'মৃত বাংলাদেশির লাশ নেয়ার কেউ ছিল না'
https://parstoday.ir/bn/news/world-i79002-'মৃত_বাংলাদেশির_লাশ_নেয়ার_কেউ_ছিল_না'
করোনার প্রকোপে ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশিরা খুব একটা ভালো নেই। করোনার শুরুর দিকে অবস্থা আরও খারাপ ছিল এমনকি মৃত বাংলাদেশি ভাইয়ের লাশ নেয়ার কেউ ছিল না। এখন কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
এপ্রিল ১১, ২০২০ ১৪:৫৭ Asia/Dhaka

করোনার প্রকোপে ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশিরা খুব একটা ভালো নেই। করোনার শুরুর দিকে অবস্থা আরও খারাপ ছিল এমনকি মৃত বাংলাদেশি ভাইয়ের লাশ নেয়ার কেউ ছিল না। এখন কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান।

তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে সরকারের বুঝতে না পারা, লকডাউন না মানা এবং মানুষের অসচেতনার কারণে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

প্রবাসী সাংবাদিক জনাব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান  

রেডিও তেহরান: জনাব কামরুজ্জামন, বৈশ্বিক মহামারি করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব। আপনি জানেন আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে করোনভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে। এখন সারা বিশ্বের মধ্যে ইউরোপেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে। আপনি ইউরোপের দেশ ফ্রান্সের প্যারিসে আছেন। সেখানেও মৃতের সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তো আপনার কাছে প্রথমে জানতে চাইব,  চীনে ছড়িয়ে পড়ার এতদিন পর ফ্রান্সে এ ভাইরাস এতটা মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়লো কীভাবে? এ ক্ষেত্রে ফ্রান্স সরকারের ঘাটতি কোথায়?

ফ্রান্সের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি

কামরুজ্জামান: রেডিও তেহরানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেখুন, করোনাভাইরাস এমন একটা ভাইরাস এর সম্পর্কে আগে থেকেই জানার কোনো সুযোগ নেই। ফ্রান্সে করোনাভাইরাস বাস্তবতার আলোকে আমার কাছে মনে হয়েছে অন্যান্য দেশে যেভাবে করোনা ছড়িয়েছে ফ্রান্সেও একইভাবে ছড়িয়েছে। এ ব্যাপারে শুরুর দিকে ফ্রান্স সরকারের  যতটা সচেতন হওয়ার দরকার ছিল ততটা সচেতনা দেখতে পাইনি।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, আপনি জানেন যে, ফ্রান্স হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম একটি পর্যটনের দেশ। প্রতিবছর বিশ্বের দেশগুলো থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। তাছাড়া ফ্রান্সের ব্যবসার সঙ্গে  চীনের একটা বড় অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। চীনের মানুষ প্রতিনিয়ত এখানে যাতায়াত করেছে। শুধু চীনের কথাই বলব না চীন থেকে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়া এবং আক্রান্ত হওয়া মানুষও হয়তো ফ্রান্সে এসেছে। এ বিষয়টি এত ভয়াবহ আকার ধারণ করবে সেটা শুরুর দিকে ফ্রান্স সরকার আসলে বুঝতে পারেনি। যে কারণে ধীরে ধীরে করোনা অনেক বেশি সংক্রমিত হয়েছে।

করোনাভাইরাস: তাপ মাপা হচ্ছে

আরও একটা বিষয় বলতে চাই সেটি হচ্ছে, ফ্রান্সে ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগে প্রতিবেশী দুটি দেশ ইতালি ও স্পেনের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল। তখন ফ্রান্সের ভেতর থেকে সীমান্ত লকডাউনে করে দেয়ার দাবি উঠেছিল। কিন্তু যেহেতু ইউরোর অন্যতম শক্তিশালী দেশ ফ্রান্স। যে কারণে এখানকার সরকার অভ্যন্তরীণ সীমান্ত বন্ধ করেনি। ফলে বন্যার পানির মতো হু হু করে মানুষ আসা যাওয়া করেছে। এর মধ্যদিয়ে এত ব্যাপকভাবে ফ্রান্সে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।

রেডিও তেহরান: জ্বি আপনি বললেন, শুরুর দিকে ফ্রান্সের সরকার বিষয়টি বুঝতে পারেনি এবং জনগণও সেভাবে সচেতনতা দেখায়নি। তো ইউরোপের যেসব দেশে করোনা মহামারি আকার ধারণ করেছে ফ্রান্সসহ তার সবগুলোই অর্থনীতি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নত। তারপরও এমন বিস্তার ঘটলো...বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

