জুন ০৭, ২০২২ ১৯:২০ Asia/Dhaka

আজকের আসরে যাওয়া যাক এই প্রদেশেরই গোরগান শহরের ঐতিহাসিক একটি টাওয়ার পরিদর্শনে। এই টাওয়ারটি গোরগান শহরের দর্শনীয় একটি স্থান, একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

উত্তর ইরানের প্রদেশ গোলেস্তানের গোরগানে, ইতিহাস-সমৃদ্ধ এই নিদর্শন কৌতূহলী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছে আজো। এই নিদর্শনটির নাম হলো গোম্বাদে কাবুস বা কাবুস গম্বুজ। ইরানের প্রাচীনতম স্থাপত্যগুলোর মধ্যে অন্যতম এই গম্বুজ বা টাওয়ারটি। টাওয়ার বলার কারণ হলো গম্বুজ বিশিষ্ট এই স্থাপনাটিকে ফারসি ভাষায় বোর্জও বলা হয়ে থাকে। ফার্সি বোর্জ শব্দের অর্থ টাওয়ার। শহরটির নামও গোম্বাদে কাবুস। পরিচিতি আর ঐতিহাসিকতার কারণেই হয়তো ওই টাওয়ারের নামে শহরের নামকরণ করা হয়েছে। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে এই টাওয়ারটি নির্মিত হয়। নির্মানশৈলীর দিক থেকে বিশ্বের যতগুলো শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্ম রয়েছে, বোর্জে কাবুস বা কাবুস টাওয়ার তাদের মধ্যে অন্যতম। স্বভাবতই ইরানের জন্য এই টাওয়ারটি গর্বের বিষয়।

শামসুল মায়ালী কাবুস ইবনে ওশমগীরের শাসনামলে গোরগান ছিল রাজধানী শহর। প্রাচীন এবং বৃহৎ এই শহরটি গোরগান শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গোম্বাদে কাবুস শহর প্রাচীনকালে 'জোরজান' নামে পরিচিত ছিল। সিল্ক রোডের পাশে অবস্থানের কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে এই শহরের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বেশ লম্বা সময় ধরে বিশেষ করে আলে যিয়র এবং আলে বুইয়ে রাজবংশের শাসনামলে এই শহর ছিল ইরানের রাজধানী। কাবুস ইবনে ওশমগীরের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত ইটের তৈরি টাওয়ারটি এখন ইরানের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

বাদশাহ কাবুসের জীবীতাবস্থায় টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো টাওয়ারটি তাঁরই সমাধিস্তম্ভ। তার মানে, কাবুস তাঁর সমাধি টাওয়ারটির কাজ নিজের ইচ্ছে মতোই করে গেছেন। কাবুস টাওয়ার সমতল ভূমি থেকে পনের মিটার উঁচু মাটির টীলার উপরে নির্মিত হয়েছে। মূল টাওয়ারটির উচচতা হলো সাইত্রিশ মিটার। ফলে সমতল ভূমি থেকে টাওয়ারটির উচচতা দাঁড়াল বায়ান্ন মিটারে। টাওয়ারটির ডিজাইন হলো দশ কৌণিক তারার মতো। প্রতিটি বহির্মুখি কোণ থেকে ছাদ পর্যন্ত কৌণিক আকৃতিতেই উঠে গেছে পিলার। একটি কোণ থেকে আরেকটি কোণ পর্যন্ত খানিকটা দূরত্ব আছে। ছাদের নীচে এই কোণগুলিকে সমতা বজায় রেখে তাদের পারস্পরিক দূরত্ব পূরণ করে প্লাস্টার করা হয়েছে।

