ইরানের ইসলামি বিপ্লবের দিনগুলি (৫-৮ পর্ব)
-
বক্তব্য রাখেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী
ইরানের স্বৈরশাসক শাহের বাহিনীর হাতে সে সময় যারা শহীদ হতো, তাদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এবং অংশগ্রহণকারীরা শাহ বিরোধী আন্দোলনকে আরও বেগবান করার শপথ গ্রহণ করত। এর ফলে আন্দোলন ক্রমেই আরও জোরদার হতে থাকে। এক পর্যায়ে গোটা ইরান বিক্ষোভের দেশে পরিণত হয়।
পঞ্চম পর্ব
পরিস্থিতি ক্রমেই প্রতিকূল হতে দেখে স্বৈরাচারী শাহ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। শাহের সেনারা বিপ্লবীদের অবস্থান দুর্বল করার জন্য চেষ্টা জোরদার করে। ইরানের শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ ১৯৭৮ সালের ১৮ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে তার ভীত-সন্ত্রস্ত হবার বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। এ পর্বে এসব বিষয়েই আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হল:
১৯৭৮ সালের আগস্ট মাস। বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হতে দেখে স্বৈরাচারী শাহ সরকার দিশেহারা। তাদের একটাই চিন্তা, কিভাবে বিপ্লবী মুসলমানদের কাবু করা যায়। এ অবস্থায় শাহ এক ঘৃণ্য পন্থা বেছে নেয়। বিপ্লবীদের সুনাম ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে অনুচরদের সাহায্যে আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। সিনেমাহলটি তখন দর্শকে পরিপূর্ণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের লেলিহান শিখায় নারী ও শিশুসহ তিন শতাধিক মানুষের করুণ মৃত্য ঘটে। সিনেমাহলে আগুন দেয়ার ঘটনায় সেদিন নারী ও শিশুসহ মোট ৩৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া আহত হয় আরও অনেকে। অগ্নিকান্ডের পরপরই শাহ নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো, বিপ্লবীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার শুরু করে। তারা বলতে থাকে, ইসলামপন্থীরা শিল্প ও সিনেমার বিরোধী। একারণেই তারা এখানে আগুন দিয়েছে। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হলো, শাহ ও তার প্রচার মাধ্যমের সে কথা মানুষ বিশ্বাস করেনি।
ঐ ঘটনার পর ইমাম খোমেনী (রহ.) এক বাণীতে বলেছিলেন, কোন মুসলমান এমনকি কোন মানুষ এ ধরনের নৃশংসকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে আমার মনে হয় না। এ কাজ তাদেরই যারা নৃশংসতা ও পাশবিকতার মাধ্যমে নিজেদের মনুষত্বকে ধ্বংস করেছে। তিনি সিনেমাহলে আগুন দেয়ার জন্য শাহকে দায়ি করে বলেন, ইসলাম বিরোধী এই অমানবিক কাজ বিপ্লবীরা করতে পারেনা কারণ তারা ইসলাম ও ইরানের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর পরিচালিত এক তদন্তের মাধ্যমেও সিনেমা হলে আগুন দেয়ার ঘটনায় শাহ ও তার অনুচরদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।
আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন দেয়ার পরও শাহ বিরোধী আন্দোলন পুরোদমে অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে শাহের প্রধানমন্ত্রী জামশিদ অমুযেগার পদত্যাগ করেন এবং জাফর শরীফ ইমামি তার স্থলাভিষিক্ত হন। জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্যেই মূলত শাহ, প্রধানমন্ত্রী পদে রদবদল করেন। এর মাধ্যমে তারা জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, শাহের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
নয়া প্রধানমন্ত্রীও জনগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং শাহ বিরোধী আন্দোলনকে স্তিমিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। তিনি ইরানে হিজরী তারিখ পুণরায় চালু করেন। উল্লেখ্য, এর আড়াই বছর আগে শাহ, ইসলাম বিরোধী এক নির্দেশে শাহী তারিখ চালু করেছিলেন। এর ফলে গোটা ইরানের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নয়া প্রধানমন্ত্রী হিজরী তারিখ পুণরায় চালুর পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এবং সাধারণ মানুষের আতংক সাভাক সংগঠন বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় ইমাম খোমেনী,শাহের চালবাজি উপলব্ধি করতে পেরে জনগণকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ইরানের জনগণও নয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতারণা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তারা শাহ মনোনীত নয়া প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা না রেখে ১৯৭৮ সালের চৌঠা সেপ্টেম্বর ঈদুল ফিতরের দিন বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়। এদিন সারা ইরানের লাখ লাখ জনতা ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে স্বৈরাচারী শাহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। সেদিন রাজধানী তেহরানে বিশিষ্ট বিপ্লবী আলেম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ মুফাত্তাহ-র ইমামতিতে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতেও লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। নামাজ শেষে অপর সংগ্রামী আলেম হুজ্জাতুল ইসলাম ড. মোহাম্মদ জাওয়াদ বহুনার দেশের বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরেন। আর এর পরই সবাই রাস্তায় নেমে শাহ বিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে এবং হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.)-র প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। তেহরানে লাখ জনতার এই বিক্ষোভের খবর গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়।