কামরুজ্জামান: দেখুন, এখানে দ্বিমুখী একটা অবস্থা দেখতে পেয়েছি। আমার কাছের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং এখনও খবর পাচ্ছি অনেক আক্রান্ত হচ্ছেন। বাইরে থেকে ফ্রান্সের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যতটা উন্নত মনে করা হয় আসলে ভেতর থেকে দেখলে সেরকমটি মনে হয় না। স্বাভাবিকভাবে মানুষ খুব একটা ডাক্তারের কাছে যায় না। সারা বিশ্বের মতো এখানেও করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে ডাক্তাররা চিকিৎসা দিতে ভয় পেয়েছে। ডাক্তাররা  আতঙ্কিত ছিল। এমনকি আমি আমার নিজের কথা বলব। তিনজন ডাক্তারের সাথে আমার অ্যাপয়নমেন্ট নেয়া ছিল। তাঁরা এই করোনার কারণে ইমেইলের মাধ্যমে তাদের অ্যাপয়নমেন্ট বাতিল করেছে। ডাক্তাররা পুরোপুরি রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। এ ধরনের সমস্যা আমি দেখেছি।

প্যারিসে লকডাউন চলছে

ফ্রান্সের চীকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে আরেকটি বিষয় একটু বলতে চাই, সাধারণ কোনো অসুখ বিসুখে ডাক্তার ডাকলে তাঁরা চলে আসেন এবং রোগীর খোঁজ খবর নেন। কিন্তু আমি যেটা প্রত্যক্ষ করেছি নিজের পরিচিত জনদের মাধ্যমে সেটা হচ্ছে- করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরও প্রথম দিকে রোগীদেরকে হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতে থাকার এবং পরিস্থিতি মোকাবলার পরামর্শ দিয়েছেন। একেবারে মারাত্মক আকার ধারণ না করা পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। এ কারণেও করোনার বিস্তার ঘটছে বলে আমার মনে হয়েছে। কারণ একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো কখনও তার বাড়ির আশেপাশে বের হচ্ছে। এবং আক্রান্ত ঐ ব্যক্তির পাশ দিয়ে অন্যান্য মানুষ চলাচল করছে। এভাবেও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।

রেডিও তেহরান: জনাব কামরুজ্জামান আপনি বললেন যে, কোয়ারেন্টিন বা সঙ্গরোধ সেভাবে কার্যকর হয়নি। তো করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক ও ব্যক্তিগত সচেতনতা প্রয়োজন এবং কিছু নিয়ম মেনে চলার দরকার। এসব উন্নত দেশের মানুষ কী সেই নিয়মগুলো মেনে চলছে না? এ ক্ষেত্রে কী ফ্রান্সে কোনো সমন্বয়হীনতা চোখে পড়ছে?

কামরুজ্জামান: দেখুন, সমন্বয়হীনতার খুব বেশি অভাব ছিল এমনটি মনে হয়নি। তবে বাইরে থেকে যেভাবে মনে হয় উন্নত দেশ, এখানকার মানুষ আচার আচরণসহ স্বাস্থ্যগত দিকে থেকে  অনেক বেশি সচেতন। সেই সচেতনা লক্ষ্য করেছি প্রতিটি ফরাসি নাগরিকের মধ্যে। তারা লকডাউন যথাযথভাবে মান্য করছেন। 

কিন্তু সার্বিকভাবে এখানে সেই সচেতনার অভাব অনেক বেশি মনে হয়েছে। কারণ হচ্ছে- বিশ্বের মানবাধিকার বঞ্চিতদের অন্যতম আশ্রয়স্থল হচ্ছে ফ্রান্স। বিশ্বের প্রায় ১৮২ টি দেশের মানবাধিকার বঞ্চিত মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছে। আর এইসব আশ্রিত মানুষেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসচেতন এবং অর্থ উপার্জনের দিকে নিজেদের নিয়োজিত রাখে। ফলে তারা লকডাউন যথাযথভাবে মেনে চলছে না। আমি যখন আপনার সাথে কথা বলছি তখনও দেখছি কয়েকজন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তবে লকডাউন আছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী তৎপর আছে।

রেডিও তেহরান:  করোনা মোকাবেলায় ইউরোপের দেশগুলোতে বিশেষ করে ফ্রান্সের সামাজিক সহযোগিতাটা কেমন দেখছেন?