গোম্বাদে কাবুসের নির্মাণশৈলী নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। দশ কৌণিক তারার মতো ওই পিলারের একটি কোণ থেকে আরেকটি কোণের দূরত্ব হলো ১ মিটার ৩৪ সেন্টিমিটার। এই দূরত্ব পূরণের কাজটি ছাদের নীচের মতো ভিত্তিমূলেও করা হয়েছে। টাওয়ারের উপর অংশে টোপরের মতো একটি গম্বুজ বসানো আছে। টোপরাকৃতির এই গম্বুজের উচ্চতা হলো ১৮ মিটার। টাওয়ারের ভেতরে ঢোকার জন্যে একটি গেইট আছে। ঐ গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই নজরে পড়বে কুফি হরফে লেখার কিছু কারুকাজ। এসব লেখার মধ্যে টাওয়ার সম্পর্কিত কিছু তথ্য দেয়া আছে। প্রথমে লেখা হয়েছে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আর তথ্যগুলো হলো আমীর, ওশমগীরের পুত্র কাবুস। তিনি তার জীবদ্দশাতেই এই টাওয়ার প্রতিষ্ঠার আদেশ দেন।

সবশেষে টাওয়ারের প্রতিষ্ঠাকাল লেখা হয়েছে ৩৯৭ হিজরী। কাবুস টাওয়ারটি নির্মাণের পর থেকে এ পর্যন্ত তিনবার মেরামত করা হয়েছে। সর্বশেষ সংস্কার কাজটি চালানো হয়েছে ১৯৭২ সালে। এটি ইসলামী স্থাপত্যকলার একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। বিশেষ করে হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে এ ধরণের নির্মাণকাজের নিদর্শন খুব একটা চোখে পড়ে না। তাই কাবুস টাওয়ারটি কেবল ইরানেরই নয় বরং ইসলামী স্থাপত্যকলার ইতিহাসের পাতায় একটি স্বর্ণোজ্জ্বল গর্বিত নাম।  ড: অর্থোরাফাম পোপ এই স্থাপত্যটির ব্যাপারে লিখেছেন আলবোর্জ পর্বত মালার পূর্বদিকের উপত্যকায় এবং এশিয়ার মরু অঞ্চলে এতো বড়ো ও এতো উন্নত স্থাপত্যের নিদর্শন আর দ্বীতিয়টি নেই। সবধরনের শিল্প কৌশল ব্যবহার করে এই টাওয়ারটিকে সাজানো হয়েছে।

এ সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী কোরখানসী কাবুস টাওয়ার সম্পর্কে একটি বই লিখেছেন। তার লেখা ওই বইটির নাম 'নোখবে সীনীয়েহ'। ওই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন ইরানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকলার ক্ষেত্রে কাবুস টাওয়ার ব্যতিক্রমধর্মী একটি স্থাপনা। ছবিতে কিংবা বর্ণনা দিয়ে তো আর বাস্তব অবস্থাটিকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়, তাই বিস্তৃত এলাকাজুড়ে এই টাওয়ারটির প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধির জন্য পর্যটকদের ভীড় লেগেই থাকে। এখানে যাবার জন্যও সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। সবুজ শ্যামল উত্তরাঞ্চলীয় ইরান থেকে প্রশস্ত রাস্তায় যে কোন স্থলযানে চলে যেতে পারেন গোম্বাদে কাবুস শহরে। পথের ধারে অ্যারো সাইনে টাওয়ারের দিকে যাবার দিক নির্দেশনা দেয়া আছে। যতোই এগিয়ে যাবেন টাওয়ারের দিকে, ততই আপনার মন নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আর প্রাকৃতিক সবুজে প্রফুল্ল হয়ে উঠবে।

টাওয়ারের চারপাশে খোলা জায়গা জুড়ে অবকাশ যাপনের ব্যবস্থা আছে। সবমিলেয়ে কাবুস টাওয়ারের পরিবেশ এককথায় প্রাণবন্ত। টাওয়ারের সৌন্দর্যের বাইরেও আরও যে দিকটি একজন পর্যটককে আকৃষ্ট করে তা হলো বিভিন্ন গোত্র ও কওমের চমৎকার সহাবস্থান। বিভিন্ন কওম বলতে এখানে রয়েছে তুর্কমান, ফার্স, তুর্কি, সিস্তানি ইত্যাদি বিচিত্র এলাকার লোকজনের বসবাস। এই বৈচিত্র্য গোম্বাদে কাবুস শহরকে আলাদা সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