এর তিন দিন পর ১৯৭৮ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আলেমদের আহ্বানে তেহরানে এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। বিপ্লবী জনতা পরের দিনও বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজতন্ত্র বিলুপ্তির দাবি উত্থাপিত হওয়ায় শাহ ও তার সহযোগীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যে, নয়া প্রধানমন্ত্রীর গণপ্রতারণামূলক তৎপরতায় কোন কাজ হয়নি। এ কারণে শাহ বিপ্লবীদের সাথে আরও বেশি নৃশংস আচরণের নির্দেশ দেয়। এর পরের দিনই ইরানের ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায়ের সংযোজন ঘটে।
১৯৭৮ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর। শাহের বাহিনী রাজধানী তেহরান, কোম, ইস্ফাহান, শিরাজ, তাব্রিজ ও মাশহাদসহ ১২ টি শহরে সামরিক শাসন জারি করেছে। তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় ট্যাংক ও সাজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু এসব কিছুকেই তোয়াক্কা করছেনা মানুষ। হুমকি ও ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ স্কোয়ারগুলোতে সমবেত হচ্ছে। কিন্তু শাহের অনুগত মানুষরুপী হায়েনারা এ দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করে নি। তারা নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। একদিকে ট্যাংক আর অন্যদিকে জঙ্গী বিমানের হামলায় হাজার হাজার বিপ্লবীর বুক ঝাযরা হয়। আহত হয় আরও বহু মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা এই হামলার লক্ষ্য ছিলনা বরং তারা সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিল। শাহ সরকার ভেবেছিল,এই গণহত্যার পর আর কেউ কোন দিন রাজতন্ত্রকে বিলুপ্ত করার কথা মুখে আনবে না।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ঐ হত্যাকান্ডের পর বিপ্লবী আন্দোলন আরও গতিময় হয়ে ওঠে। ইমাম খোমেনী (রহ.) পাশবিক হামলার পর এক শোকবাণীতে বলেন, শাহ নিরস্ত্র ইরানি জাতির উপর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। একারণে ঘৃণ্য ঘটনা সাজিয়ে ইরানিদের উপর অস্ত্র চালাচ্ছে এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কিন্তু ইরানের মজলুম জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তিনি তার বাণীতে আবারও ইরানের সেনাবাহিনীকে জনগণের কাতারে শামিল হবার আহ্বান জানান। একই সাথে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে জনগণকে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন।
তেহরানে সেদিন যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, মানবাধিকারের দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিবাদ না জানিয়ে বরং শাহের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঐ ঘটনার কয়েক দিন পর নিজে চিঠি লিখে শাহের অমানবিক কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানান। এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেযিনেস্কি, শাহকে টেলিফোন করে বলেছিলেন, আপনি যাই করুন না কেন আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ইরান সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে গণ্য হতো এবং শাহের সকল অপকর্মের প্রতি হোয়াইট হাউজের সমর্থন ছিল। এ কারণে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে নয়া সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং এখনও ঐ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

ষষ্ঠ পর্ব
১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা। দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ধর্মঘট শুরু হয়। ৯ই সেপ্টেম্বর ইরানের সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগারের কর্মচারী ও শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করে। এর পরপরই দেশের অন্যান্য শহরের তেল স্থাপনাগুলোতেও ধর্মঘট শুরু হয়। এর ফলে কার্যত তেল উত্তোলন ও রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