Image Caption

কামরুজ্জামান: সামাজিক সহযোগিতা আছে। তবে সামাজিক সহযোগিতার সাথে সরকারের সহযোগিতার পার্থক্য রয়েছে। সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশি কমিউনিটির বিষয়টি উল্লেখ করব। আপনি হয়তো জানেন যে, ইউরোপে- ইংল্যান্ডের পর ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ রয়েছে। বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে কখনও কখনও সহযোগির অভাব দেখা গেছে আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি গোপনে পরস্পরকে সহযোগীতা করছে। তবে করোনার প্রথম দিকে আতঙ্কের কারণে সহযোগিতা সেভাবে দেখা যায়নি। কোনো একজন বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হলে তার পাশেই কেউ যাচ্ছিল না।

একটি বিষয় তুলে ধরতে চাই। এখানে করোনায় আক্রান্ত একজন বাংলাদেশি মারা যাওয়ার পর তার লাশটা নেয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি। উনি অন্যান্য বাংলাদেশিদের সাথে একটি মেসে থাকতেন। মৃতের লাশ রেখে সবাই মেস ছেড়ে চলে যায়। তবে এখন পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হয়েছে। 'বিসিএফ' বা বাংলাদেশ কমিউনিট ফ্রান্স নামের একটি সংগঠনসহ আরও বেশ কিছু সংগঠন বাংলাদেশিদের সহযোগিতা করছেন। এটি একটি আশার দিক।

রেডিও তেহরান: ফ্রান্সে বাংলাদেশিরা কেমন আছেন, কেমন সংখ্যক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন- তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

কামরুজ্জামান: দেখুন, ফ্রান্সে কতজন বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন এবং কতজন মারা গেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যন দেয়া এই মুহূর্তে দেয়া সম্ভব না। ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ মানুষ রয়েছে। তবে এর বেশিরভাগ মানুষের এখানে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র নেই। আর অবৈধভাবে থাকা এবং জীবন জীবিকার কারণে লকডাউনের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে তারা করোনার মধ্যে কাজে যেতে বাধ্য হয়েছে। আর কাজে যাওয়ার কারণে তারা অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এরফলে যে সংকটটি হয়েছে সেটি হচ্ছে-ওইসব বাংলাদেশি ভাইয়েরা মেস করেই থাকেন। আর যখনই মেসের কেউ একজন আক্রান্ত হচ্ছেন তখন অন্যরা তাকে তিরস্কার করছে। তারা বলছে তোমার কারণেই আমরা যদি করোনায় আক্রান্ত হই তাহলে আমাদের এবং আমাদের পরিবারের কি উপায় হবে! করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে মেসের অন্য সদস্যরা বের করে দিচ্ছে। অথচ সে বের হয়ে কোথায় যাবে? তারতো যাওয়ার অন্য কোনো জায়গা নেই! এধরনের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা খুবই দুঃখজনক এবং হতাশার।

তবে সম্প্রতি একটি বিষয় খুব ভালো লাগছে। বিষয়টি হচ্ছে ফ্রান্সে যেসব বাংলাদেশি এখানে আর্থিকভাবে কিংবা অন্যান্য বিষয়ে ভালো অবস্থানে আছেন তাঁরা কিছু থাকার জায়গা তৈরি করেছেন। যদি কোনো বাংলাদেশি করোনা আক্রান্ত হন এবং থাকার কোনো জায়গা না থেকে সেক্ষেত্রে সেসব জায়গায় তারা আশ্রয় নিতে পারছেন। আর এজন্য তাঁদেরকে সাধুবাদ জানানো উচিত।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা এখনও লকডাউনের মধ্যে অবৈধ বাংলাদেশিরা কাজ করছেন?

Image Caption

কামরুজ্জামান: এখন লকডাউনের মধ্যে বাংলাদেশিদের কাজ করার পরিমাণ অনেকটা কমে এসেছে। তারপরও অনেককে ঝুঁকির মধ্যে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। সাধারণ অবৈধভাবে যারা আছেন তাদেরকে অতি সাধারণ মানের অথচ কঠিন ও  অনিয়মিত কাজ করতে হয়। আর এ ধরণের কাজ কিন্তু এই করোনার মধ্যেও বন্ধ হয়নি। যেমন ধরুন নৈমিত্তিক খাবার তৈরির দোকান হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা সাধারণ দোকান। এখানে খাবারের দোকানগুলো খোলা আছে। আর এসব খাবারের দোকানের পেছন দিকের কাজগুলো করেন বাংলাদেশিরা। তাদেরকে কাজ করতে হচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোর করে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর অবৈধভাবে থাকায় পরিবার এবং নিজের দিকে তাকিয়ে ঝুঁকির মধ্যেও অনেকে কাজ করছেন এবং সেভাবেই অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

রেডিও তেহরান: জনাব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান  ফ্রান্সের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের সাথে কথা বলার জন্য আবারও আপনাকে ধন্যবাদ।

কামরুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১১