিক_তেলবাজার_ও_অর্থনৈতিক_বাস্তবতা
পার্সটুডে: ৪০ ডলার দরে তেল বিক্রির বিষয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্যের জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ লিখেছেন: “উচ্চতায় ওঠার আগে ভালো করে ওয়ার্ম-আপ করে নিন!”
(last modified 2026-09-07T15:09:58+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৬ ১৭:৪০ Asia/Dhaka
  • বৈশ্বিক তেলবাজার
    বৈশ্বিক তেলবাজার

পার্সটুডে: ৪০ ডলার দরে তেল বিক্রির বিষয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্যের জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ লিখেছেন: “উচ্চতায় ওঠার আগে ভালো করে ওয়ার্ম-আপ করে নিন!”

পার্সটুডে'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ৪০ ডলার ব্যারেল দরে তেলের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্যের জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ এক ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে তাঁকে প্রথমে উড্ডয়ন এবং পরে মুক্তপতনে পড়তে দেখা যায়। এক্সে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে তিনি লেখেন: “লাফ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। তবে টেক-অফের আগে কয়েকটি বিষয়ে ভালো করে ওয়ার্ম-আপ করে নাও:”

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম “ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে” পৌঁছেছে-এ নিয়ে কিছু একটা করা দরকার! বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন ট্রেজারি বন্ডধারীদের অন্যতম জাপান বিপুল পরিমাণ মার্কিন বন্ড বিক্রি করছে। জাপানের এই অর্থনৈতিক নীতিতে ডলারের ক্ষতি হচ্ছে-তাই ভালোই উপভোগ করো! বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মালিক নরওয়ে ৮০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বন্ড বিক্রি করছে। নরওয়ের নামও ‘আমেরিকাওয়ে’ করে দাও-কানাডার লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের মতো-তাহলে অন্তত একটি কার্যকর কাজ করা হবে! যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগের হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু একটা করো। হয়তো তরুণ আমেরিকানদের ঋণ মওকুফের বিনিময়ে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ইসরায়েলি প্রস্তাবটি কাজে লাগাতে পারো! সবশেষে, ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতি কমিটির সদস্যরা 'লাল সতর্ক সংকেত' জ্বালিয়ে দিয়েছেন এবং ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বলছেন—যা ট্রেজারি বিভাগের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কী অবস্থা!

৪০ ডলারের তেল-কতটা বাস্তবসম্মত?

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৪০ ডলারের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্যকে শুধু ভবিষ্যৎ জ্বালানি বাজারের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক নীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। সস্তা তেল যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয় কমাতে পারে এবং একই সঙ্গে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, অন্যান্য অনেক পণ্যের তুলনায় তেলের দাম বহুসংখ্যক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক সরবরাহ ও চাহিদা, মজুত, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা, ওপেক ও ওপেক প্লাসের নীতি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারের প্রত্যাশা-সবকিছুই তেলের দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। ফলে ওয়াশিংটন রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেলের দামে প্রভাব ফেলতে পারলেও ৪০ ডলারে নামানো এবং দীর্ঘদিন সেই পর্যায়ে ধরে রাখা অত্যন্ত জটিল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৪০ ডলারের তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পুরোপুরি সুবিধাজনক নয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক এবং এর উৎপাদনের একটি বড় অংশ শেল অয়েলনির্ভর। তেলের দাম দীর্ঘসময় ব্যাপকভাবে কমে গেলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা, বিনিয়োগ ও খনন কার্যক্রম কমতে পারে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও হ্রাস পেতে পারে। অর্থাৎ ভোক্তাদের জন্য সস্তা তেল যেমন ভালো, তেমনি উৎপাদন ধরে রাখার জন্য তেল কোম্পানিগুলোর পর্যাপ্ত দামও প্রয়োজন। এটিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব।

সস্তা জ্বালানি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু দাম দীর্ঘসময় খুব নিচে থাকলে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ কমে গিয়ে ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট এবং আবারও দাম বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

কালিবাফের বক্তব্যে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বাজারের কথাও উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা কমে গেলে বা এর সুদহার বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বাড়তে পারে।

এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার, সরকারি ঋণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ট্রেজারি বাজার-সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই তেলের দাম কমানোকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ভূ-রাজনৈতিক দিক

৪০ ডলারের তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভূরাজনৈতিকভাবেও আকর্ষণীয় হতে পারে। তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমে গেলে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর আয় কমে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে ইরানের মতো দেশ, যারা একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি, তাদের জন্য তেলের দাম কমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করবে রপ্তানির পরিমাণ, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, বিনিময় হার এবং তেল-রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর।

তবে ৪০ ডলারের তেল সাময়িকভাবে সম্ভব হওয়া এবং দীর্ঘসময় ৪০ ডলারে স্থির থাকা-দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা বা তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে দাম সাময়িকভাবে ৪০ ডলারে নেমে যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ওই দাম ধরে রাখতে হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।

সুতরাং কালিবাফের “টেক-অফের আগে ওয়ার্ম-আপ” মন্তব্যটি শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নয়। এর মূল বার্তা হলো—ওয়াশিংটন ৪০ ডলারের তেলকে নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে দেখার আগে এর সম্ভাব্য খরচ ও সীমাবদ্ধতাগুলোও হিসাব করুক।

সস্তা তেল মার্কিন ভোক্তার জন্য সুখবর হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তা মার্কিন শেল অয়েল শিল্প, জ্বালানি বিনিয়োগ, ট্রেজারি বন্ডের বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।#

পার্সটুডে/এনএম/৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।