তেল স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানেও ধর্মঘট শুরু হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.) এক বার্তায় শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘট বিশেষকরে তেল শিল্পে ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন এবং ধর্মঘটকারীদের ক্ষতি যতটুকু সম্ভব পুষিয়ে দিতে সাধারণ জনগণ ও আলেম-ওলামাদের প্রতি আহ্বান জানান। সরকারী অফিস, ব্যাংক, কারখানা এমনকি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্মঘট চলতে থাকে। তবে শাহ তার প্রধান আয়ের উৎস তেল শিল্পে ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয় । তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গোটা বিশ্বেই এর প্রভাব পড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি গোটা বিশ্বই এটা উপলব্ধি করতে পারে যে, ইরানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শাহের পতনের আগ পর্যন্ত তেল শিল্পে ধর্মঘট অব্যাহত ছিল।
সে সময় আরেকটি মজার ঘটনা ঘটানো হতো। সেটি হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি রাতের একটা নির্দ্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতেন যাতে বিপ্লবীরা বিক্ষোভ করতে পারেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিপ্লবীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতো এবং বাসার ছাদ থেকে শাহ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতো। এ অবস্থায় শাহ ও তার সহযোগীরা আরও এক নারকীয় তান্ডবের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।
১৯৭৮ সালের ১৬ই অক্টোবর। তেহরানে ৮ই সেপ্টেম্বরের গণহত্যার চেহলাম উপলক্ষ্যে কেরমান শহরের জামে মসজিদে ২০ হাজার মুসল্লী সমবেত হয়। অনুষ্ঠানের মাঝখানে হঠাৎ চিৎকার-চেচামেচি শোনা গেল। বেশ কিছু ব্যক্তি চাকুসহ হাতে তৈরী ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক মানুষ খুন করছে। মসজিদের মেঝে রক্তে ভিজে যায়। এরপর এসব ব্যক্তি মসজিদে আগুন লাগিয়ে চলে যায়। সেদিন শাহের পুলিশ বাহিনী সাদা পোশাকে নারকীয় এই তান্ডব চালিয়েছিল। বিষয়টি সবাই উপলব্ধি করতে পারে। ইমাম খোমেনী (রহ.) এক শোকবার্তায় ঐ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।
এর ক'দিন পরই শাহের জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। মোহাম্মদ রেজা শাহের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো তার কাছে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠায় এবং শাহের প্রতি তাদের সমর্থন পুণরায় ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ইমাম খোমেনী (রহ.) শাহের জন্মদিনকে শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।
ইরানে যখন আন্দোলন তুঙ্গে তখন ইরাকের বাথ সরকার নাজাফে নির্বাসিত ইমাম খোমেনী (রহ.)-র আবাসস্থল অবরোধ করে। ইমাম খোমেনী (রহ.) কে আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এটিও ছিল একটি পন্থা। ইরানের শাহ ও ইরাকের বাথ পার্টির সরকারের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শাহ চাচ্ছিল ইমাম খোমেনীর রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ করতে। আর অন্যদিকে ইরাকি জনগণের উপর ইমামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব পড়তে পারে, সে আশংকায় বাগদাদ উদ্বেগের মধ্যে ছিল। কাজেই তারা ইরাকে ইমামের উপস্থিতিকে নিজেদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছিলনা। এ পরিস্থিতিতে ইমাম খোমেনী (রহ.) ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহর ছেড়ে কুয়েতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু ইরানের শাহ ও মার্কিন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে কুয়েত সরকারও ইমামকে গ্রহণ করতে রাজী হয়নি।
এরপর সবাই ভেবেছিল ইমাম হয়ত অপর কোন মুসলিম দেশকে বেছে নেবেন। কিন্তু না। দেখা গেল তিনি অপ্রত্যাশিত ভাবে ফ্রান্সে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৭৮ সালের ৭ই অক্টোবর তিনি ফ্রান্সে যান। ইরানের শাহী সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ খবর শুনে বেশ খুশীই হয়েছিল। তারা ভেবেছিল পাশ্চাত্যের দেশে ইমাম কোনঠাসা হয়ে পড়বেন এবং ইরানের জনগণের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস এর উল্টো কথাই বলে। ইমাম খোমেনী (রহ.) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পৌছার কয়েক দিন পরই সেখানকার নুফেল লুশাতু গ্রামে যান। ইরানের শাহের প্রতি ফরাসী সরকারেরও সমর্থন ছিল। একারণে ফ্রান্স সরকার ইমামের সাথে সাংবাদিকদের যোগাযোগ ও জামাতে নামাজের উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক সাংবাদিক ও ভক্তের চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত সে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকেনি। ইমামের উপস্থিতির চার মাসের মধ্যে প্যারিসের অদূরবর্তী নুফেল লুশাতু গ্রামটি বিশ্বের গণমাধ্যমে একটি পরিচিত গ্রামে পরিণত হয় এবং সেখান থেকেই ইমাম খোমেনী, ইরানের শাহের অন্যায় ও অপরাধ ফাঁস করতে থাকেন।
