ইয়েমেন সংকট নিয়ে প্রস্তাবিত তদন্ত কমিটির স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
ইয়েমেন সংকটের ব্যাপারে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন ও এ সংস্থার মহাসচিবের নানা বক্তব্য বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, এ ব্যাপারে তারা চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার এক বিবৃতিতে ইয়েমেনে চলমান অপরাধযজ্ঞ তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা ইয়েমেন সংকটকে দু’টি সময়ে ভাগ করেছেন। প্রথমত ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়ত ২০১৫ সালের মার্চ থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত। প্রথম সময়টিতে মিশর, লিবিয়া ও তিউনিশিয়ার জনগণের মতো ইয়েমেনের জনগণও স্বৈরশাসন অবসানের জন্য তৎকালীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বে রাজতান্ত্রিক আরব সরকারগুলো ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আমেরিকাও সৌদি আরবকে সমর্থন দেয় যাতে ইয়েমেনের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়। জনগণের প্রবল আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত আব্দ রাব্বু মানসুর হাদির সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এ সময়টিতে জাতিসংঘ সম্পূর্ণ নীরব ছিল। কারণ জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী কোনো দেশের জনগণই নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে এবং এটা তাদের অধিকার। কিন্তু সৌদি আরব ও আমেরিকা ইয়েমেনের জনগণের এ অধিকার কেড়ে নেয়ার পদক্ষেপ নেয়। চাপিয়ে দেয় রক্তাক্ত যুদ্ধ।
ইয়েমেন সংকটের দ্বিতীয় সময়টিতে শুরু হয় সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব সামরিক জোটের ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক আগ্রাসন। সৌদি আগ্রাসনের কারণে ইয়েমেন সংকট রক্তাক্ত সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে। সৌদি আরবের প্রতি রয়েছে আমেরিকা ও ইসরাইলের সমর্থন। এ পর্যায়ে এসে জাতিসংঘ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর বিরাট দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি।
প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ ইয়েমেনের জগণের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়ে রাজনৈতিক গোলযোগ চলাকালে জনগণের সরকার বসানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কোনো সহযোগিতাই করেনি। আবার দ্বিতীয় পর্যায়ে এসেও সৌদি আগ্রাসন চলাকালে জাতিসংঘ ইয়েমেনের জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি। জাতিসংঘ কেবল জাতীয় সংলাপ আয়োজনের জন্য চেষ্টা চালিয়েই ক্ষান্ত রয়েছে। যদিও সৌদি আরবের বাধার কারণে ওই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব সম্প্রতি ইয়েমেনে শিশু হত্যায় জড়িত থাকার দায়ে সৌদি আরবকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু অন্যান্য আরব দেশ ও পাশ্চাত্যের প্রচণ্ড চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বান কি মুন কালো তালিকা থেকে রিয়াদের নাম প্রত্যাহার করে নেন।
বর্তমানে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনার ইয়েমেনে চলমান অপরাধযজ্ঞ তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যদি এ ধরণের কিমিটি গঠিত হয় তাহলেও তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে। কারণ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সৌদি আরব এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়ে আছে এবং দেশটি পাশ্চাত্যের সমর্থন নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদেরও সভাপতি। তাই ইয়েমেনে চলমান অপরাধযজ্ঞ তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিটি গঠন কতটুকু ফলদায়ক হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলো জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর সঙ্গে সৌদি আরবসহ রাজতন্ত্র শাসিত অন্য আরব দেশগুলোর স্বার্থও জড়িত। এ অবস্থায় ইয়েমেন ইস্যুতে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। #
পার্সটুডে/মোঃ রেজওয়ান হোসেন/২৬