এ সময় ইরানে নয়া প্রধানমন্ত্রী শরীফ ইমামী, শাহকে টিকিয়ে রাখার জন্য লোক দেখানো কিছু গণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে নিজেকে দল-নিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। এক পর্যায়ে ১৯৭৮ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে শাহের গঠিত রাস্তখিয দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। শাহ যে নিকৃষ্টতম স্বৈরশাসক ছিল,তার একটি বড় উদাহরণ হলো এই রাস্তখিয পাটি। রাস্তখিয পার্টি গঠনের আগে ইরানে দুটি দলের অস্তিত্ব ছিল এবং উভয় দলই শাহের আনুগত্য পরিপূর্ণ ভাবে মেনেই নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো। আনুগত্য বজায় রাখার পরও এই দল দুটির অস্তিত্বকে তিনি সহ্য করতে পারেননি। শাহ ঐ দল দুটি বিলুপ্ত করে রাস্তখিয নামের নতুন পার্টি গঠন করেন এবং সবাইকে তার দলে যোগ দেবার নির্দেশ দেন। তিনি ঐ দল গঠনের পর শাহ বলেছিলেন, রাস্তখিয দলে যারা যোগ দেবেনা তাদেরকে ইরান ছেড়ে চলে যেতে হবে অথবা কারাবরণ করতে হবে। এই দম্ভোক্তির সাড়ে তিন বছর পর জনগণের চাপের মুখে শাহের ইঙ্গিতেই এই দলটি বিলুপ্ত করা হয়।
এটি ছিল শাহের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য শাহ টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে স্বীকার করেন যে, অতীতে অনেক ভুল হয়েছে। তবে এসব ভুলের জন্য তিনি তার অনুগত পূর্বের সরকারগুলোকে দায়ি করেন। এরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমির আব্বাস হুবাইদা এবং গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সাভাকের সাবেক প্রধান নাসিরীকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ইরানি জনগণ শাহের এসব প্রতারণামূলক পদক্ষেপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় এবং অতীতের সকল কর্মকান্ডের জন্য শাহকে দায়ি করে তার পতনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিও জোরেসুরে উচ্চারিত হতে থাকে।
নয়া শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম থেকেই ইরানের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শাহ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দূর্গে পরিণত হয়। ছাত্ররা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমবেত হয়ে শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এর ফলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। বিপ্লবী আন্দোলনকে বেগবান করতে ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করার পর শাহের বাহিনী তা দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭৮ সালের চৌঠা নভেম্বর ছিল ইমাম খোমেনী (রহ.)কে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানোর ১৮তম বার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষ্যে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ গুলির শব্দ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে লাশ হয় ৫৬ জন বিপ্লবী ছাত্র। আহত হয় আরও শত শত বিক্ষোভকারী। এরপর ছাত্রদের বিক্ষোভ আরও তুঙ্গে ওঠে। উপায়ান্তর না দেখে শাহের সরকার সকল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে।

সপ্তম পর্ব
স্বৈরাচারী শাহের বাহিনী ১৯৭৮ সালের ৪ নভেম্বর ছাত্র বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে ৫৬ জনকে হত্যা করার পর আন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। শাহ তার অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে তার বক্তব্য প্রচার করা হয়। ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি তিনি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর একদিন পরই ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার শ্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী শরীফ ইমামী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। শাহ, জেনারেল আযহারিকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। সেনা কর্মকর্তাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়ার মাধ্যমে শাহ আরও কঠোর হস্তে বিপ্লবী আন্দোলন দমনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ তাতে ভয় পায়নি। তারা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এরই মাঝে একদিন শাহের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনের জন্য পবিত্র মাশহাদ শহরে অবস্থিত বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-র বংশধর হযরত ইমাম রেজা (আ.)-র মাজারে প্রবেশ করে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ইমাম রেজা (আ.)-র মাজার অবমাননার খবর সমগ্র ইরানে ছড়িয়ে পড়লে জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
দেখতে দেখতে আবারও শোকাবহ মহররম মাস এসে হাজির হয়। মহররম মাস উপলক্ষ্যে ইমাম খোমেনী (রহ.) ইরানিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠান। তিনি ঐ বার্তায় মহররম মাসে সংঘটিত কারবালার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মহররম হচ্ছে তলোয়ারের বিরুদ্ধে রক্তের বিজয়ের মাস। তিনি শয়তানি শক্তির মোকাবেলায় নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনী (রহ.) ইরানের স্বৈরাচারী শাহকে এজিদের সাথে তুলনা করে বলেন, মহররম হচ্ছে এজিদি শক্তির পরাজয়ের মাস। এই মাসে ঘাতক শাহের অন্যায়-অপকর্ম আরও বেশি বেশি তুলে ধরতে তিনি দেশের আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। ইমামের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে মহররমের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাহের অন্যায়-অপকর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রথম দিনই শাহের ঘাতক বাহিনীর হাতে কয়েক জন শাহাদাৎবরণ করেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) ঐ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসবের মাধ্যমে শাহ তার পতন ঠেকাতে পারবে না। তিনি ইরানি জনগণের উপর হামলা না চালাতে শাহের সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অত্যাচারী শাহের খেদমত না করার উপায় হিসেবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যাওয়া এখন সেনা সদস্যদের ধর্মীয় দায়িত্ব।
১৯৭৮ সালের ১০ ডিসেম্বর। ইমাম হোসেন (আ.)-র শাহাদাৎবার্ষিকী বা আশুরার পূর্ব দিন। ইমাম হোসেন (আ.)-র প্রতি ইরানিদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়টি উপলব্ধি করে শাহ দুই দিনের জন্য সামরিক আইন তুলে নেয়। কিন্তু একি দেখছে শাহ। রাজধানী যে জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। জনসমুদ্রের সবার মুখে একই সুর। সবাই শাহের পতনের দাবি জানাচ্ছে। সেদিনের মিছিলে তেহরানের পয়ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিল। এর পরের দিন অর্থাৎ এগারোই ডিসেম্বর ইমাম হোসেন (আ.)-র শাহাদাৎবার্ষিকীর মিছিলে মানুষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। ঐ দিন রাজধানী তেহরানে আশুরার শোক মিছিলে চল্লিশ লক্ষ মানুষ অংশ নেয়। সেদিনও একই ধ্বনি ওঠে; স্বৈরাচার নিপাত যাক, শাহের পতন চাই। মিছিল শেষে তেহরানের বিক্ষোভকারীরা শাহের পতন দাবি করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।
সেদিনের বিক্ষোভের পর সবাই এটা বুঝতে পারে যে, শাহের পতন এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার। রাজধানী তেহরানে আশুরার মিছিলে শাহের পুলিশ ও সেনাবাহিনী কোন প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি না করলেও বিভিন্ন মফস্বল শহরে হামলার ঘটনা ঘটে এবং বেশ কয়েক জন বিপ্লবী হতাহত হয়।
আশুরার মিছিলে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও শাহের পতনের দাবিতে বিবৃতি প্রকাশিত হবার পর ইমাম খোমেনী (রহ.) আশুরার মিছিলকে শাহের পতনের পক্ষে গণরায় হিসেবে ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তিনি আবারও জনগণের পাশে দাড়াতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনীর আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সেনা সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে এবং বিপ্লবীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়।
১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর। শাহের গার্ড বাহিনীর সদস্যরা সেদিন তেহরানে গুলি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরান নেজাতুল্লাহিকে হত্যা করে। তিনিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েক জন শিক্ষক তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার প্রতিবাদে তিন সপ্তাহ ধরে অবস্থান ধর্মঘট পালন করছিলেন। শ্রদ্ধেয় এ শিক্ষকের দাফন অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয় এবং তা শাহ বিরোধী বিক্ষোভে রূপ লাভ করে। শাহের বাহিনী এখানেও গুলি চালায়। এক শহীদের জানাযায় এসে আরও বহু বিপ্লবীকে লাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়। এর একই সময়ে ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাব্রিজের পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানকার বেশ কিছু সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেয় এবং শাহের অনুগত সেনাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে।
১৯৭৯ সালের পহেলা জানুয়ারি। শাহের বাহিনী ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরে গণহত্যা চালায়। শত শত মানুষ হতাহত হয়। অন্যান্য শহর থেকেও সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে। জেনারেল আযহারির নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার বিপ্লবী আন্দোলন স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নৃশংসতার মাত্রা বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে, শাহের পতন নিশ্চিত বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও বৃটেনের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানরা ক্যারিবিয়ান সাগরের পূর্বে অবস্থিত গুয়াদেলুপ দ্বীপে এক বৈঠকে বসে। সেখানে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বিপ্লবীদের আন্দোলনের কারণে শাহ আর টিকে থাকতে পারবে না,ফলে তাকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। পাশাপাশি তারা এও বলে যে, ইমাম খোমেনী(রহ.)-র অনস্বীকার্য অবস্থানের কারণে তার সাথে আলোচনায় যাওয়াটাই মঙ্গলজনক হবে।
এই বৈঠকের একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেদেশের নৌবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান রবার্ট হাইযারকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ইরানে প্রেরণ করে। ইরানের সেনাবাহিনীকে সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করাই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। গুয়াদেলুপ দ্বীপে ইরান সম্পর্কে বৈঠক এবং সেনা অভ্যুত্থানের জন্য নৌ কর্মকর্তাকে তেহরানে প্রেরণের ঘটনা, ইরানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের স্পষ্ট প্রমাণ। বৃটেনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাহ সরকারের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং শাহ মার্কিন ইঙ্গিত ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করতো না।
শাহ বহু বার প্রকাশ্যেই মার্কিন নীতি অনুসরণের কথা বলেছেন। মার্কিন নীতি বাস্তবায়ন করতে যেয়ে শাহ জনগণের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিকে সব সময় উপেক্ষা করেছেন। ইরানে মহান বিপ্লব সফল হবার এটিও ছিল একটি কারণ। ইরানি জনগণ সব সময় স্বৈরাচারী শাহকে হঠিয়ে জনকল্যাণমুখী সরকারের হাতে দেশের পরিচালনাভার হস্তান্তরের চেষ্টা করে আসছিল। ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের সে প্রত্যাশা পূর্ণ হয়।
অষ্টম পর্ব
বিপ্লব বিজয়ের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আশুরার মিছিলে ৪০ লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণের কারণে হতভম্ব শাহ ও মার্কিন সরকার এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, সহিংসতা চালিয়ে আর কোন লাভ হবেনা বরং তা বিপ্লবের বিজয়কেই আরও ত্বরান্বিত করবে। এ অবস্থায় শাহ এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেন,যিনি সবার কাছেই কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য হবেন। ইমাম খোমেনী শাহের এ সিদ্ধান্তের পেছনের অশুভ উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হন এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তিই শাহের সাথে সাক্ষাত করবে, গোটা ইরানি জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু অবশেষে ১৯৭৯ সালের ছয়ই জানুয়ারি শাহপুর বাখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজী হন এবং সবাইকে এ প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি দূর্নীতির মোকাবেলা করবেন ও জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবেন। শাহপুর বাখতিয়ার এমন সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন যখন দেশের বেশীর ভাগ অঞ্চলই বিপ্লবীরা নিয়ন্ত্রণ করছিল। ইমাম খোমেনী (রহ.)-ও এক ঘোষণায় বাখতিয়ারের সরকারকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ঐ সরকারের সাথে কোন ধরনের সহযোগিতা না করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
ইমাম খোমেনী (রহ.) ১২ জানুয়ারি বিশিষ্ট আলেম ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে ইসলামী বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেন,যাতে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যেতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের অংশগ্রহণে পূর্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে অনুগত একটি পরিষদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে ১৩ ই জানুয়ারি রাজতান্ত্রিক পরিষদ গঠন করে। পাশাপাশি মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধিও ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে শাহকে দেশ ত্যাগে রাজি করাতে সক্ষম হন। শাহকে বোঝানো হয়, রাজতন্ত্র ও মার্কিন স্বার্থে আপাতত তার দেশ ত্যাগ করা উচিত।
এ অবস্থায় শাহ ১৬ জানুয়ারি মিশর চলে যান। এর ফলে গোটা ইরানে আনন্দের জোয়ার বইয়ে যায়। এ উপলক্ষ্যে জনতা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে উৎসব পালন করে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের স্কোয়ারগুলো থেকে শাহের মূর্তি নামিয়ে ফেলা হয়। সে সময় ইমাম খোমেনী (রহ.) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জাতিকে এটা বুঝতে হবে শাহের দেশত্যাগ মানেই বিজয় নয়। তবে তা বিজয়ের পথে অগ্রগতি।
শাহের দেশত্যাগের পর তার ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও দেশত্যাগের হিড়িক পড়ে যায় এবং তারা সাথে করে বিপুল অর্থ-কড়ি নিয়ে বিদেশ চলে যায়। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সে সময় প্রায় এক হাজার তিন'শ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। যাইহোক শাহের দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫৩ বছরের পাহলাভি রাজতন্ত্রের পতন যে অনিবার্য,তা সবাই উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাল না ছেড়ে ইরানের সেনাবাহিনীকে সেনা অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।
১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারি। ইমাম হোসেন (আ:)-র শাহাদাতের চেহলাম বার্ষিকী। সেনা অভ্যুত্থানের গুজবকে গুরুত্ব না দিয়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের পর একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। ঐ ইশতেহারে স্বৈরাচারী শাহের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ারের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.) ঐ বিক্ষোভ মিছিলের পর এক বার্তায় জানান যে, তিনি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে ফিরে আসবেন। পাশাপাশি তিনি ইরানের সংসদ ও রাজতান্ত্রিক পরিষদের সদস্যদের পদত্যাগের আহ্বান জানান।
ইমাম খোমেনী(রহ.)-র স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর প্রতিটি মুহূর্তই আরও ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিনই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিপ্লবীদের হতাহত হবার খবর প্রকাশ হতে থাকে। আর এ পর্যায়ে এসে সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীতেও শাহের বিরোধিতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৯ সালের ২০ শে জানুয়ারি দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস বিমান ঘাটির বেশ কিছু অফিসার ও সদস্য, বিপ্লবীদের সাথে যোগ দেয়। তাদের পথ ধরেই আরও অনেকে জনগণের পাশে এস দাড়ায়। পাশাপাশি কিছু বিপ্লবী সেনা সদস্যকে আটক ও তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।
অন্যদিকে, শাহের অনুপস্থিতিতে দেশ পরিচালনার জন্য গঠিত রাজতান্ত্রিক পরিষদের প্রধান সাইয়্যেদ জালাল উদ্দিন তেহরানি, ইমাম খোমেনী (রহ.)-র সাথে সাক্ষাত করতে ফ্রান্সে যান। ইমাম তার সাথে সাক্ষাত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এর আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, শাহী সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে তিনি তখনি কেবল সাক্ষাত করবেন যখন তারা তাদের পদ থেকে সরে দাড়াবে। ইমাম খোমেনী(রহ.), সাইয়্যেদ জালাল উদ্দিন তেহরানিকেও পদত্যাগ ও রাজতান্ত্রিক পরিষদ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিতে বলেন। জালাল উদ্দিন তেহরানি রাজতন্ত্রের পতন অনিবার্য দেখে ইমামের কথা অনুযায়ী পদত্যাগ করেন এবং ইমামের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করেন।
ইমাম খোমেনী দেশে ফিরবেন, এ খবর বিপ্লবীদের মনোবল চাঙ্গা করলেও শাহ সরকার ও তার দোসররা উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। তারা জানতো ইমাম ইরানে প্রবেশ করার সাথে সাথে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে যাত্রা আরও ত্বরান্বিত হবে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ার দেশের সকল বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয় এবং তেহরানের মেহরাবাদ বিমান বন্দরে ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে। ইমামকে অভ্যর্থনা জানাতে যেসব ইরানি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল,তারা এ পদক্ষেপের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী বাখতিয়ার জনগণের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করার লক্ষ্যে প্যারিসে ইমাম খোমেনী (রহ.)-র সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছে ব্যক্ত করে। কিন্তু ইমাম ঘোষনা করেন, বাখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাড়ালেই কেবল তার সাথে বৈঠক হতে পারে। এ অবস্থার মধ্যে স্বৈরাচারী শাহ ও প্রধানমন্ত্রী বাখতিয়ারের পক্ষে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ মিছিল বের করে। এই মিছিল থেকেই আরেকবার প্রমাণিত হয় যে, ইরানের মাত্র হাতে গোনা কিছু মানুষ শাহকে সমর্থন করছে, বাকী সবাই তার পতন চাচ্ছে।
১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ইরানের আলেমরা বিমান বন্দর বন্ধের প্র